
মাথা ন্যাড়া করার পর স্বামী ও ছেলের সঙ্গে সামিয়া আফরিন।
ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছেন উপস্থাপক সামিয়া আফরিন। ডিম্বাশয়ের (ওভারিয়ান) ক্যানসারের চিকিৎসায় চলছে কেমোথেরাপি। এই কঠিন সময়ে চিকিৎসার শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি চুল হারানোর মানসিক ধাক্কাও সামলাতে হচ্ছে তাঁকে। তবে এই লড়াইয়ে সামিয়াকে একা হতে দেননি তাঁর পরিবারের সদস্যরা। ভালোবাসা, সাহস আর সংহতির অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন স্বামী ও ছেলে।
কেমোথেরাপির প্রভাবে চুল পড়ে যেতে পারে—চিকিৎসকের কাছ থেকে আগেই এমন কথা জেনেছিলেন সামিয়া। তাই মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতে প্রথমে চুল ছোট করেন তিনি। পরে নিজের ছেলে আহানাফ আরাবির হাতে মাথা ন্যাড়া করান। কিন্তু এরপর ঘটে আরও আবেগঘন এক ঘটনা। মায়ের প্রতি ভালোবাসা ও সংহতি জানাতে ছেলে আহানাফও নিজের মাথার চুল ফেলে দেন।
স্ত্রীর কঠিন সময়ে তাঁর পাশে থাকার বার্তা দিতে পিছিয়ে থাকেননি স্বামী এস এম রেজাউল ইমরানও। সামিয়ার কষ্ট যেন একা তাঁরই বহন করতে না হয়, সেই অনুভূতি থেকেই মাথা ন্যাড়া করেন তিনিও। পরিবারের সদস্যদের এমন ভালোবাসা ও সমর্থন সামিয়ার ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে হয়ে উঠেছে সাহসের বড় শক্তি।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর মাথা ন্যাড়া করার সেই মুহূর্তের একটি ভিডিও ফেসবুকে প্রকাশ করেন সামিয়া। সেখানে কেমোথেরাপির কারণে চুল হারানোর বিষয়টি নিয়ে নিজের উপলব্ধির কথাও তুলে ধরেন তিনি। চুল পড়ে যাওয়া নিয়ে মন খারাপ না করে পরিস্থিতিকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এই উপস্থাপক।
সামিয়ার উপলব্ধি, সবকিছু নিয়ে মন খারাপ করে লাভ নেই; বরং সময়ের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর এই ইতিবাচক মনোভাবের পাশাপাশি স্বামী ও সন্তানের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা কঠিন সময়ে পরিবারের পাশে থাকার এক আবেগঘন দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি সামিয়া গণমাধ্যমকে বলেন, ‘চুল তো মানুষের বাহ্যিক সৌন্দর্য। চুল থাকুক বা না থাকুক, আত্মবিশ্বাসটাই মূল। আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। হাঁটাচলা করতে পারছি, এটাই অনেক বড় পাওয়া।’ ২০২২ সালে প্রথম কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার খবর জানতে পারেন সামিয়া। চিকিৎসকের পরামর্শে ওই বছরের এপ্রিলে সিঙ্গাপুরে যান তিনি। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানতে পারেন, ক্যান্সার চতুর্থ পর্যায়ে পৌঁছেছে। অস্ত্রোপচার ও কেমোথেরাপির কথা শুনে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। এমনকি কোনো চিকিৎসা না করিয়েই দেশে ফিরে আসার কথাও ভেবেছিলেন।
সামিয়া বলেন, ‘চিকিৎসক দেবর যখন প্রথম খবরটা দিল, ভেবেছিলাম, যখন হয়েই গেছে, তখন আর কী করা যাবে! সন্ধ্যায় সেজেগুজে দাওয়াত খেতেও গিয়েছি। কিন্তু সিঙ্গাপুরে গিয়ে যখন শুনলাম ক্যান্সার চতুর্থ পর্যায়ে, অস্ত্রোপচার করতে হবে, কেমোথেরাপি দিতে হবে, তখন ভেঙে পড়ি। অনেক কান্নাকাটি করেছি। মনে হয়েছিল, চিকিৎসা নিলে আমার পুরো জীবনযাপন বদলে যাবে।’ পরে সিঙ্গাপুরের এক চিকিৎসক তাকে ইমিউনোথেরাপির পরামর্শ দেন। ব্যয়বহুল এই চিকিৎসা নিতে রাজি হন সামিয়া। শুরু হয় ক্যান্সারের বিরুদ্ধে তার নতুন লড়াই।
প্রতি ২১ দিন পরপর নিতে হতো এই চিকিৎসা। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও ছিল তীব্র। প্রথম থেরাপির পর ঢোক গিলতে পারতেন না, ত্বকে চুলকানি হতো। সিঙ্গাপুরে যাওয়ার সময় হেঁটে চলাফেরা করলেও ফেরার সময় হুইলচেয়ারের প্রয়োজন হয়েছিল। ২০২৩ সালে দেশে ফেরার পরও নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগেছেন তিনি। একপর্যায়ে পাতলা পায়খানার সমস্যায় ডায়াপার পরে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় তাকে।
যন্ত্রণার তীব্রতা বোঝাতে গিয়ে সামিয়া বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবে সন্তান প্রসবের সময় যে যন্ত্রণা হয়, অনেকটা সে রকম যন্ত্রণা হতো।’ এত কষ্টের মধ্যেও চিকিৎসা চালিয়ে গেছেন সামিয়া। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার সময় প্রথম দিকে স্বামী, ননদসহ পরিবারের সদস্যরা তার সঙ্গে যেতেন। পরে একাই যাতায়াত শুরু করেন তিনি। পরিবারের অন্যদের কাজ থাকত, পাশাপাশি নিজেরও শক্ত থাকার ইচ্ছা ছিল তার।
চিকিৎসায় সাড়া পেয়ে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরছিলেন সামিয়া। কিন্তু নিয়মিত ফলোআপের মধ্যে জেনেটিক পরীক্ষায় আবারও ক্যান্সার ধরা পড়ে। এবার ডিম্বাশয়ে। গত ২২ জুলাই সিঙ্গাপুরে অস্ত্রোপচার করিয়েছেন তিনি। বর্তমানে দেশে চলছে কেমোথেরাপি। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ছয়টি কেমোথেরাপির কোর্স শেষ হওয়ার কথা।
এবারের চিকিৎসার অভিজ্ঞতা জানিয়ে সামিয়া বলেন, ‘খাবারে স্বাদ-গন্ধ কিছুই পাই না। মুখ লাল হয়ে যায়, মাথা চুলকায়। তবে কাউকে এই যন্ত্রণা বলে বোঝানো যাবে না। যিনি এর মধ্য দিয়ে যাবেন, তিনিই বুঝবেন।’ জেনেটিক পরীক্ষায় শরীরে জিনগত ত্রুটি ধরা পড়েছে বলেও জানিয়েছেন সামিয়া। ভবিষ্যতে শরীরের অন্য কোথাও ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবু আশা ছাড়তে চান না তিনি। তার ভাষ্য, ‘আশা করছি, শরীরে আর ক্যান্সার ফিরে আসবে না।’
স্বামী, দুই ছেলে এবং বাবা অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী আবদুর রহিম ও মা জীবন নাহারকে নিয়ে বনানীতে থাকেন সামিয়া। ২৭ বছরের দাম্পত্য জীবনে কঠিন সময়গুলোতে স্বামী রেজাউল ইমরানকে পাশে পেয়েছেন তিনি। নিজের বাবা ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের কাছ থেকেও শুরু থেকেই সহযোগিতা পাচ্ছেন। মায়ের অসুস্থতা যে পরিবারের সবার জীবনেই প্রভাব ফেলেছে, তা বুঝতে পারেন বড় ছেলে আহানাফ আরাবি। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ পড়ছেন তিনি। মায়ের প্রথমবার ক্যান্সার শনাক্ত হওয়ার সময় কানাডায় পড়াশোনা করছিলেন আহানাফ। মায়ের পাশে থাকতে পড়াশোনা ছেড়ে দেশে ফিরে আসেন। পরে দেশে নতুন করে পড়াশোনা শুরু করেন।
মায়ের মাথা ন্যাড়া করে দেওয়া এবং নিজেও চুল ফেলে দেওয়ার কারণ জানিয়ে আহানাফ বলেন, ‘মাকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্যই চুল কেটে দিই। নিজের চুলও কেটে ফেলি। ভালোই লেগেছে। ক্যাম্পাসে গেলে বন্ধুরা চুল ফেলে দেওয়ার কারণ জানতে চেয়েছে। মায়ের কথা বলার পর সবাই সাপোর্ট করেছে।’ মায়ের অসুস্থতা নিজের জীবনেও কীভাবে প্রভাব ফেলে, তা বোঝাতে গিয়ে আহানাফ বলেন, ‘যা-ই করি, মাথায় থাকে মায়ের তো ক্যান্সার।’ সামিয়ার পরিবারে আরো একজন সন্তানের দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। নিজের ভাইয়ের ছেলে আয়মান আওসাফের আইনি অভিভাবকত্ব নিয়েছেন সামিয়া। আয়মান এখন ও লেভেলে পড়ছে।
সামিয়া মনে করেন, ক্যান্সারের চিকিৎসায় শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি মানসিক চাপ সামলানোও জরুরি। রোগী অনেক সময় অল্পতেই রেগে যান, কাউকে সহ্য করতে পারেন না, কোনো কিছু মেনে নিতে চান না। এ সময় পরিবারের সদস্যদের ধৈর্য ও মানসিক সমর্থন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
গত বছরের ২০ মার্চ রাজধানীর বনানীতে ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের সহায়তায় আয়োজিত ‘রিভোগ ওয়্যার টু কেয়ার’ নামের পোশাক প্রদর্শনীতে নিজের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার কথা প্রকাশ্যে জানান সামিয়া। এর আগে কাছের মানুষ ছাড়া অনেকেই তার অসুস্থতার কথা জানতেন না। এরপর থেকে সামাজিকযোগাযোগমাধ্যমে ক্যান্সার নিয়ে নিয়মিত লিখছেন তিনি। বিশেষ করে রোগের সঙ্গে বসবাস করেও কীভাবে মানসিকভাবে শক্ত থাকা যায়, সে বিষয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন ফেসবুকে।
সামিয়া বলেন, ফেসবুকে অনেকেই ক্যান্সারের যন্ত্রণার কথা লেখেন। কিন্তু তিনি শুধু কষ্টের কথা জানাতে চান না। তার পোস্ট পড়ে কোনো রোগী কিংবা তার পরিবারের সদস্য সামান্য হলেও মানসিক শক্তি পেলে সেটাই তার কাছে বড় অর্জন। সামাজিকযোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই নেতিবাচক মন্তব্য করেন। তবে নিজের পোস্টের মন্তব্যে এমন ঘটনা খুব কমই দেখেছেন বলে জানান সামিয়া। এটাকেও বড় পাওয়া মনে করেন তিনি।
নিয়মিত ব্যায়াম করা ও খাদ্যাভ্যাস ঠিক রাখার বিষয়ে বরাবরই সচেতন ছিলেন সামিয়া। তবু ক্যান্সার তার জীবনে ফিরে এসেছে। এই অভিজ্ঞতা তাকে বুঝিয়েছে, অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই শুধু চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; প্রতিদিনের জীবনকেও নতুন করে গুছিয়ে নিতে হয়।
সামিয়া আগে থেকেই ‘পারপাস বাই সামিয়া’ নামে একটি পডকাস্ট করছেন। সেখানে ক্যান্সারে আক্রান্ত ব্যক্তিরা নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন, যা অন্যদের সাহস জোগাতে পারে। উজ্জ্বলা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসেবেও ক্যান্সার রোগীদের জন্য মেডিক্যাল ক্যাম্প আয়োজন ও তহবিল সংগ্রহের কাজ করছেন তিনি।
ক্যান্সারের চিকিৎসার ব্যয় কমানো ও এ রোগ নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে ভবিষ্যতে আরও কাজ করতে চান সামিয়া। তবে আপাতত চিকিৎসার বাইরে নতুন কোনো কাজে যুক্ত হতে চান না তিনি। কেমোথেরাপি শেষ হওয়া পর্যন্ত উপস্থাপনা কিংবা অন্য কাজ নিয়ে ভাবছেন না সামিয়া। গান শুনতে ও নিজেও গাইতে ভালোবাসেন তিনি। সময় কাটান বারান্দার গাছপালার সঙ্গে। পাশাপাশি নিজের দুই বিড়ালকে খাওয়ানো ও তাদের সঙ্গে সময় কাটিয়েও দিন পার করেন সামিয়া।
