বিদেশের শ্রমবাজারে লাখো বাংলাদেশির ঘাম ও শ্রমে সচল দেশের অর্থনীতি। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সে সমৃদ্ধ হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার, স্বস্তি পাচ্ছে অসংখ্য পরিবার। অথচ বিদেশের মাটিতে কোনো বাংলাদেশি গ্রেপ্তার, নির্যাতন কিংবা মৃত্যুর মুখোমুখি হলে তার পাশে রাষ্ট্র কতটা কার্যকরভাবে দাঁড়ায়, সেই প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায়।
গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) সৌদি আরবের মক্কা অঞ্চলে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ডের’ অভিযোগে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তবে অভিযোগের বিস্তারিত, বিচারপ্রক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এবং তারা আইনজীবী পেয়েছিলেন কি না, তা প্রকাশ্যে আসেনি।
বাংলাদেশের জেদ্দা কনস্যুলেট জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। পরে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত জানতে কূটনৈতিক চিঠি পাঠানো হয়।
ঘটনাটি শুধু দুই নাগরিকের মৃত্যুর প্রশ্ন নয়; বিদেশে বাংলাদেশের নাগরিকদের আইনি সুরক্ষা এবং দূতাবাসের কার্যকারিতা নিয়েও গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
অর্থনীতির চালিকাশক্তি প্রবাসীরা: বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৩৩.৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে প্রায় ৩৫.৫৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
এই বিপুল অর্থের পেছনে রয়েছেন নির্মাণশ্রমিক, গৃহকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, চালক, কারিগরি পেশাজীবীসহ নানা শ্রেণির প্রবাসী। তাদের পাঠানো অর্থে চলে পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও ঘরবাড়ি নির্মাণ। একই সঙ্গে রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার জোগান এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটিতে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে গেছেন ৭ লাখ ৫২ হাজার ৭১৫ বাংলাদেশি। কিন্তু শ্রমবাজারের এই বিস্তারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কি তাদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা যাচ্ছে?
বিদেশে আটক বাংলাদেশিদের জন্য দ্রুত আইনজীবী নিয়োগ, দোভাষী, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আপিলের সুযোগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ও সৌদি আরব উভয়ই কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশনের পক্ষভুক্ত। এর ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আটক বিদেশি নাগরিককে কনস্যুলার যোগাযোগের অধিকার জানাতে হয় এবং তিনি অনুরোধ করলে সংশ্লিষ্ট কনস্যুলেটকে অবহিত করতে হয়।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোর মাধ্যমে আইনি সহায়তা পেয়েছেন ৩৯৫ জন অভিবাসী শ্রমিক। তাদের মধ্যে নারী ছিলেন মাত্র ১১ জন।
বিদেশে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির তুলনায় আইনি সহায়তার পরিধি কতটা পর্যাপ্ত? বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের মতো গুরুতর মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তি সময়মতো আইনজীবী ও কনস্যুলার সহায়তা পাচ্ছেন কি না, তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী?
নারী কর্মীদের ঝুঁকি আরও বেশি: নারী অভিবাসী কর্মীদের ক্ষেত্রে নির্যাতন, বেতন আটকে রাখা, পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। দ্য ডেইলি স্টারের ২০২৬ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিয়োগকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা অনেক নারী শ্রমিকের কাছে সহায়তা চাওয়ার মতো ফোন বা প্রয়োজনীয় নথিও থাকে না। ফলে দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরাপদ আশ্রয়, স্বাধীন তদন্ত, দ্রুত দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা এবং দায়ী নিয়োগকর্তা ও মধ্যস্থতাকারীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
রেমিট্যান্সের পাশাপাশি চাই জবাবদিহি: সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের ঘটনায় এখন প্রয়োজন বিচারপ্রক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ তথ্য, আইনি প্রতিনিধিত্বের বিবরণ এবং কনস্যুলেটকে অবহিত না করার কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা। একই সঙ্গে বিদেশে আটক বাংলাদেশিদের জন্য জরুরি আইনি সহায়তা, মৃত্যুদণ্ডের মামলার পর্যবেক্ষণ এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
প্রবাসীকল্যাণ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাফল্য শুধু কতজন কর্মী বিদেশে গেলেন বা কত রেমিট্যান্স এলো, তা দিয়ে মাপা যায় না। সংকটে কতজন নাগরিক সহায়তা পেলেন, কতটি নির্যাতনের অভিযোগের নিষ্পত্তি হলো এবং কতজনের অধিকার রক্ষা করা গেল, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রবাসীরা কেবল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যম নন; তারা রাষ্ট্রের নাগরিক। তাদের শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্য যেমন আছে, তেমনি আছে জীবন, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার।
