বর্তমানে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতে গিয়ে হঠাৎ এমন ছবি বা ভিডিও সামনে চলে আসে, যা দৃষ্টির জন্য অনুপযুক্ত। অনেক সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে এসব দৃশ্য চোখে পড়ে যায়। তখন মনে প্রশ্ন জাগে— এতে কি ওজু ভেঙে যায়? নামাজ পড়ার আগে কি আবার ওজু করতে হবে? আর অনিচ্ছায় এমন কিছু দেখে ফেললে কি গুনাহ হবে?
ইসলামে পবিত্রতা ও দৃষ্টির সংযম— দুটিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোনো আপত্তিকর ছবি বা ভিডিও চোখে পড়লেই ওজু ভেঙে যায় না। এ ক্ষেত্রে ওজু ভঙ্গের বিধান এবং দৃষ্টি সংযত রাখার বিধান আলাদাভাবে বুঝতে হবে।
১. আপত্তিকর ছবি দেখলে কি ওজু ভেঙে যায়?
ফেসবুক স্ক্রল করার সময় হঠাৎ কোনো আপত্তিকর ছবি বা ভিডিও সামনে চলে এলে, শুধু তা দেখার কারণে ওজু ভেঙে যায় না। এ ধরনের দৃশ্য দেখে ফেললেও নতুন করে ওজু করা আবশ্যক হয় না—যতক্ষণ না ওজু ভঙ্গের কোনো কারণ ঘটে।
ইসলামি ফতোয়ায়ও বলা হয়েছে, নিষিদ্ধ ছবি বা ভিডিও দেখার কারণে নিজে থেকে ওজু ভাঙে না। তবে এর সঙ্গে যদি মযি বা অন্য কোনো ওজুভঙ্গকারী বিষয় ঘটে, তাহলে তার বিধান আলাদা হবে। (ইসলামওয়েব, ফতোয়া নং ৪৭৩৩৯২)
অর্থাৎ, হঠাৎ কোনো আপত্তিকর দৃশ্য চোখে পড়লেই ওজু নষ্ট হয়েছে—এমন ধারণা সঠিক নয়।
২. অনিচ্ছাকৃতভাবে চোখে পড়লে কি গুনাহ হবে?
কোনো দৃশ্য হঠাৎ সামনে চলে আসা এবং ইচ্ছাকৃতভাবে সেই দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে থাকা এক বিষয় নয়। অনিচ্ছাকৃতভাবে চোখে পড়লে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেওয়াই উচিত। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে অশ্লীল বা নিষিদ্ধ দৃশ্য দেখতে থাকা থেকে বিরত থাকতে হবে।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে পুরুষ ও নারী উভয়কেই দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—
قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ
‘মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয়ই তারা যা করে, আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবহিত।’ (সুরা আন-নুর: আয়াত ৩০)
পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুমিন নারীদেরও দৃষ্টি সংযত রাখতে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করতে নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَ قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنٰتِ یَغۡضُضۡنَ مِنۡ اَبۡصَارِهِنَّ وَ یَحۡفَظۡنَ فُرُوۡجَهُنَّ
‘আর মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।’ (সুরা আন-নুর: আয়াত ৩১)
সুতরাং, অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো দৃশ্য চোখে পড়লে দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়া উচিত। আর ইচ্ছাকৃতভাবে নিষিদ্ধ দৃশ্য উপভোগ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
৩. আপত্তিকর দৃশ্যের দিকে ইচ্ছাকৃতভাবে তাকিয়ে থাকলে কী হবে?
রাসুলুল্লাহ (সা.) দৃষ্টির হেফাজতের গুরুত্ব বোঝাতে চোখের গুনাহ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।
فَزِنَا الْعَيْنَيْنِ النَّظَرُ
‘চোখের ব্যভিচার হলো তাকানো।’ (মুসলিম ২৬৫৭)
এই হাদিসে নিষিদ্ধ দৃষ্টির ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। তবে এখানে চোখের গুনাহের কথা বলা হয়েছে বলে এমন নয় যে, কোনো নিষিদ্ধ দৃশ্য দেখলেই ওজু ভেঙে যাবে। গুনাহের বিধান এবং ওজু ভঙ্গের বিধান এক নয়। তাই ফেসবুকে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু সামনে এলে তা এড়িয়ে যাওয়া, প্রয়োজন হলে পোস্টটি এড়িয়ে চলা এবং এ ধরনের কনটেন্ট বারবার সামনে এলে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট বা বিষয়বস্তু ব্লক করার ব্যবস্থা নেওয়া ভালো।
৪. আপত্তিকর কিছু দেখার পর মযি বের হলে কি ওজু করতে হবে?
কোনো দৃশ্য দেখার কারণে যৌন উত্তেজনা সৃষ্টি হয়ে যদি মযি নির্গত হয়, তাহলে ওজুর বিধান ভিন্ন হবে। মযি হলো যৌন উত্তেজনার সময় নির্গত পাতলা, আঠালো তরল, যা বীর্য থেকে আলাদা।
মযি বের হলে করণীয় হলো—
- লজ্জাস্থান ধুয়ে নিতে হবে।
- কাপড়ে মযি লাগলে সেই স্থান পবিত্র করতে হবে।
- নতুন করে ওজু করতে হবে।
- মযি নির্গত হলে গোসল ফরজ হয় না। তবে বীর্য নির্গত হলে তার ধরন ও পরিস্থিতি অনুযায়ী গোসল ফরজ হতে পারে।
এখানে মনে রাখতে হবে, শুধু উত্তেজনা অনুভব করা বা আপত্তিকর ছবি দেখার কারণে ওজু ভাঙে না; বরং মযি নির্গত হওয়ার মতো ওজুভঙ্গকারী ঘটনা ঘটলে ওজু করতে হবে।
৫. শুধু সন্দেহ হলে কি আবার ওজু করতে হবে?
ফেসবুকে কোনো দৃশ্য দেখার পর মনে হলো, হয়তো কিছু নির্গত হয়েছে— কিন্তু বাস্তবে কোনো নির্গমন দেখতে বা নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারলেন না। এ অবস্থায় শুধু সন্দেহের কারণে ওজু ভেঙে গেছে বলে ধরে নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
ওজু ভেঙেছে বলে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অকারণে বারবার ওজু করা উচিত নয়। ইসলামে পবিত্রতার বিধান সহজ; তাই অমূলক সন্দেহের কারণে নিজেকে দুশ্চিন্তায় ফেলা ঠিক নয়।
ফেসবুক স্ক্রল করার সময় হঠাৎ কোনো আপত্তিকর ছবি বা ভিডিও চোখে পড়লে শুধু এ কারণে ওজু ভেঙে যায় না। তাই নতুন করে ওজু করা আবশ্যক নয়। তবে অনিচ্ছাকৃতভাবে চোখে পড়লে দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়া উচিত এবং ইচ্ছাকৃতভাবে নিষিদ্ধ দৃশ্য দেখা থেকে বিরত থাকতে হবে।
আর যদি মযি নির্গত হয়, তাহলে লজ্জাস্থান ও কাপড়ের সংশ্লিষ্ট স্থান পবিত্র করে নতুন করে ওজু করতে হবে। বীর্য নির্গত হলে পরিস্থিতি অনুযায়ী গোসলের বিধান প্রযোজ্য হতে পারে।
মনে রাখবেন, দৃষ্টি সংযত রাখা যেমন একজন মুমিনের কর্তব্য, তেমনি পবিত্রতার বিধান সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করাও জরুরি। আল্লাহ তাআলা আমাদের দৃষ্টি ও অন্তরকে পবিত্র রাখার এবং সঠিকভাবে ইবাদত করার তৌফিক দান করুন। আমিন।