নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফর জামান ফকির ওরফে আলিফ ফকির হত্যার ঘটনায় উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি। ঘটনার প্রায় তিন দিনেও চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি হত্যাকারীদের। শুক্রবার রাতে আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা অজ্ঞাতনামা ৭–৮ জনকে আসামি করে দুর্গাপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলার পর সাংবাদিকদের দেওয়া সাক্ষাৎকারে হত্যাকারীদের দ্রুত চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার ও ফাঁসির দাবি জানান তিনি।
দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ খবরের কাগজ-কে বলেন, ‘আলিফ হত্যা রহস্য উদ্ঘাটনে থানা পুলিশের পাশাপাশি এসআরবি, পিবিআই, সিআইডি, ডিবি, ডিএসবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সবগুলো ইউনিট কাজ করছে। ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। পুলিশ সুপারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও তদন্তের সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছেন।’
ওসি জানান, শুক্রবার রাত ১১টার দিকে আলিফ ফকিরের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা দুর্গাপুর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। তবে বাদী সুনির্দিষ্টভাবে কোনো আসামির নাম উল্লেখ করতে পারেননি। মামলার দেরির কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি আরও বলেন, ‘ঘটনার পরদিন নেত্রকোনা সদরে নিয়ে মরদেহের ময়নাতদন্ত, পরে কলমাকান্দার ধীতপুর শুনই এলাকার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে জানাজা ও দাফন—প্রভৃতি কারণে বাদীর আসতে কিছুটা দেরি হয়েছে। কিন্তু তাই বলে আমরা মামলার অপেক্ষায় বসে ছিলাম না। ঘটনার পর থেকে আমাদের সবকটি ইউনিট তৎপর রয়েছে।’
আরও পড়ুন
আশঙ্কাই সত্যি হল!
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাংবাদিক আলিফ ফকির এই ঘটনার আগে থেকেই নিরাপত্তাজনিত হুমকির মুখে ছিলেন। তার ওপর গত নভেম্বর মাসে হামলার ঘটনাও ঘটেছিল। পুলিশ সুপারসহ জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও তিনি বিষয়টি মৌখিকভাবে জানিয়েছিলেন। এর প্রমাণ পাওয়া যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আলিফের একটি বক্তব্যে।
সূত্র জানায়, মো. তরিকুল ইসলাম নেত্রকোনায় পুলিশ সুপার হিসেবে যোগদানের পর গত ৩০ নভেম্বর জেলার সাংবাদিকদের নিয়ে মতবিনিময় সভা করেন। ওই সভায় আলিফ নিজের নিরাপত্তা সংকটসহ এলাকার মাদক, চোরাচালান ও অবৈধ অস্ত্র ব্যবসার কথা তুলে ধরে বক্তব্য দেন।
ভিডিওতে আলিফকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি আপনার এইখানে যে বসে আছি, আমার কাছে মেসেজ আছে—তারা রাস্তায় বসে আছে দুটি অস্ত্র নিয়ে। একটি ৯ এমএম ও পাঁচটি গুলি। আমি যাওয়ার সময় তারা গুলি করবে, যদিও আমি আজকে যাব না।’
আলিফ আরও বলেন, ‘এই জেলার দুর্ধর্ষ, সশস্ত্র গ্রুপগুলোর নিউজ আমি করে থাকি—মাদক থেকে শুরু করে সব।’ দুর্গাপুর-কলমাকান্দার সীমান্ত এলাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই এলাকায় চোরাকারবারিদের আটটি সংঘবদ্ধ গ্রুপ আছে। তারা অস্ত্র পরিবহন করে—ককটেল, মাদক, বিস্ফোরক সব। তারা আপনার এই জেলার বারোটা বাজিয়ে দিবে।’
আলিফের ওপর হামলার একটি মামলার কথা উল্লেখ করে আলিফ বলেন, ‘এই আসামিগুলোকে এখনও ধরা হয়নি। সবাইকে সাক্ষী রেখে বলছি, এই আসামিদের যদি ধরা না হয়, হয় আমার দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে, না হয় তাদের চেয়ে বড় সন্ত্রাসী হতে হবে। সিদ্ধান্তটা এখন আপনাকে নিতে হবে।’
আলিফের কথার মাঝে এক পুলিশ কর্মকর্তা পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘আমরা ধরি নাই, নাকি ধরতে পারি নাই?’ তখন আলিফ বলেন, ‘না ধরার কোনো চেষ্টাই করা হয়নাই।’ তার শ্বশুরবাড়িতে হামলা হতে পারে—এমন আশঙ্কার কথাও সভায় উল্লেখ করেন আলিফ।
আলিফের ওই বক্তব্যের পর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল কি-না— জানতে চাইলে পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম শনিবার বিকেলে খবরের কাগজকে বলেন, ‘আসামিদের আইন অনুযায়ী গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছিল।’
কাকতালীয় ব্যাপার হচ্ছে, আলিফকে হত্যার পর ঘটনাস্থল থেকে পিস্তলের যে গুলি উদ্ধার করা হয়েছে, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে সেগুলো ৯ এমএম গুলিই। তাছাড়া আলিফ পাঁচটি গুলির কথা বলেছিলেন, তাঁকে হত্যাতেও পাঁচ থেকে ছয় রাউন্ড গুলি ব্যবহার করা হয়েছে।
আলিফের পরিচিত জেলা সদরের এক সাংবাদিক বলেন, ‘আলিফ যখন জেলা সদরে আসতেন, তখন দুই-একজনকে সাথে করে নিয়ে আসতেন। এজন্য তাদেরকে টাকা দিতে হত তার। আলিফই এ কথা ওই সাংবাদিককে জানিয়েছিলেন।’
সতর্ক করেছিলেন ওসি!
সাংবাদিক আলিফ ফকিরকে আগেই সতর্ক করেছিলেন দুর্গাপুর থানার ওসি খন্দকার শাকের আহমেদ। ওসি শাকের খবরের কাগজ-কে বলেন, ‘তিনি খুব সাহস নিয়ে লেখালেখি করতেন। বিভিন্ন ব্যক্তির বিরুদ্ধে লিখতেন। এসব কারণে আগেও তার ওপর হামলা হয়েছিল। তাছাড়া আমি বর্তমান কর্মস্থলে আসার কিছুদিন আগে দুর্বৃত্তরা দুর্গাপুরে শফিকুল নামের এক দারোগাকে কুপিয়ে মেরে ফেলেছিল। জামালপুরে কর্মরত শফিকুলের বাড়ি ছিল দুর্গাপুরে। শফিকুলের সঙ্গে তাঁর চেহারার মিল ছিল। মূলত তাকে (আলিফকে) মনে করেই ওই দারোগাকে কুপিয়েছিল সন্ত্রাসীরা। এটি আলিফ নিজেই আমাকে জানিয়েছিলেন।’
খন্দকার শাকের আহমেদ আরও বলেন, ‘এই সব কারণে আমার মনে হয়েছিল, যেকোনো সময় তার ওপর আবারও হামলা হতে পারে। তাকে এও বলেছিলাম, ‘আপনার বাড়ি দুর্গাপুরে না, কলমাকান্দায়। তাই দুর্গাপুরে এলে আমাকে একটু জানাবেন। তাহলে টহল পার্টিকে আপনার বাসার দিকে একটু নজর রাখতে বলব।’ তখন আলিফ হেসে বলেন, ‘আগেই তো মেরে ফেলেছিল। এখন তো বোনাস লাইফে আছি।’
প্রসঙ্গত, গত ১০ নভেম্বর মাসে দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাটে আলিফের ওপর সশস্ত্র হামলা হয়। এ সময় দুর্বৃত্তরা তাকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। তাকে বাঁচাতে তার এক সহকর্মী এগিয়ে গেলে দুর্বৃত্তরা তাকেও ধাওয়া করে। পরবর্তীতে মামলার প্রেক্ষিতে পুলিশ দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে। বর্তমানে তারা জামিনে মুক্ত।
হামলার আশঙ্কায় আলিফ কোনো জিডি করেছিলেন কি না জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘একটি ফেসবুক আইডির বিরুদ্ধে জিডি করেছিলেন। ওই আইডিটি কে চালান তা আমরা জানি, কিন্তু তিনি স্বীকার করেন না।’
ওসি আক্ষেপ করে বলেন, ‘ঘটনার দুদিন আগেও তিনি আমার অফিসে এসেছিলেন। আমি চা খাইযেছি। কিন্তু কে জানত, এটাই তার শেষ দেখা!’
প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন
সাংবাদিক আলিফ হত্যার প্রতিবাদে শনিবার নেত্রকোনা জেলা সদর ও দুর্গাপুরে স্থানীয় সাংবাদিকরা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন। জেলা সদরের সাংবাদিকরা সকাল ১১টার দিকে স্থানীয় প্রেস ক্লাবের সামনের সড়কে সমবেত হয়ে প্রথমে মানববন্ধন ও পরে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ম. কিবরিয়া চৌধুরী হেলিমের সভাপতিত্বে এবং সাংবাদিক সঞ্জয় সরকারের সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন: বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী, সাংবাদিক শ্যামলেন্দু পাল, এনসিপির কেন্দ্রীয় সংগঠক প্রীতম সোহাগ, সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম, আবুল কালাম ও তানভীর হায়াত খান প্রমুখ।
অন্যদিকে দুর্গাপুরের সাংবাদিকরা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেন স্থানীয় প্রেস ক্লাব মোড়ে। সেখানে প্রবীণ সাংবাদিক মোহন মিয়ার সভাপতিত্বে ও মাসুম বিল্লাহর সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন: এস এম রফিকুল ইসলাম রফিক, নির্মলেন্দু সরকার বাবুল, কামাল হোসাইন, পল্লব চক্রবর্তী, ধনেশ পত্রনবীশ, দিলওয়ার হোসেন তালুকদার প্রমুখ। উভয় সমাবেশে বক্তারা আলিফের হত্যাকারীদের চিহ্নিত করে দ্রুত গ্রেপ্তার, তার স্ত্রী-সন্তানের পুনর্বাসন, সীমান্ত এলাকার চোরাচালান বন্ধ এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের দাবি জানান। দুর্গাপুরের সাংবাদিকরা কিছুক্ষণ সড়কও অবরোধ করে রাখেন।
জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ৮টার দিকে দুর্গাপুরের তেলুঞ্জিয়া এলাকায় দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত হন সাংবাদিক লুৎফর জামান ফকির ওরফে আলিফ ফকির। তিনি ‘রূপসী বাংলা’ নামক একটি আইপিটিভিতে সাংবাদিকতা করতেন। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামক একটি সংবাদভিত্তিক পেজ পরিচালনা করতেন। পেজে এলাকার মাদক ব্যবসা, চোরাচালান, বালুমহালের লুটপাট প্রভৃতি অনিয়ম, অপরাধ ও দুর্নীতি নিয়ে লেখালেখি এবং ভিডিও প্রচার করতেন। স্বজনদের দাবি, এসব কারণে তার শত্রু বেড়েছিল।
সাংবাদিকতার আগে তিনি সেনাবাহিনীর সদস্য ছিলেন। তবে সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন নাকি চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন তা জানা যায়নি। আলিফের গ্রামের বাড়ি কলমাকান্দার ধীতপুর শুনই গ্রামে। তার স্ত্রী আনন্দিতা সাংমার বাবার বাড়ি দুর্গাপুরের তেলুঞ্জিয়ায়; আনন্দিতা তেলুঞ্জিয়াতেই থাকেন। আলিফ সেখানে আসাযাওয়া করতেন।
আনন্দিতা সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি নার্সিংয়ে লেখাপড়া করেছি। আলিফ আমার লেখাপড়ায় খুব সহযোগিতা করেছিল। আমাদের গারো কমিউনিটির সঙ্গে সে খুব ভালোভাবে মিশে গিয়েছিল। আমার জন্য একটা চাকরি খুঁজছিল। কিন্তু এর আগেই সন্ত্রাসীরা তাকে কেড়ে নিল। তার দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে আমি এখন কীভাবে চলব?
সঞ্জয় সরকার/এসএন
