টাইগার শ্রফ থেকে সালমান খান, বলিউড তারকাদের উপর হামলার ঘটনায় নাম আসা বিষ্ণোই গ্যাং কারা?
কম ডেটা ব্যবহার করতে শুধু টেক্সট পড়ুন

ছবির উৎস, Getty Images
Published
পড়ার সময়: ৬ মিনিট
বলিউড অভিনেতা টাইগার শ্রফের গাড়িতে রবিবার সন্ধ্যায় মুম্বাইয়ে অজ্ঞাত হামলাকারীরা গুলি চালিয়েছে। মুম্বাই পুলিশের মতে, এ ঘটনায় দুজন আহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে টাইগার শ্রফের চালক ফিরদৌসও রয়েছেন। তার বাঁ হাতে গুলি লেগেছে।
মুম্বাই পুলিশের ডিসিপি মোহিত গর্গ জানিয়েছেন, "টাইগার শ্রফ নিরাপদ আছেন। তার গুলি লাগেনি এবং তিনি আহত হননি।"
এ ঘটনাকে ঘিরে বিরোধী দলগুলি রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কংগ্রেস এবং শরদ পওয়ারের এনসিপি বলেছে, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সাধারণ মানুষকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।
এআইএমআইএম নেতা ওয়ারিস পাঠান একে 'আইনশৃঙ্খলার সম্পূর্ণ ব্যর্থতা' বলে অভিহিত করেছেন।
গত কয়েক বছরে বলিউডের একাধিক ব্যক্তিত্বের ওপর প্রাণঘাতী হামলার চেষ্টা হয়েছে, এবং টাইগার শ্রফের ওপর হওয়া এ হামলা আবারও এমন ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে চলচ্চিত্র জগতের যেসব শিল্পী হামলার শিকার হয়েছেন বা হামলাকারীদের নিশানায় ছিলেন, তাদের মধ্যে অভিনেতা সালমান খান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
শিবসেনা-ইউবিটি'র সাবেক রাজ্যসভার সাংসদ প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী অভিনেতা টাইগার শ্রফের ওপর হওয়া গুলিবর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী অভিনেতা সালমান খান, পরিচালক রোহিত শেট্টি এবং এনসিপি নেতা বাবা সিদ্দিকীর ওপর হওয়া হামলার কথাও উল্লেখ করেছেন।
প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, "বিষ্ণোই গ্যাং সালমান খানকে নিশানা করার চেষ্টা করেছিল, তারপর রোহিত শেট্টির পালা আসে। একইভাবে, এর আগে আমরা বাবা সিদ্দিকীকে হারিয়েছি এবং এখন টাইগার শ্রফের ঘটনা সামনে এলো।
এসবই ঘটছে মুম্বাইয়ে, যাকে দেশের সবচেয়ে নিরাপদ শহরগুলোর একটি বলে মনে করা হয়। হে সরকার, আপনারা কোথায়?"
অন্যদিকে, কংগ্রেস এবং শরদ পাওয়ারের এনসিপি বলেছে যে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সাধারণ মানুষকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।
এদিকে, মুম্বাইয়ের উপমুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডে বলেছেন যে টাইগার শ্রফের ওপর হামলাকারী দোষীদের কোনোভাবেই ছাড় দেয়া হবে না।
আগের বেশ কয়েকটি হামলার ঘটনার মত টাইগার শ্রফের ঘটনায়ও উঠে এসেছে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের নাম।
কিন্তু কারা এই লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং? কেনই বা তারা বলিউড সেলিব্রিটিদের ওপর হামলার চেষ্টা করছেন?

ছবির উৎস, Getty Images
লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং কারা এবং তারা কী চান?
লরেন্স বিষ্ণোই নামক এক ব্যক্তি ২০১৮ সালে বলিউড অভিনেতা সালমান খানকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছিলেন।
মুম্বাই পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, তার অনুসারী শুটাররা মুম্বাইয়ে সালমান খানের বাড়ির বাইরে গুলি ছুঁড়েছিল। ওই ঘটনায় তিনজন শুটারকে সেসময় গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল।
সেই সময় রাজস্থানের যোধপুর শহরে আদালতে হাজিরার জন্য জেলে আনা হলে লরেন্স বিষ্ণোই সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, "সালমান খানকে যোধপুরেই হত্যা করা হবে। তখন তিনি আমাদের প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে জানতে পারবেন।"
প্রায় তিন দশক আগে ১৯৯৮ সালে বিরল প্রজাতির কৃষ্ণসার হরিণ শিকারের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন বলিউড সুপারস্টার সালমান খান, তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছিল।
রাজস্থানের পশ্চিমাঞ্চলে একটি চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের সময় সালমান খান সংরক্ষিত প্রজাতির দুটি কৃষ্ণসার হরিণ হত্যা করেছিলেন।
ওই চলচ্চিত্রে তার সঙ্গে অভিনয় করা এবং একই অপরাধে অভিযুক্ত অন্য চারজন অভিনেতাকে আদালত খালাস দিয়েছিল।
বিষ্ণোই সম্প্রদায় কৃষ্ণসার হরিণকে পবিত্র বলে মানে এবং লরেন্স বিষ্ণোই সালমান খানের সঙ্গে তার শত্রুতার কারণ হিসেবেও এ বিষয়টির কথা উল্লেখ করেছিলেন।
কৃষ্ণসার হরিণ শিকারের মামলায় সামনে আসার পর থেকেই সালমান খানকে হুমকি দিয়ে আসছে এ গ্যাং।
এনসিপি নেতা বাবা সিদ্দিকী সালমান খানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন।
তার হত্যাকাণ্ডের পর সামাজিক মাধ্যমে করা এক পোস্টে দাবি করা হয় যে ওই ঘটনায় লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং জড়িত ছিল।
কনভেন্ট স্কুলে পড়াশোনা করে পরে চণ্ডীগড়ের ডিএভি কলেজ থেকে স্নাতক হওয়ার সময় ছাত্ররাজনীতিতে আসা লরেন্স বিষ্ণোই শুধু ভারতেই নয়, বরং আমেরিকা ও কানাডাতেও আলোচিত অপরাধীদের একজন।
বর্তমানে গুজরাত উপকূল থেকে মাদক পাচার চক্র পরিচালনার মামলায় লরেন্স বিষ্ণোই সাবরমতী জেলে বন্দি রয়েছেন।

ছবির উৎস, Mert Alper Dervis/Anadolu via Getty Images
আন্ততর্জাতিক অপরাধেও জড়িয়ে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং
চলতি বছরের জুলাই মাসে, মার্কিন প্রসিকিউটররা যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং ইউরোপ থেকে ২৪ জন সন্দেহভাজনকে গ্রেফতারের ঘোষণা করেছেন।
এই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ভারতের সঙ্গে যুক্ত তিনটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংও রয়েছে। এ অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে 'অপারেশন হার্ড বল'।
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়ায় একটি গুরুদ্বারার বাইরে শিখ নেতা হরদীপ সিং নিজ্জরকে হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগও রয়েছে।
লস অ্যাঞ্জেলেসের ফেডারেল প্রসিকিউটররা জানিয়েছেন, এসব গ্রেপ্তার কয়েক বছর ধরে চলা তদন্তের ফল।
এই তদন্ত ভারতীয় অপরাধী চক্রগুলিকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়েছিল। ওই চক্রগুলির বিরুদ্ধে টার্গেটেড হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি এবং মাদক পাচারের অভিযোগ রয়েছে।
১৯৯৭ সালে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি প্রত্যর্পণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল।
ভারতীয় দূতাবাসের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, এ চুক্তির অধীনে যে অপরাধের অভিযোগে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশের আইন অনুযায়ী অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে হবে এবং সেই অপরাধের জন্য অন্তত এক বছরের কারাদণ্ডের বিধান থাকতে হবে।
প্রত্যর্পণের আবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক মাধ্যমে পাঠানো হয়। এই চুক্তির অধীনে কাউকে প্রত্যর্পণের জন্য কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম নির্ধারিত আছে।
মার্কিন ফেডারেল প্রসিকিউটর এবং ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) তাদের 'অপারেশন হার্ড বল'-এর আওতায় বিশ্বজুড়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তিনটি চার্জশিট দাখিল করেছে।
এই অভিযান যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং ইউরোপের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলির একটি বৃহৎ যৌথ উদ্যোগ।
এই অভিযোগপত্রগুলিতে 'খালিস্তানপন্থী' এক কর্মীর হত্যার ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যাকে আদালতের নথিতে হরদীপ সিং নিজ্জর হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তিনি কানাডায় বসবাস করতেন।
হত্যাকাণ্ডের এ মামলায় লরেন্স বিষ্ণোই এবং আরেক গ্যাংস্টার গোল্ডি ব্রারের বিরুদ্ধে হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
২০২৩ সালের ১৮ই জুন ব্রিটিশ কলম্বিয়ার সারে শহরে একটি গুরুদুয়ারা থেকে বেরিয়ে আসার সময় দুই বন্দুকধারী গুলি করে হরদীপ সিং নিজ্জরকে হত্যা করে।

ছবির উৎস, Getty Images
লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের টার্গেটে যে বলিউড তারকারা
গত কয়েক বছরে বলিউডের সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যক্তিত্বের ওপর প্রাণঘাতী হামলার চেষ্টা হয়েছে, এবং টাইগার শ্রফের ওপর হওয়া এই হামলা আবারও এমন ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।
এর মধ্যে সব লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত না থাকলেও সালমান খানের ঘনিষ্ঠদের উপর আক্রমণে বার বার এ গ্যাংয়ের নাম উঠে আসে।
চলচ্চিত্র নির্মাতা রোহিত শেট্টির মুম্বইয়ের জুহুতে অবস্থিত বাড়িতে ২০২৬ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি ভোরের দিকে গুলিচালনার ঘটনা ঘটে।
ওই ঘটনায় নাম জড়িয়েছিল আমোল বিষ্ণোইয়ের যিনি সম্পর্কে লরেন্স বিষ্ণোইয়ের ভাই।
মুম্বাই পুলিশের চার্জশিটে রোহিত শেট্টির বাড়িতে বন্দুকধারীদের পাঠানোর পেছনে আমোল বিষ্ণোইয়ের যোগসাজশ আছে বলে অভিযোগ করা হয়েছিল।
আমোল বিষ্ণোই ওই বন্দুকধারীর সঙ্গে তার কথোপকথনের ঘটনা স্বীকারও করেছিলেন।

ছবির উৎস, Getty/BBC
আরো যে তারকারা হামলার শিকার হয়ছেন
দিশা পাটানি
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে উত্তর প্রদেশের বারেলিতে অভিনেত্রী দিশা পাটানির বাবা জগদীশ পাটানির পৈতৃক বাড়ির বাইরে অজ্ঞাত বন্দুকধারীরা গুলি চালায়।
সামাজিক মাধ্যমে গোল্ডি ব্রার এবং রোহিত গোদারা গ্যাং ওই হামলার দায় স্বীকার করেছিল।
সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, আধ্যাত্মিক গুরুদের সম্পর্কে দিশার বোন খুশবু পাটানির কথিত কিছু মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে এই গুলিবর্ষণকে গ্যাংটি একটি সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছিল।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত দুই হামলাকারী পরে গাজিয়াবাদে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয়।
রাকেশ রোশন
অভিনেতা হৃতিক রোশনের বাবা চলচ্চিত্র নির্মাতা রাকেশ রোশন ২০০০ সালের ২১শে জানুয়ারি একটি হামলা থেকে অল্পের জন্য বেঁচে যান। সেদিন মুম্বাইয়ে তার অফিসের বাইরে দুই অজ্ঞাত বন্দুকধারী তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। তার হাত ও বুকে গুলি লেগেছিল, তবে তিনি ওই হামলা থেকে প্রাণে বেঁচে যান।
ঘটনাটি ঘটে তার ছেলে হৃতিক রোশনের প্রথম ছবি 'কহো না পেয়ার হ্যায়'-এর সাফল্যের পর। জানা যায়, চাঁদাবাজির টাকা দিতে অস্বীকার করায় রাকেশ রোশনকে নিশানা করা হয়েছিল।
বিবিসির এক সাক্ষাৎকারে করণ থাপারের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে হৃতিক সেই মানসিক আঘাতের স্মৃতি তুলে ধরেন, যখন তার প্রথম ছবি নিয়ে চারদিকে আলোচনা চলছিল এবং তিনি গুলিবর্ষণের ঘটনার খবর পান।
হৃতিক বলেন, "বাবার বুকে এবং হাতে গুলি লেগেছিল। আমার মনে আছে, তিনি আমাকে ফোন করেছিলেন, কারণ তিনি চিন্তিত ছিলেন আমি ঠিক আছি কি না।"
তিনি জানান, তার বাবার আশঙ্কা ছিল যে পরিবারের অন্য সদস্যরাও বিপদের মুখে পড়তে পারেন।
রাজীব রাই
'গুপ্ত' সহ বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র পরিচালনার জন্য পরিচিত চলচ্চিত্র নির্মাতা রাজীব রাই ১৯৯৭ সালে এক বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন, যখন আবু সালেম গ্যাংয়ের সঙ্গে কথিতভাবে যুক্ত পাঁচজন হামলাকারী মধ্য মুম্বাইয়ে তার ওপর আক্রমণ চালায়।
মি. রায় তার অফিস থেকে বেরিয়ে আসার সময় হামলাকারীরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়।
এর আগে পাওয়া হুমকির কারণে পুলিশের পক্ষ থেকে তার নিরাপত্তার জন্য দেহরক্ষী নিয়োগ করা হয়েছিল।
এই দেহরক্ষীরা সামনে এসে হামলাকারীদের মোকাবিলা করেন এবং তাদের তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হন। জানা যায়, ওই ঘটনায় একজন হামলাকারী আহত হয়েছিল।
