দরজায় কড়া নাড়ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। গতবারের চেয়ে এবার তিনটি বেড়ে জেলায় ১৫৩টি পূজামণ্ডপে এ উৎসবের আয়োজন করা হচ্ছে। জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, এবার ফেনী জেলার ১৫৩টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে।
ফেনী সদর উপজেলায় ৫৩টি, ফেনী পৌরসভায় ১২টি, ফুলগাজীতে ৩৪টি, ছাগলনাইয়ায় ৫টি, পরশুরামে ৭টি, দাগনভূঞায় ১৯টি এবং সোনাগাজীতে ২৩টি পূজামণ্ডপ রয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিতে কঠোর ব্যবস্থা জোরদার করা হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
শহরের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিমাগুলোকে নানা সাজে সজ্জিত করা হচ্ছে। রঙের আঁচড়ে দেবী দুর্গাকে সাজিয়ে তোলা হচ্ছে নানা রঙে। পূজা ঘনিয়ে আসায় এখন রাত দিন ব্যস্ত সময় পার করছে শিল্পীরা। প্রতিটি প্রতিমাকে রঙ-তুলির নিপুণ আঁচড়ে রাঙাতে ব্যস্ত শিল্পীরা। চলছে সাজ-সজ্জার কাজও। দেবী দুর্গার সঙ্গে সাজিয়ে তোলা হচ্ছে কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী আর সরস্বতী দেবীকেও। যেন দম ফেলার ফুসরত নেই শিল্পীদের।
দেবী দুর্গা তৈরির কাজে ব্যস্ত শিল্পীরা জানান, এ বছর পূজায় অন্যরকম একটি ভালোলাগা কাজ করছে। আগের থেকে কাজ বেড়েছে। যে কয়টির দায়িত্ব পেয়েছি সবকটি প্রতিমার মাটির কাজ প্রায় শেষ। এখন রং-তুলিসহ সাজসজ্জার কাজ চলছে। রং ও সাজ সজ্জার কাজ শেষ হলে এখান থেকে প্রতিমাগুলো জেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে পাঠানো হবে। তারা বলেন, শুধুমাত্র অর্থ উপার্জন নয় ধর্মীয় অনূভুতি থেকে তারা এসব প্রতিমা তৈরির কাজ করেন।
পূজা উদযাপন উপলক্ষে উচ্ছ্বসিত সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। অনিক মোহন নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, পূজাতে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। ঘরে ঘরে আনন্দ উৎসব চলছে। সবাই মিলে পূজার প্রস্তুতি নিচ্ছি। নতুন জামাকাপড় কেনাকাটা করছি। পিঠাপুলি ও মিষ্টান্ন বানানোর জন্য সবাই মিলেমিশে কাজ করছি। এবার পূজাতে বেশী করে আনন্দ করার প্রস্তুতি নিচ্ছি।
সম্রাট হাসান নামে বড় বাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, পূজা কেন্দ্র করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মানুষরা কেনাকাটা করছে। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও পূজা ঘনিয়ে আসাতে বেচাবিক্রি কিছুটা বেড়েছে।
পৌর পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সুরঞ্জিত নাগ বলেন, পৌর এলাকায় ১২টি পূজামণ্ডপে প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। শেষ মূহুর্তে রঙ তুলির আঁচ দেয়ার কাজ চলছে। শহরের বেশিরভাগ মন্দিরে বড় আকারে পূজা উদযাপনের প্রস্তুতি চলছে। এরমধ্যে মধুপুরে ঝাঁকজমকভাবে পূজা উদযাপিত হবে। নিরাপত্তার জন্য আমাদের নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক থাকবে। দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনায় আমরা প্রার্থনা করব, আমাদের আশা সুশৃঙ্খল ভাবে আমাদের ধর্মীয় উৎসব উদযাপিত হবে।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট সমীর কর বলেন, পূজা যাতে নির্বিঘ্ন উদযাপিত হয় এটিই আমাদের প্রত্যাশা। পূজা চলাকালীন বিদ্যুৎ সরবরাহ, ফায়ার সার্ভিস ব্যবস্থা রাখা, সিসি ক্যামেরা, পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক রাখা, জরুরি সেবার জন্য কন্ট্রোল রুম ব্যবস্থা রাখার কথা জেলা প্রশাসনকে জানিয়েছি। এখন পর্যন্ত আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা নেই। পুলিশ, এসআরবি জেলা প্রশাসন পূজা মণ্ডপ সার্বক্ষণিক পরিদর্শন করছেন।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ফেনী শহরসহ প্রত্যেক উপজেলার পূজামণ্ডপে নিরাপত্তা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে কঠোর অবস্থানে থাকবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পূজায় নিরাপত্তার জন্য জেলা পর্যায়ে ও উপজেলা পর্যায়ে প্রস্তুতি সভা করেছে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন। ইতোমধ্যে জেলার ফুলগাজী, পরশুরাম, ছাগলনাইয়া এবং সোনাগাজী ও দাগনভূঁঞা উপজেলার পূজা মণ্ডপ পরিদর্শন করেছেন কেলা প্রশাসন ও জেলার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা।
সার্বিক প্রস্তুতির বিষয়ে ইতোপূর্বে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাহবুবউল করিম বলেন, ফেনীতে পূজা সুশৃঙ্খলভাবে উদযাপন করতে নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সুন্দরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। কোনো সমস্যা দেখা দিলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। নিরাপত্তাজনিত বিষয়ে পুলিশের একার পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব নয়। স্থানীয় মন্দির ব্যবস্থাপনা কমিটিকে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, গুজব, অতিরঞ্জিত কিছু যেন না হয়,সবাইকে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। প্রশাসন এ বিষয়ে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করবে, কোনো ঘাটতি থাকবে না।
পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার বলেন, নির্বিঘ্নে পূজা উদযাপনে পুলিশের দায়িত্ব রয়েছে। সেটা পুলিশ যথাযথভাবে পালন করবে। অধিক গুরুত্বপূর্ণ পূজামণ্ডপগুলোতে পুলিশের নজরদারি বেশি থাকবে। শহরকেন্দ্রিক পূজামণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশেষ নজর দেওয়া হবে।
এসপি বলেন, পুলিশের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকদের নজরদারি এবং সিসি ক্যামেরার ব্যবস্থা করতে হবে। নিজেদের মধ্যে বিভেদ দূর করে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। মন্দিরে পুলিশের নিরাপত্তা বাহিনী থাকবে। কোনো নাশকতাকারী বা দুষ্কৃতকারীর ঠাঁই হবে না।
রঙ-তুলিতে ব্যস্ত প্রতিমা শিল্পীরা
বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, শারদীয় দুর্গাপূজাকে ঘিরে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে বইছে উৎসবের আমেজ। পূজার আয়োজন ঘিরে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। কোথাও প্রতিমায় রঙ করা হচ্ছে, কোথাও পরানো হচ্ছে অলংকার, আবার কোথাও চলছে মণ্ডপ সাজানোর কাজ। উৎসবকে শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্ন করতে নেওয়া হয়েছে চার স্তরের নিরাপত্তা-ব্যবস্থা।
প্রতিমাশিল্পীরা খড়, বাঁশ, সুতলি ও কাদা-মাটি দিয়ে প্রতিমার কাঠামো তৈরির পর রংতুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলছেন দেবী দুর্গার প্রতিচ্ছবি। একই সঙ্গে তৈরি করা হচ্ছে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ ও অসুরের প্রতিমা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগর ও আয়োজকরা।
দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে জেলার প্রতিটি উপজেলায় পূজা উদযাপন কমিটি, মন্দির ও মণ্ডপগুলো প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে ব্যস্ত সময় পার করছে। এর মধ্যে রয়েছে প্যান্ডেল নির্মাণ ও সাজসজ্জা, প্রতিমা স্থাপন, আলোকসজ্জার ব্যবস্থা এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি। উৎসব চলাকালীন ভক্ত ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা এবং নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে স্বেচ্ছাসেবী কমিটি গঠনের পাশাপাশি পূজা উদযাপন কমিটি এবং স্থানীয়রা কাজ করে যাচ্ছে।
ফেনী গুরুচক্র মন্দিরের প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন শিল্পী কানাই পাল। তিনি বলেন, এবার ২৫টি মণ্ডপের প্রতিমা তৈরি করছি। মাটি, বাঁশ খড় ও কারিগরদের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় উপযুক্ত দাম না পেলেও ধর্মীয় অনূভুতি থেকে তারা কাজ করে যাচ্ছি। শেষ মূহুর্তের প্রস্তুতি সম্পন্ন করছি, হালকা কিছু কাজ বাকি। আগামী একদিনের মধ্যে সকল প্রতিমা মন্দিরগুলোতে পাঠানো শুরু হবে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, আগে যেমন পূজা আসার খবরে আমেজ থাকত, আনন্দ থাকত এখন খানেকটা কমে গেছ মনে হচ্ছে, তবুও বড় উৎসব আমরা সে হিসেবে প্রতিবছরের ন্যায় কাজ শেষ করছি।
আরেকজন শিল্পী মধুপাল বলেন, এখন কষ্ট করছি কিন্তু দূর্গা মা যখন সম্পূর্ণ সাজে মণ্ডপে বসবে তখন সকল কষ্ট দূর হবে। নিজেকে স্বার্থক মনে হবে। মনের আনন্দেই কাজগুলো করি।
ঘোড়ায় চড়ে আসবেন দুর্গা, ফিরবেন নৌকায়
পূজার সূচি অনুযায়ী, গত শনিবার (১০ অক্টোবর) মহালয়ার মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার ক্ষণগণনা শুরু হয়েছে। আগামী ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। এরপর ঢাকের বাদ্য, কাঁসর ও উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠবে পূজামণ্ডপগুলো। ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে এ উৎসবের সমাপ্তি ঘটবে।
শাস্ত্রমতে, এবার দেবী দুর্গার আগমন ও গমনের বাহন ঘোড়া ও নৌকা, অর্থাৎ দেবী দুর্গা এ বছর ঘোড়ায় (ঘোটক) চড়ে আসবেন এবং নৌকায় চড়ে বিদায় নেবেন। পাঁচ দিনব্যাপী এই উৎসবের প্রথম দিন মহাষষ্ঠী, দ্বিতীয় দিন মহাসপ্তমী, তৃতীয় দিন মহাঅষ্টমী ও চতুর্থ দিনে মহানবমী এবং শেষ দিনে বিজয়া দশমী যথাযথ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পালিত হবে।
পূজা উদযাপনের বিষয়ে সুলতানপুর রক্ষাকালী মন্দিরের পুরোহিত মিহির চক্রবর্তী বলেন, এবার দূর্গা মা ঘোটকে এসে নৌকায় চড়ে কৈলাসে যাবেন। আগামী ১৬ অক্টোবর ৬ষ্ঠী পূজার মাধ্যমে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। বিকালে অধিবাস হবে। ৭মীতে প্রথমদিনের পূজা উদযাপন হবে। পরবর্তীতে ৮মী, নবমী পূজা উদযাপন শেষে বিজয়া দশমীর মাধ্যমে পূজা শেষ হবে। দূর্গা মায়ের আগমনী বার্তা মহালয়ার মাধ্যমে শুরু হয়েছে। আমরা আরাধনা করব, বিশ্বের সব কিছুর শান্তি কামনায় আর্চনা করব। দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করা হবে বলে জানান তিনি।
