Published on
:
3 min read
হিমালয়ের কোলে ফের হড়পা বানের তাণ্ডব নেপালে। রবিবার, ১১ অক্টোবর, গোর্খা জেলার বুড়ি গণ্ডকী নদীর কাছে আচমকা জল, কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত নেমে আসে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে একাধিক এলাকা। বিপদের আশঙ্কা করে অনেকেই উপরে পাহাড়ের ঢালে আশ্রয় নেওয়ার কারণে বেঁচে গিয়েছেন। তবে নেপালের সরকারি সূত্রের খবর, বানের জলে তলিয়ে গিয়েছে কমপক্ষে ১০ জন। এ ছাড়া প্রায় ৬৫০ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই দৃশ্য যেন ২৬ অগস্টের ভোটকোশির বিপর্যয়ের স্মৃতি উস্কে দিয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। কিন্তু বার বার এই বিপর্যয় ঘটছে?
কী ঘটেছে?
সূত্রের খবর, শনিবার রাতে ধস নেমে গোর্খা জেলার বুড়ি গণ্ডকী নদীতে অস্থায়ী লেক তৈরি হয়। রবিবার ভোরের দিকে হড়পা বান নামে। গোর্খা চিফ ডিস্ট্রিক্ট অফিসার ধর্মেন্দ্রকুমার মিশ্র জানান, ভোর ৪টে ৩৫ নাগাদ বড়সড় বান আসে। তবে সঠিক কী কারণে এই বিপর্যয়, তা নিশ্চিত জানানো হয়নি। কিন্তু বার বার এই বিপর্যয়ে যে প্রশ্নটা উঠে আসছে, তা হলো হিমালয়ের কোলে অবস্থিত দেশগুলির সামনে কি আসছে বড় বিপদ?
কী ভাবে বাড়ছে বিপদ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয়ের গঠনকাজ এখনও চলছে। তাই উঁচু পার্বত্য এলাকায় গলছে হিমবাহ। নড়বড়ে পাহাড়ি ঢাল এবং জমে থাকা আলগা পাথর ও পলি ধসের আকার নিচ্ছে এবং পাহাড়ি নদীতে হঠাৎ নেমে এসে হড়পা বানের পরিস্থিতি তৈরি করছে।
এ ছাড়া হিমবাহ গলে গেলে তার পাথর, বালি ও নুড়ি দিয়ে তৈরি প্রাকৃতিক বাঁধের পিছনে জল জমে হ্রদ বা গ্লেসিয়ার লেক তৈরি হয়। কিন্তু অনেক সময়ে সেই বাঁধ ভেঙে যায় ও হঠাৎ নদীতে নেমে আসে, যা হড়পা বানের আরও একটি কারণ।
ওয়াদিয়া ইনস্টিটিউট অব হিমালয়ান জিওলজির বিশেষজ্ঞ মণীশ মেহতা জানিয়েছেন, প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে এই ঘটনার সঙ্গে হিমবাহ-হ্রদের জল উপচে পড়া বা ধসের সম্ভাবনার কথাই উঠে এসেছে। তবে কোনওটিকেই এখনও নিশ্চিত কারণ বলা যাচ্ছে না।
তবে নেপালে এই বিপর্যয় কিন্তু ভারতের জন্যও বড় সতর্কবার্তা। ২০১৩ সালের কেদারনাথ বিপর্যয়ে প্রবল বৃষ্টির জেরে বিধ্বংসী বন্যা ভয়াবহ ক্ষতি করেছিল। ২০২১ সালের চামোলি বিপর্যয়ও ভয়াবহ ক্ষতি করেছিল।
উত্তরাখণ্ড ওপেন ইউনিভার্সিটির গবেষক পি.ডি পন্থ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে জানিয়েছেন, শুধু নেপালে নয়, হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড-সহ একাধিক পাহাড়ি রাজ্যে এই ধরনের ছোট-বড় হড়পা বান, ধস বার বার হচ্ছে। আর পিছনে বড় কারণ হলো জলবায়ু পরিবর্তন ও গ্লোবাল ওয়ার্মিং।
বার বার হড়পা বান কেন? জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা কতটা?
জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে হিমালয়ের পরিবেশ দ্রুত বদলাচ্ছে। তাপমাত্রা বাড়ায় হিমবাহ গলছে। ফলে তৈরি হচ্ছে নতুন হ্রদ। সেখানে বালি, পাথর ও নুড়ি দিয়ে তৈরি হচ্ছে প্রাকৃতিক বাঁধ।
কী ভাবে তৈরি হয় বিপজ্জনক জলস্রোত?
তবে এগুলির স্থায়ীত্ব বেশি হয় না। কারণ এই প্রাকৃতিক বাঁধগুলি শক্ত পাথরের মতো মজবুত নয়। অতিরিক্ত জল জমলে, তা আচমকা ভেঙে যায় ও নীচের দিকে নেমে আসে এবং হড়পা বান হতে পারে।
পাহাড়ের ঢালেও বাড়ছে ঝুঁকি
তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বরফ ও পাথরের খাঁজও দুর্বল হয়ে যায়। কিছু এলাকায় পাহাড়ের ঢাল নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞ পি ডি পান্থের মতে, হিন্দুকুশ হিমালয়-সহ বিভিন্ন পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহের এই ক্ষয় প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। তবে প্রতিটি হড়পা বানের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনকেই একমাত্র কারণ বলা যায় না।
ভারত কতটা সতর্ক?
বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশ, সিকিম, লাদাখ থেকে অরুণাচল—হিমালয়ের বিভিন্ন অঞ্চলে একই ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনে হিমবাহ গলছে। তবে প্রতিটি হড়পা বানের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনকেই একমাত্র কারণ বলা যায় না। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে বিপদের ঝুঁকি রয়েছে। উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশ, অরুণাচলের একাধিক জায়গায় পাহাড়ের নড়বড় ঢালে স্থানীয়দের বসতি থেকে শুরু করে ব্যবসা, জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে উঠেছে।
নদীর খুব ধার দিয়ে গড়ে উঠেছে ছোটবড় শহর। যে কোনও বিপর্যয়, হড়পা বানের পরিস্থিতি হলে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। হড়পা বানের সতর্কবার্তা দেওয়া খুব কঠিন। আর তা দেওয়া হলেও পদক্ষেপ করার মতো সময় খুবই কম থাকে। তাই বিপর্যয় মোকাবিলায় হিমবাহ-হ্রদ ও অস্থিতিশীল ঢালের নিয়মিত নজরদারি খুবই প্রয়োজন। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ এবং সেন্সরিং খুব জরুরি।
