সংবাদ, দায়িত্ববোধ ও সত্য প্রকাশের অঙ্গীকারে এক যুগ পার করছে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (বেরোবিসাস)। বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা ঘটনা, শিক্ষার্থীদের অর্জন, সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে ২০২৬ সালের ২৬ অক্টোবর ১২ বছর পূর্ণ করছে সংগঠনটি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি দিনেরই নিজস্ব গল্প থাকে। কখনো শিক্ষার্থীদের অর্জন ও গবেষণার নতুন সম্ভাবনা, কখনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, আবাসনসংকট, পরিবহন সমস্যা কিংবা শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির কথা। এসব ঘটনা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে ক্লাস, পরীক্ষা ও ব্যক্তিগত ব্যস্ততার পাশাপাশি কাজ করেন ক্যাম্পাস সাংবাদিকেরা। তারা তথ্য যাচাই করেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা ঘটনাপ্রবাহ সংবাদ হিসেবে তুলে ধরেন।
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৮ সালে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড। এ প্রেক্ষাপটে ক্যাম্পাসের ঘটনাগুলো নিয়মিত ও দায়িত্বশীলভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন থেকে ২০১৪ সালের ২৬ অক্টোবর যাত্রা শুরু করে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অনলাইন গণমাধ্যমে কর্মরত শিক্ষার্থী সাংবাদিকেরা সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। পরিবর্তিত হয়েছে নেতৃত্ব, যুক্ত হয়েছেন নতুন সদস্য; তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরার দায়িত্ব রয়ে গেছে আগের মতোই।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস শুধু প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, ভবন কিংবা প্রশাসনিক নথিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। শিক্ষার্থীদের অর্জন, শিক্ষকদের গবেষণা, নতুন উদ্যোগ ও উন্নয়ন পরিকল্পনার পাশাপাশি আবাসনসংকট, চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা, পরিবহন সমস্যা এবং একাডেমিক জটিলতাও সেই ইতিহাসের অংশ। এসব বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের জন্য কখনো একাধিক দপ্তরে যোগাযোগ করতে হয়, বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য নিতে হয় এবং তথ্যের যথার্থতা যাচাই করতে হয়। পাঠকের সামনে কয়েক শ শব্দের প্রতিবেদন পৌঁছালেও এর পেছনের পরিশ্রম অনেক সময় অদৃশ্য থেকে যায়। অথচ আজকের সংবাদই ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠতে পারে।
ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার বিশেষ দিক হলো, একজন সংবাদকর্মী একইসঙ্গে শিক্ষার্থীও। তাকে ক্লাস ও পরীক্ষার প্রস্তুতির পাশাপাশি সংবাদ সংগ্রহ, তথ্য যাচাই এবং নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন পাঠানোর দায়িত্ব পালন করতে হয়। কখনো ক্লাস শেষে কর্মসূচিতে ছুটতে হয়, কখনো পরীক্ষার প্রস্তুতির মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। এই সমন্বয় সহজ নয়। তবে, এর মধ্য দিয়ে তৈরি হয় সময় ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগদক্ষতা, নেতৃত্ব ও দায়িত্ববোধের মতো গুণ। একজন শিক্ষার্থী সাংবাদিক সংবাদ লেখার পাশাপাশি মানুষের কথা শোনা, ভিন্নমতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে থেকে ঘটনা বিশ্লেষণ করতেও শেখেন। এভাবে ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা নতুন সংবাদকর্মী গড়ে তোলার ক্ষেত্র হিসেবেও ভূমিকা রাখে।
সাংবাদিকতার মূল শক্তি বিশ্বাসযোগ্যতা। তা অর্জনে প্রয়োজন তথ্য যাচাই, পেশাগত নৈতিকতা এবং স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও প্রশাসনের মধ্যে কোনো বিষয়ে ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে ক্যাম্পাস সাংবাদিকের দায়িত্ব হলো সব পক্ষের বক্তব্য শোনা, প্রাসঙ্গিক তথ্য যাচাই করা এবং নিরপেক্ষভাবে সংবাদ পরিবেশন করা। দ্রুত সংবাদ প্রকাশের প্রতিযোগিতায় সত্য যাচাই যেন পিছিয়ে না পড়ে, সেদিকে সতর্ক থাকা জরুরি। একইসঙ্গে, যুক্তিসংগত প্রশ্ন করা, তথ্য চাওয়া ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের সুযোগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাংবাদিকতার উদ্দেশ্য কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতিপক্ষ হওয়া নয়; বরং সত্য তুলে ধরা এবং জবাবদিহির পরিবেশ তৈরি করা।
২০১৪ সালের সংবাদমাধ্যমের বাস্তবতা আর ২০২৬ সালের বাস্তবতা এক নয়। গত এক যুগে ছাপা পত্রিকার পাশাপাশি অনলাইন সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও প্রতিবেদন ও সরাসরি সম্প্রচারের গুরুত্ব বেড়েছে। এখন একজন ক্যাম্পাস সাংবাদিককে সংবাদ লেখার পাশাপাশি ছবি তোলা, ভিডিও ধারণ, সাক্ষাৎকার গ্রহণ এবং ডিজিটাল মাধ্যমে তথ্য উপস্থাপনের দক্ষতাও অর্জন করতে হয়। প্রযুক্তি সংবাদ প্রকাশ সহজ ও দ্রুত করলেও অসম্পূর্ণ তথ্য, বিভ্রান্তিকর ছবি এবং যাচাইহীন বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে। তাই সবার আগে সংবাদ প্রকাশের চেয়ে সঠিক তথ্য প্রকাশকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। আগামী দিনে ডিজিটাল সাংবাদিকতা, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, ফটোসাংবাদিকতা ও মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতায় দক্ষতা বাড়ানো বেরোবি সাংবাদিক সমিতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
একটি সংগঠনের দীর্ঘ পথচলায় প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, সাবেক নেতৃত্ব, বর্তমান সদস্য ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের অবদান থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ব্যাচ বিদায় নেয়, নতুন ব্যাচ আসে; কিন্তু সংগঠনের অভিজ্ঞতা ও দায়িত্ববোধ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এগিয়ে যায়। এ ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে প্রয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সাংগঠনিক স্বচ্ছতা, সদস্যদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং পেশাগত নৈতিকতার চর্চা। পাশাপাশি গত ১২ বছরের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ, আলোকচিত্র, প্রকাশনা ও সাংগঠনিক নথি সংরক্ষণ করা গেলে তা সংগঠনের ইতিহাসের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাপ্রবাহ জানতেও সহায়ক হবে। একটি সমৃদ্ধ সংবাদ আর্কাইভ ভবিষ্যতে গবেষণার উপকরণ হিসেবেও কাজে লাগতে পারে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শুধু অতীতের অর্জন স্মরণ করার উপলক্ষ নয়; ভবিষ্যতের দায়িত্ব নতুন করে নির্ধারণেরও সময়। বেরোবি সাংবাদিক সমিতির আগামী দিনের পথচলায় এমন পরিবেশ প্রয়োজন, যেখানে নতুন সদস্যরা অভিজ্ঞদের কাছ থেকে শিখতে পারবেন, স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পাবেন এবং পেশাগত মান বজায় রেখে নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে পারবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিবাচক অর্জনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সমস্যা, সম্ভাবনা ও প্রত্যাশাও সমান গুরুত্বে তুলে ধরতে হবে।
ক্যাম্পাসের সংবাদ যেন শুধু অনুষ্ঠান, বক্তব্য কিংবা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। গবেষণাগারের সম্ভাবনা, শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা, শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবন, প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের সংগ্রাম এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্পর্কের গল্পও উঠে আসুক সংবাদে। কারণ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ চিত্র ফুটে ওঠে তার সঙ্গে যুক্ত সব মানুষের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার মধ্য দিয়ে।
১২ বছরে বদলেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ, সংবাদ প্রকাশের মাধ্যম, সংগঠনের নেতৃত্ব ও সংবাদ সংগ্রহের প্রযুক্তি। তবে সাংবাদিকতার মৌলিক প্রশ্নগুলো একই রয়েছে—কী ঘটেছে, কেন ঘটেছে, কারা এর সঙ্গে যুক্ত এবং মানুষের জীবনে এর প্রভাব কতটা?
২৬ অক্টোবর ২০২৬-এ বেরোবি সাংবাদিক সমিতির এক যুগ পূর্তি তাই শুধু একটি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নয়, ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার প্রতি নতুন করে অঙ্গীকার জানানোর উপলক্ষও। প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের উদ্যোগ, সাবেকদের অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান সদস্যদের শ্রমে সংগঠনটি এগিয়ে যাক আগামী দিনের পথে। সেই পথচলায় সংবাদ হোক তথ্যনির্ভর, প্রশ্ন হোক দায়িত্বশীল, মতপ্রকাশ হোক স্বাধীন এবং সাংবাদিকতার কেন্দ্রে থাকুক মানুষের কথা।
এক যুগ পেরিয়ে বেরোবি সাংবাদিক সমিতির প্রত্যাশা—সত্য প্রকাশের সাহস অটুট থাকুক, ক্যাম্পাসের কোনো গুরুত্বপূর্ণ গল্প যেন আড়ালে না থাকে।
লিখেছেন: মাসফিকুল হাসান
শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
