ঢাকের বাদ্য, ধূপের গন্ধ, রাজকীয় আয়োজন আর উৎসবের আমেজে একসময় মুখর হয়ে উঠত রাজবাড়ীর লক্ষ্মীকোলের রাজবাড়ি। দুর্গাপূজা ঘিরে সেখানে বসত মানুষের মিলনমেলা। ১০৮টি খাসি বলি, নানা রকম মিষ্টান্নের আয়োজন, কলকাতা থেকে আসা নামকরা শিল্পীদের পরিবেশনা, পুতুলনাচ আর সারারাত যাত্রাপালা— সব মিলিয়ে রাজবাড়ীর রাজার বাড়ির দুর্গোৎসব ছিল এক বর্ণাঢ্য আয়োজন। সময়ের স্রোতে সেই জৌলুশ হারিয়ে গেছে। রয়ে গেছে স্মৃতি, ইতিহাস আর অতীতের এক রাজকীয় উৎসবের গল্প।
রাজার বাড়ির দুর্গাপূজার শেষ দিকের দিনগুলোর প্রত্যক্ষদর্শী দুলাল দত্তের স্মৃতিতে আজও জীবন্ত সেই আয়োজন। তিনি জানান, পূজায় ১০৮টি খাসি বলি দেওয়া হতো। পূজার ভোগ ও অতিথি আপ্যায়নে থাকত নানা ধরনের খাবার ও মিষ্টান্ন। ছানার সন্দেশ, রসগোল্লা, মিষ্টিদই, ক্ষীর, হাতে তৈরি বিভিন্ন ধরনের নাড়ু, তালের বড়া, দুধপুলি পিঠা, পদ্মচিনি, চিনির সন্দেশ ও বাতাসা তৈরি করা হতো পূজার আগ থেকেই। রাজবাড়ির সেই খাবারের স্বাদ ছিল অতুলনীয়।
দুলাল দত্ত বলেন, রাজবাড়ির পূজার আয়োজন ছিল অনেক বড়। রাজমহলে রানিমা নিজেই পূজার তদারকি করতেন। পুরোহিত ছিলেন তারাশঙ্কর চক্রবর্তী। পূজাকে কেন্দ্র করে কলকাতা থেকে নামকরা শিল্পীরা আসতেন। বিনোদনের জন্য আয়োজন করা হতো পুতুলনাচ ও যাত্রাপালার। সারারাত ধরে চলত যাত্রা। তখন তারা শরৎ সুন্দরী স্কুলে পড়তেন, যে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে লক্ষ্মীকোল সরকারি স্কুল নামে পরিচিত। তার স্মৃতিতে রয়েছে, একবার পূজার যাত্রাপালায় অভিনয় করতে এসেছিলেন ছায়া বিশ্বাস।
প্রায় ৬০ একরজুড়ে ছিল রাজকীয় আয়োজন
রাজবাড়ীর ইতিহাসের সঙ্গে লক্ষ্মীকোলের জমিদারবাড়ির সম্পর্ক গভীর। রাজা সূর্যকুমারের জমিদারি, জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড, শিক্ষানুরাগ এবং প্রজাদের প্রতি তার দায়িত্ববোধ তাঁকে বৃহত্তর অঞ্চলে পরিচিত করে তোলে।
রাজা সূর্যকুমারের ঘনিষ্ঠজন ত্রৈলোক্যনাথ ভট্টাচার্য তার আমার স্মৃতিকথা গ্রন্থে লক্ষ্মীকোল এস্টেটের ঐশ্বর্য ও বিস্তৃতির বিবরণ দিয়েছেন। তার বর্ণনা অনুযায়ী, কাশিমনগর পরগনার পদ্মাতীরবর্তী অঞ্চলসহ সূর্যনগর, দিনাজপুর, ভুবনেশ্বর, কলকাতা ও কাবিলপুর পরগনায় সূর্যকুমারের জমিদারি প্রতিষ্ঠিত ছিল। এসব জমিদারি থেকে লক্ষ্মীকোল এস্টেটের বার্ষিক আয় ছিল তৎকালীন সময়ে প্রায় দেড় লাখ টাকা।
প্রায় ৬০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা রাজপ্রাসাদ ও রাজবাড়ির বিস্তৃত প্রাঙ্গণে ছিল অতিথিশালা, পোস্ট অফিস, বাগানবাড়ি, শানবাঁধানো পুকুর ও ঘাট, টোল, বৈঠকখানা, অফিস, কর্মচারীদের আবাসন, গোশালা এবং আস্তাবল। হাতিশালে থাকত হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায়, দোতলা বিশাল জমিদারবাড়ির কক্ষগুলোতে ছিল কারুকার্যের ছোঁয়া। কাছারিঘর, অতিথিশালা, নাচঘর, পূজামণ্ডপ, বৈঠকখানা ও ভান্ডারসহ বিভিন্ন অংশে বিভক্ত ছিল পুরো প্রাসাদ। জমিদারবাড়িটি ছিল শুধু ক্ষমতা ও সম্পদের প্রতীক নয়, তৎকালীন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
রানিমা শরৎ সুন্দরীর তত্ত্বাবধানে পূজা
রাজবাড়ির দুর্গোৎসবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন রানিমাতা শরৎ সুন্দরী। পূজার শুদ্ধাচার ও আনুষ্ঠানিকতা তিনি তদারকি করতেন। অতিথিদের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের বিনোদনের জন্যও পূজা উপলক্ষে যাত্রাপালার আয়োজন করা হতো। ফলে রাজবাড়ির পূজা শুধু রাজপরিবারের ধর্মীয় অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ থাকত না; তা হয়ে উঠত বৃহত্তর এলাকার মানুষের মিলন ও আনন্দের উপলক্ষ।
রাজা সূর্যকুমারকে ঘিরে প্রচলিত স্মৃতিচারণে উঠে আসে তার ব্যক্তিত্ব, শিক্ষার প্রতি অনুরাগ এবং জনহিতকর কর্মকাণ্ডের কথা। প্রচলিত ইতিহাসে তিনি ব্রিটিশ শাসকদের সামনে আত্মমর্যাদা বজায় রাখা একজন ব্যক্তিত্ব হিসেবেও পরিচিত। ১৮৮০-এর দশকে তিনি ‘রাজা’ উপাধি লাভ করেন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
তার সময়কার লক্ষ্মীকোল রাজবাড়ির দুর্গোৎসব সেই সামাজিক মর্যাদা, ঐশ্বর্য ও সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষকতারই একটি পরিচায়ক।
পূজা উপলক্ষে গোয়ালন্দ থেকে কলকাতা পর্যন্ত বিশেষ ট্রেন
রাজবাড়ীর দুর্গাপূজার ইতিহাস কেবল রাজবাড়ির প্রাঙ্গণেই সীমাবদ্ধ নয়। তৎকালীন গোয়ালন্দ ছিল পূর্ববাংলার রেল ও নৌযোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। পূজা উপলক্ষে গোয়ালন্দ থেকে কলকাতায় যাতায়াতের বিশেষ ব্যবস্থার কথাও পাওয়া যায় রেল-ইতিহাসে।
সোহানী কবিরের পূর্ববাংলার রেলওয়ের ইতিহাস ১৮৬২–১৯৪৭ গ্রন্থের উল্লেখ অনুযায়ী, ১৯২৭ সালের ১ অক্টোবর গোয়ালন্দ থেকে কলকাতা পর্যন্ত তৃতীয় শ্রেণির একটি বিশেষ ট্রেন চালু করা হয়েছিল। পূজা উপলক্ষে যাত্রীদের যাতায়াত সহজ করাই ছিল এর উদ্দেশ্য। ১২৮ মাইল পথের জন্য মাথাপিছু ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল মাত্র চার টাকা।
ট্রেনটির যাত্রাপথে চারটি স্টেশনে থামার ব্যবস্থা ছিল। কলকাতায় পৌঁছে যাত্রীদের জন্য তীর্থস্থান ও দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন, কালীঘাটে পূজা এবং অন্যান্য সুবিধার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল। এর সঙ্গে ছিল রেলওয়ের নিজস্ব সিনেমার একটি টিকিট ও তিন বেলা বিনা মূল্যে খাবার দেওয়ার আয়োজন।
উল্লিখিত গ্রন্থের তথ্য অনুসারে, ওই ট্রেনে ৬৩৯ জন যাত্রী ভ্রমণ করেছিলেন। তাদের মধ্যে ৬১৯ জন এর আগে কখনো কলকাতায় যাননি এবং ১৩০ জনের সেটিই ছিল জীবনের প্রথম রেলযাত্রা। ১৯২৭ সালের পর থেকে প্রতিবছর অক্টোবর মাসে পূজা উপলক্ষে এই বিশেষ ট্রেন চলাচল অব্যাহত ছিল বলে গ্রন্থটিতে উল্লেখ রয়েছে।
এই তথ্য তৎকালীন দুর্গোৎসবকে ঘিরে মানুষের যাতায়াত, ধর্মীয় আকর্ষণ এবং রেলযোগাযোগের গুরুত্বের একটি ঐতিহাসিক চিত্র তুলে ধরে।
আজ কোথায় সেই রাজকীয় দুর্গোৎসব?
সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের জীবনযাপন ও উৎসব উদ্যাপনের ধরন। রাজবাড়ী জেলায় এখন বিভিন্ন স্থানে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। মণ্ডপে মণ্ডপে ঢাকের শব্দ, প্রতিমার সৌন্দর্য আর মানুষের অংশগ্রহণে প্রতিবছর ফিরে আসে শারদীয় উৎসব। কিন্তু লক্ষ্মীকোলের রাজবাড়ির সেই বিশাল আয়োজন আজ আর আগের রূপে নেই।
একসময় যে প্রাসাদে পূজাকে কেন্দ্র করে রাজকীয় ভোজ, শিল্পীদের পরিবেশনা, পুতুলনাচ ও সারারাত যাত্রাপালার আসর বসত, সেই আয়োজন এখন অতীতের স্মৃতির অংশ। দুলাল দত্তের মতো প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতিচারণে সেই সময়ের কিছু ছবি জীবন্ত হয়ে ওঠে। ত্রৈলোক্যনাথের স্মৃতিকথা ও রেল-ইতিহাসের তথ্যও সেই অতীতকে বুঝতে সাহায্য করে।
রাজবাড়ীর রাজার বাড়ির দুর্গাপূজা তাই কেবল একটি হারিয়ে যাওয়া উৎসবের গল্প নয়; এটি রাজবাড়ীর সামাজিক ইতিহাস, জমিদারি সংস্কৃতি, লোকবিনোদন ও জনজীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
