রাষ্ট্রদ্রোহ, সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের মামলায় অবসরপ্রাপ্ত দুই সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল দেবাশীষ কুমার বড়ুয়া ও লেফটেন্যান্ট কাজী গুলশান আরার চার দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দিদারুল আলম শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।
দুই সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের চেষ্টা, সরকারবিরোধী তৎপরতা, সহিংসতায় উসকানিমূলক ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার
এবং দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকার অভিযোগ এনেছে পুলিশ। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আসামিদের বক্তব্য জানা যায়নি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগের পরিদর্শক শেখ বশির আহমেদ দুই আসামিকে আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন।
রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, আসামিরা নিজেদের বাসায় অবস্থান করে ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সাপোর্টারস আলফা’ ও ‘বিবিএম ট্রান্সপারেন্সি’ নামের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত থেকে তহবিল সংগ্রহ এবং সহিংসতায় উসকানিমূলক ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করে সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করছিলেন। এ ছাড়া অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত ‘ইউনিটি কেয়ার’ ও ‘পাবলিক পার্লামেন্ট’ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পলাতক শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন এবং রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ওই বছরের ২৭ নভেম্বর দেড় শতাধিক অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে গণভবনে গিয়ে গুলশান আরা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি প্রকাশ্যে একাত্মতা ও আনুগত্য প্রকাশ করেন। এ ছাড়া ১০১ জন সহযোগীকে নিয়ে ‘বঙ্গবন্ধু সেনা পরিষদ’ নামে একটি কমিটি গঠন এবং সংগঠনটির সক্রিয় সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
রিমান্ড আবেদনে পুলিশ আরও দাবি করে, ‘কালআজকাল ডটকম’ নামে একটি পেজ তৈরি করে সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতা উসকে দেওয়ার মতো কনটেন্ট প্রচার করা হচ্ছিল। সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন পোস্ট ও কার্যক্রমের মাধ্যমে আইনবলে প্রতিষ্ঠিত সরকারের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগও করা হয়েছে। আসামিদের সঙ্গে দেশি-বিদেশি গুপ্তচরের যোগাযোগ রয়েছে দাবি করে পুলিশ বলেছে, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে রাষ্ট্রদ্রোহের ঘটনায় জড়িত অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
শুনানিতে দেবাশীষের পক্ষে আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল মনসুর রিপন রিমান্ড বাতিল ও জামিনের আবেদন করেন। তিনি বলেন, তার মক্কেলের বিরুদ্ধে দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত বা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে সহিংস কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই। গ্রেপ্তারের পর থেকে তারা পুলিশের হেফাজতে ছিলেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, রিমান্ড আবেদনের কারণও ইতোমধ্যে পূরণ হয়েছে।
গুলশান আরার পক্ষে আইনজীবী মশিউর রহমান বলেন, তার মক্কেল অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা এবং বর্তমানে ব্যবসা করছেন। সেনাবাহিনীতে চাকরি করার কারণে সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা অস্বাভাবিক নয়। ফেসবুক পেজ খোলা বা কনটেন্ট তৈরি করাই অপরাধ প্রমাণ করে না বলে তিনি যুক্তি দেন। এ সময় তিনি তার মক্কেলের রিমান্ড বাতিল ও জামিন চান।
রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর হারুন-অর-রশীদ রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, আসামিরা সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে দলটির পুনর্বাসনের চেষ্টা করছিলেন। তাদের সঙ্গে দেশি-বিদেশি গুপ্তচরদের যোগাযোগ এবং দেশের অভ্যন্তরীণ তথ্য পাচারের অভিযোগ তদন্ত করা প্রয়োজন। এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানতে তিনি আসামিদের সর্বোচ্চ রিমান্ড মঞ্জুরের আবেদন করেন। আদালত তাদের চার দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
গত ১১ অক্টোবর রাতে ঢাকার দুটি এলাকা থেকে দেবাশীষ কুমার বড়ুয়া ও কাজী গুলশান আরাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। পরে তাদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মো. আলী আকবর পল্লবী থানায় মামলাটি করেন। মামলায় দণ্ডবিধির রাষ্ট্রদ্রোহের ধারা ১২৪(ক), সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ এবং সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫-এর সংশ্লিষ্ট ধারা যুক্ত করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্র বলেছে, গ্রেপ্তার হওয়া লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) দেবাশীষ কুমার বড়ুয়াকে ২০২২ সালে সেনাবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদের ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন কর্মকর্তাদের একজন ছিলেন। অন্যদিকে লেফটেন্যান্ট কাজী গুলশান আরা ২০০৬ সালে স্বেচ্ছায় সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন।
