সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পথে বসলেও ক্ষতিপূরণ জোটেনি। এবারে কিন্তু ব্যতিক্রম। ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ক্ষতিপূরণ দেওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরবে। এতে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়বে।
তারা আরও বলেছেন, ক্ষতিপূরণ দেওয়ায় দেশের পুঁজিবাজারে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। দীর্ঘদিন ধরে মন্দা, অনাস্থা এবং কারসাজির কারণে যে বাজার স্থবির হয়ে পড়েছিল, তা পুনরুজ্জীবিত করতে সরকারের ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা যখন ক্রমাগত মূলধন হারিয়ে বাজারবিমুখ হচ্ছিলেন, ঠিক তখনই এই পদক্ষেপ তাদের মধ্যে নতুন করে আস্থার আলো দেখাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, কেবল নীতিগত-সহায়তা নয়, এভাবে সরাসরি ক্ষতিপূরণ ও প্রণোদনা দেওয়া সম্ভব হলে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ পরিবেশ দ্রুত স্বাভাবিক হবে। বাজারে আস্থা ফেরায় মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং মূলধন বাজারকে শক্তিশালী করতে প্রধান ভূমিকা রাখবে।
আরও পড়ুন
যে প্রক্রিয়ায় অর্থ ফেরত দেওয়া হবে
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুসারে, বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল (আইপিএফ) থেকে গ্রাহকদের এ অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। পাঁচটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের ১৭ হাজার ৩৩২ জন ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীর পাওনা পরিশোধ করবে ডিএসই। এ প্রক্রিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত ৯৭ শতাংশ বিনিয়োগকারী বা গ্রাহক তাদের বিনিয়োগের পুরো টাকা ফেরত পাবেন। এরই মধ্যে এ বিনিয়োগকারীদের একটি অংশকে আইপিএফ ও ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ উদ্যোগে এ পর্যন্ত মোট ৩৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে।
ডিএসইর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিনিয়োগকারীদের ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত পাওনা আইপিএফ থেকে পরিশোধ করা হবে। এতে ১৭ হাজার ৩৩২ জন বিনিয়োগকারীর শতভাগ পাওনা পরিশোধ হবে। এই পাওনার মোট পরিমাণ ৭২ কোটি টাকা। বাকি ৫৯৫ জন বড় বিনিয়োগকারীর অবশিষ্ট পাওনা টাকা উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ হাউসগুলোর শেয়ার, সম্পত্তি ও পরিচালকদের ব্যক্তিগত সম্পদ বিক্রি অর্থ পরিশোধের আইনি পদক্ষেপ চলমান রয়েছে।
ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া দেশের পুঁজিবাজারের জন্য একটি মাইলফলক। অনেকে তাদের জীবনের সঞ্চয় বা পেনশনের সব টাকা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে লোকসান করে মানবেতর জীবনযাপন করছিলেন। ডিএসইর এ পদক্ষেপে বাজারের প্রতি সাধারণ মানুষের হারানো আস্থা অনেকটাই পুনরুদ্ধার হবে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), দুই স্টক এক্সচেঞ্জ, সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) এবং ব্রোকারেস হাউসসহ বাজারসংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। ১৭ হাজার ৯৬৭ জন বিনিয়োগকারীর তথ্য, তাদের বিনিয়োগের হিসাব এবং চূড়ান্ত ব্যালেন্স নির্ধারণ করা কঠিন কাজ ছিল। ডিএসইর ব্যবস্থাপনায় সেই কাজ সম্পন্ন করেছে। এখন বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কাজটিও স্বচ্ছতার সঙ্গে করা হবে।
ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান ,পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পদক্ষেপটি বাজারে আস্থা ফেরাতে অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম, কারসাজি এবং প্রতারণার শিকার হয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা যখন পুজিঁবাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিলেন, তখন এই ধরনের আর্থিক সহায়তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার উদ্যোগ ইতিবাচক বার্তা বহন করেছে। তবে এই ক্ষতিপূরণের অর্থ যেন প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের হাতেই পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, অতীতে অনেক সময় বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে তার সুফল ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা পাননি। সরকারের ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত হবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত রেখে এই ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়াটি দ্রুত এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে হবে।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০১১ সালের ধস-পরবর্তী সময়ে হাজার হাজার ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী তাদের সারা জীবনের সঞ্চয় হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছিলেন। এর পর থেকে বিভিন্ন সময়ে বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও কারসাজিকারীদের দাপট, দুর্বল তদারকি এবং অনিয়মের কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। বারবার প্রতিশ্রুতি এবং স্বল্পমেয়াদি নানা সহায়তা দেওয়া হলেও সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কখনোই তাদের প্রকৃত ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার মতো সুযোগ পাননি। ফলে একটি বড় শ্রেণির বিনিয়োগকারী বাজার ছেড়ে চলে যান এবং যারা রয়ে যান, তারাও নতুন করে বড় কোনো মূলধন খাটানো থেকে বিরত থাকেন। এ অবস্থায় বাজারে তারল্যসংকট তীব্র রূপ নেয় এবং তালিকাভুক্ত ভালো কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দরও অযৌক্তিকভাবে কমতে থাকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিএসইসি কর্তৃক গঠিত পুঁজিবাজার সংস্কার টাস্কফোর্সের সদস্য মো. আল-আমিন খবরের কাগজকে বলেন, সাধারণ বিনিয়োগকারীরাই পুঁজিবাজারে মূলধনের মূল জোগানদাতা। তারা যদি সুরক্ষিত বোধ না করেন, তবে শুধু নীতিগত সংস্কার করে বাজার চাঙা করা সম্ভব নয়। ক্ষতিপূরণ প্রদান প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকারের পক্ষ থেকে এই বার্তা সুস্পষ্ট করা হচ্ছে যে, বিনিয়োগকারীদের অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব এখন অগ্রাধিকার পাচ্ছে। এই পদক্ষেপের কারণে বাজারে নতুন ও পুরোনো উভয় ধরনের বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
চার প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণ
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল থেকে চারটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের দাবি নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- বাংকো সিকিউরিটিজ লিমিটেড, তামহা সিকিউরিটিজ লিমিটেড, ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ লিমিটেড এবং শাহ মোহাম্মদ সগীর অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড।
কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের যাচাই করা এবং এখনো নিষ্পত্তি না হওয়া দাবির বিপরীতে বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিলের বিধান অনুসরণ করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক বিনিয়োগকারী সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ পাবেন। তবে বিজ্ঞপ্তিতে ক্ষতিপূরণ বিতরণের নির্দিষ্ট সময়সীমা বা মোট কতজন বিনিয়োগকারী এ সুবিধা পাবেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়নি।
চার প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চালু রাখার সিদ্ধান্ত
বাংলাদেশ ব্যাংক ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অধীন মোট ১২টি পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএসইসি।
কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দুটি স্টক ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান এবং দুটি মার্চেন্ট ব্যাংকার প্রতিষ্ঠানের নিট সম্পদ পর্যাপ্ত রয়েছে। পাশাপাশি কয়েকটি মূল্যায়ন সূচকেও তাদের অবস্থা সন্তোষজনক হওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালু রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
স্টক ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান দুটি হলো- প্রিমিয়ার লিজিং সিকিউরিটিজ ব্রোকিং লিমিটেড এবং এভিভা ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড। অন্যদিকে মার্চেন্ট ব্যাংকার প্রতিষ্ঠান দুটি হলো- পিএলএফএস ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড এবং প্রাইম ফাইন্যান্স ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড।
সাত প্রতিষ্ঠানকে ঘাটতি পূরণে সময়
নিট সম্পদসহ অন্যান্য সিকিউরিটিজ আইন ও বিধিবিধান পরিপালনে ঘাটতি থাকায় সাতটি পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ঘাটতি নিরসন ও প্রয়োজনীয় নিয়মকানুন পরিপালন নিশ্চিত করতে ২০২৭ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সময় দিয়েছে কমিশন।
এই সাত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চারটি স্টক ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান হলো- প্রিমিয়ার লিজিং সিকিউরিটিজ লিমিটেড, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং সিকিউরিটিজ লিমিটেড, ফারইস্ট স্টকস অ্যান্ড বন্ডস লিমিটেড এবং পিএফআই সিকিউরিটিজ লিমিটেড।
এ ছাড়া দুটি মার্চেন্ট ব্যাংকার প্রতিষ্ঠান- আইএল ক্যাপিটাল লিমিটেড ও জিএসপি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড এবং একটি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান- প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডকে একই সময়সীমার মধ্যে ঘাটতি পূরণ ও বিধিবিধান পরিপালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
