এম,শাহজাহান শেরপুর জেলা প্রতিনিধিঃ শেরপুরের ঝিনাইগাতী সীমান্তে গারো পাহাড়ের নদী-ঝরনা ও পাহাড় কেটে অবাধে পাথর-বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র দিনের বেলায় প্রকাশ্যে পাহাড় ও নদী-ঝরনা থেকে পাথর-বালু তুলে বিভিন্ন স্থানে স্তূপ করে রাখছে। পরে রাতের আঁধারে ঘোড়ার গাড়ি, ভ্যান, ট্রলি, মাহিন্দ্র ও ট্রাকে করে এসব প্রাকৃতিক সম্পদ বিভিন্ন স্থানে নিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে পাহাড়, হুমকির মুখে পড়ছে বন ও জীববৈচিত্র্য। অথচ কার্যকর প্রতিরোধের অভাবে বন্ধ হচ্ছে না এই কর্মকাণ্ড।
গত ৮ সেপ্টেম্বর রাতে বালুভর্তি মাহিন্দ্র পরিবহনের সময় বাকাকুড়া এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মিজান মিয়া (১৭) নামে এক চালক নিহত হন। তিনি সন্ধ্যাকুড়া গ্রামের মরহুম টুকন মিয়ার ছেলে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অবাধে পাথর-বালু উত্তোলন ও পরিবহনের কারণে পাহাড়ি এলাকার পরিবেশ যেমন বিপর্যস্ত হচ্ছে, তেমনি ঝুঁকিপূর্ণ সড়কে ঘটছে দুর্ঘটনা।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য গারো পাহাড়ের ঝিনাইগাতী অংশ দীর্ঘদিন ধরে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়। এ সৌন্দর্যকে ঘিরে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ১৯৯৩ সালে গজনী এলাকায় গড়ে তোলা হয় ‘গজনী অবকাশ’ বিনোদনকেন্দ্র। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিবছর এখানে ভ্রমণপিপাসু মানুষের সমাগম ঘটে। এ পর্যটনকেন্দ্র থেকে সরকার রাজস্বও পেয়ে থাকে। তবে নির্বিচারে পাথর-বালু উত্তোলনের কারণে এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ ও পর্যটন সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, কাংশা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী কালঘোষা নদীর গান্ধিগাঁও, দরবেশতলা, হালচাটি, মালিটিলা, বাকাকুড়া, গজনী ও ছোট গজনীসহ বিভিন্ন এলাকায় এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চলে পাথর-বালু উত্তোলন চলছে।
তাঁদের অভিযোগ, শতাধিক শ্রমিক বেলচা, কোদালসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম দিয়ে পাহাড় কেটে এবং নদী-ঝরনা থেকে পাথর-বালু সংগ্রহ করছেন। পরে টুকরিতে করে এসব পাথর-বালু সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে স্তূপ করে রাখা হয়। রাত ১২টার পর বিভিন্ন যানবাহনে করে এসব পাথর-বালু উপজেলা ও জেলা সদরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিদিন রাত ১২টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত উত্তোলন ও পরিবহনের এ কর্মকাণ্ড চলে। এতে প্রতিরাতে বিপুল পরিমাণ পাথর-বালু সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
পাথর-বালু উত্তোলনের জন্য বন কেটে বনের ভেতর দিয়ে রাস্তা তৈরির অভিযোগও রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে উত্তোলনের ফলে পাহাড়ের মাটি ও ঢাল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নদী-ঝরনার তলদেশের স্বাভাবিক গঠন ও পানিপ্রবাহেও পরিবর্তন ঘটছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বন, বন্যপ্রাণী ও সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
অবৈধ উত্তোলন বন্ধে উপজেলা প্রশাসন বিভিন্ন সময়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছে। এসব অভিযানে বালুবাহী যানবাহন আটক, জরিমানা এবং জড়িত ব্যক্তিদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযানের পরও বন্ধ হয়নি পাথর-বালু উত্তোলন। তাঁদের দাবি, প্রতিরাতে লাখ লাখ টাকা মূল্যের পাথর-বালু সরিয়ে নেওয়া হলেও এ কর্মকাণ্ড পুরোপুরি বন্ধে কার্যকর ও ধারাবাহিক উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। জানা গেছে,
গত ৩ জুন রাতে বালুভর্তি চারটি মাহিন্দ্র আটককে কেন্দ্র করে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের ভাষ্য, ওই ঘটনায় বন কর্মকর্তা ছালেহিন নেওয়াজ ও বনপ্রহরী জিয়াউর রহমান আহত হন। এ ঘটনার পর পাথর-বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বন বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা চাপের মুখে পড়েছেন বলেও জানা গেছে।
এ বিষয়ে বন বিভাগের বক্তব্য, নদীর বালু জেলা প্রশাসনের অধীন। ফলে নদী থেকে বালু উত্তোলন বন্ধের মূল দায়িত্ব বন বিভাগের নয়। তবে বালুভর্তি গাড়ি পাচারের সময় কেউ তথ্য দিলে তা আটক করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে বন বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অনিন্দা রানী ভৌমিক বলেন, তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল আমীনের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর দিতে রাজি হননি।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, গারো পাহাড়ের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিচ্ছিন্ন অভিযান দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। পাথর-বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে নিয়মিত ও সমন্বিত নজরদারি জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে পাহাড়, নদী ও ঝরনার প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় প্রশাসন, বন বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
The post গারো পাহাড়ের নদী-ঝরনা ও পাহাড় কেটে অবাধে উত্তোলন করা হচ্ছে পাথর-বালু : প্রতিরোধের উদ্যোগ নেই appeared first on sokalerkhobor24.com.
