দীর্ঘ অপেক্ষার পর গতকাল বিকাল ৩টা ৩৪ মিনিটে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলো। সব পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন সম্পন্ন হলে ডিসেম্বরের শেষদিকে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে
৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন জানান, বিক্রিয়া শুরুর পর চুল্লির সব গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপ নকশা অনুযায়ী রয়েছে। বিকিরণের মাত্রা নিয়েও উদ্বেগের কারণ নেই।
সূত্র জানিয়েছে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে এ পর্যায়কে বলা হয় ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’। এ সময় চুল্লিতে ইউরেনিয়াম পরমাণুর বিভাজনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ বিক্রিয়া শুরু হয়। এতে উৎপন্ন তাপ দিয়ে পানি থেকে উচ্চচাপের বাষ্প তৈরি করা হবে। সেই বাষ্পে টারবাইন ঘুরিয়ে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, শুরুতে চুল্লি কম শক্তিতে চালিয়ে এর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, কারিগরি সরঞ্জাম ও নিরাপত্তাব্যবস্থা পরীক্ষা করা হবে। এর পর ধাপে ধাপে চুল্লির ক্ষমতা বাড়ানো হবে। এ প্রক্রিয়ায় ৩০ থেকে ৪০ দিন লাগতে পারে।
নিরাপত্তা যাচাইয়ে বায়েরার পরিদর্শন : গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা) প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর অনুমোদন দেয়। এর আগে পারমাণবিক জ্বালানি লোড করার পর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সম্পন্ন করে কমিশনিংয়ের প্রথম ধাপ বি-১ শেষ করা হয়। এর পর বি-২ ধাপে যাওয়ার অনুমতি মেলে।
নিরাপত্তা ভালভের কারিগরি জটিলতায় কমিশনিং কার্যক্রমে দুই মাসের বেশি দেরি হয়েছিল। রুশ বিশেষজ্ঞরা গত ৩০ সেপ্টেম্বর সমস্যার সমাধান করেন। এর পর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে বায়েরা পরবর্তী ধাপের অনুমোদন দেয়।
এদিকে প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর প্রস্তুতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাইয়ে গতকাল থেকে পরিদর্শন শুরু করেছে বায়েরা প্রতিনিধি দল। এ কার্যক্রম চলবে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত। পরিদর্শনে কারিগরি ও পরিচালনাগত প্রস্তুতি, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা হচ্ছে। পরিদর্শনের ফলাফল মূল্যায়ন করে পরবর্তী ধাপের জন্য প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
শুরুতে কেন্দ্রটি সর্বোচ্চ ক্ষমতার প্রায় ৩ শতাংশে চালানো হবে। পরে ধাপে ধাপে তা ২০ থেকে ৩০ শতাংশে নেওয়া হবে। গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের আগে আরও পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিতে হবে। সরবরাহ শুরুর পরও কয়েক মাস ধরে কেন্দ্রটির উৎপাদনক্ষমতা ও বিভিন্ন ব্যবস্থা পরীক্ষা করা হবে। পূর্ণ ক্ষমতায় উৎপাদনের আগে পরীক্ষামূলক কার্যক্রমে আরও সাত থেকে আট মাস লাগতে পারে। সব পরীক্ষা শেষ হলে শুরু হবে বাণিজ্যিক উৎপাদন।
রাশিয়ার সহযোগিতায় পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর তীরে নির্মিত হচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এতে রয়েছে দুটি ভিভিইআর-১২০০ মডেলের চুল্লি। তৃতীয় প্রজন্মের এ চুল্লিতে একাধিক স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে। দুই ইউনিটের মোট উৎপাদনক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। সেখান থেকে প্রায় ২ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। দ্বিতীয় ইউনিটে জ্বালানি স্থাপনের প্রস্তুতি চলছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দুই ইউনিট চালু হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন একটি বড় উৎস যুক্ত হবে। এতে বিদ্যুৎ সরবরাহের চাপ কমানোর পাশাপাশি জ্বালানির উৎস বহুমুখী করার সুযোগ তৈরি হবে। আমদানি করা তেল ও কয়লার ওপর নির্ভরতা কমাতেও সহায়ক হতে পারে পারমাণবিক বিদ্যুৎ। তবে উৎপাদন খরচের তুলনা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট ব্যয় ও পরিচালন পরিস্থিতির ওপর।
এদিকে রূপপুর প্রকল্পের মেয়াদ দুই দফায় বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। প্রকল্প পরিচালক ডা. মো. জাহেদুল হাসানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধির কারণে প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।
