রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা, উত্তরা, ধানমন্ডি ও নিকুঞ্জের মতো অভিজাত এলাকা ঘিরে মাদক সেবন ও বেচাকেনার যে চিত্র সামনে আসছে, তা গভীর উদ্বেগের। বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, ব্যক্তিগত বাড়ি, ক্লাব ও রিসোর্টে ডিজে পার্টি কিংবা রেভ পার্টির আড়ালে মাদকের আসর বসার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সাম্প্রতিক অভিযানগুলোয় মাদক উদ্ধার ও বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিকে আটকের ঘটনা এই সমস্যার ব্যাপকতা নতুন করে সামনে এনেছে। বিশেষত, এসব কর্মকা-ে প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো কোনো সদস্যের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, রাজধানীর অভিজাত এলাকাগুলোয় মাদকের এমন বিস্তার ঠেকাতে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ কোথায়?
মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালিত হলেও শুধু কয়েকটি আস্তানায় হানা দিয়ে কিংবা পার্টিতে অংশগ্রহণকারীদের গ্রেপ্তার করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন অপরাধের উৎস, বিস্তার ও পৃষ্ঠপোষকতার নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা। এ জন্য ঢাকা মহানগর পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, কাস্টমস ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মধ্যে সমন্বিত কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। অভিজাত এলাকাগুলোর ক্লাব, বার, রেস্টহাউস ও বিনোদনকেন্দ্রের লাইসেন্স, অনুমোদিত কার্যক্রম এবং মদ সংরক্ষণ ও পরিবেশনের বৈধতা নিয়মিত যাচাই করা জরুরি। অনুমোদনহীনভাবে মদ বিক্রি কিংবা মাদক বেচাকেনার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল করতে হবে।
একই সঙ্গে, গোয়েন্দা নজরদারি আরও কার্যকর করতে হবে। কোন পথে মাদক রাজধানীর অভিজাত এলাকায় প্রবেশ করছে, কারা তা সরবরাহ করছে এবং কোথায় মজুত রাখা হচ্ছে, তা শনাক্তে বিশেষ নজর দিতে হবে। অনলাইন যোগাযোগমাধ্যম কিংবা কুরিয়ার সেবার অপব্যবহার করে মাদক সরবরাহের অভিযোগ থাকলে আইনসম্মত উপায়ে তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন, অপরাধলব্ধ সম্পদ এবং মাদক ব্যবসায় অর্থায়নের উৎস খতিয়ে দেখতে হবে। অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য ও প্রমাণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে মাদকবিরোধী কার্যক্রমের আড়ালে চাঁদাবাজি কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির সুযোগ তৈরি না হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি নিশ্চিত করাও সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। কোনো সদস্য মাদক ব্যবসায় সহযোগিতা, অপরাধীদের সুরক্ষা কিংবা অভিযানের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত হলে, নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে পদমর্যাদা-নির্বিশেষে বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নিতে হবে।
তবে সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হওয়া উচিত মাদক ব্যবসার মূল সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া। শুধু মাদক সেবনের স্থান বন্ধ কিংবা খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করলে সরবরাহব্যবস্থা অক্ষত থেকে যাবে। তাই মাদকের মূল হোতা, অর্থদাতা, সরবরাহকারী, পরিবহনকারী এবং অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
পাশাপাশি তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনকে সম্পৃক্ত করতে হবে। মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি যারা মাদককে মুনাফার ব্যবসায় পরিণত করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
রাজধানীর অভিজাত এলাকায় মাদকের বিস্তার রোধে সরকারের সাফল্য নির্ধারিত হবে অভিযানের সংখ্যা দিয়ে নয়; বরং মাদকের সরবরাহ বন্ধ, অপরাধের পুনরাবৃত্তি হ্রাস এবং মূল হোতাদের বিচারের মুখোমুখি করার মাধ্যমে। আর এ ক্ষেত্রে পরিচয়, অর্থ কিংবা ক্ষমতার প্রভাব যেন কাউকে দায়মুক্তি দিতে না পারে, সেই নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠা করার কোনো বিকল্প নেই।