খুলনার দাকোপে আজ বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানক আসবেন। এই সফরকে ঘিরে ইতোমধ্যে প্রস্তুতি শেষ করেছে স্থানীয় প্রশাসন। প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে উপজেলার নলিয়ানে তৈরি করা হয়েছে হেলিপ্যাড। গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর উন্নয়ন করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা জোরদার করে পুরো এলাকাকে আনা হয়েছে নজরদারির আওতায়।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক প্রত্যাশা। নদীভাঙন রোধ, সুপেয় পানির সংকট সমাধান, চিকিৎসাসেবা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে এই সফরের মাধ্যমে বড় কোনো পদক্ষেপ আসবে বলে আশা করছেন এলাকাবাসী।
এর আগে প্রধানমন্ত্রীর সফর প্রস্তুতি তদারক করতে দাকোপের নলিয়ান এলাকা পরিদর্শন করেন জাতীয় সংসদের হুইপ ও খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য রকিবুল ইসলাম বকুল এবং খুলনা-১ আসনের সংসদ সদস্য আমির এজাজ খান।
দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বোরহান উদ্দিন মিঠু জানান, প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপত্তা ও যাতায়াত ব্যবস্থার যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া জেলা পুলিশ সুপার ড. ওমর ফারুক সরকার সংশ্লিষ্ট এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
খুলনা-১ আসনের সংসদ সদস্য আমীর এজাজ খান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরটি সরকারি। স্থানীয়ভাবে কোনো কর্মসূচি না থাকলেও তার আগমন ঘিরে প্রশাসন ও স্থানীয় নেতারা প্রস্তুতি নিয়েছেন। এলাকার মানুষ প্রধানমন্ত্রীকে একনজর দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন।
একদিকে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদ ও পর্যটন, অন্যদিকে মোংলা বন্দরের বাণিজ্যিক কার্যক্রম। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘিরে বিনিয়োগের সুযোগ। বিনিয়োগ আর অর্থনৈতিক অপার সম্ভাবনা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলজুড়ে। উন্নয়নের সম্ভাবনায় যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ এসব স্থান এবার সরেজমিন দেখবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সুন্দরবনে প্রধানমন্ত্রীর পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র করে বিশেষ প্রস্তুতি নিয়েছে বন বিভাগও।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ এবং সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, প্রধানমন্ত্রীর সফর ও পর্যবেক্ষণ এলাকায় বন বিভাগের পক্ষ থেকে বিশেষ নিরাপত্তা ও তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
খুলনা জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর নির্বিঘ্ন, সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সমন্বয়মূলক পদক্ষেপ চূড়ান্ত করা হয়েছে।
সফরসূচি অনুযায়ী, আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে নিজ বাসভবন থেকে তেজগাঁও বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হবেন প্রধানমন্ত্রী। পরে সকাল ৯টায় হেলিকপ্টারে করে সুন্দরবনের উদ্দেশে যাত্রা করবেন তিনি। ১০টা নাগাদ আকাশপথে হিরণ পয়েন্ট ও সংলগ্ন সুন্দরবন এলাকা পরিদর্শন করবেন। পরিদর্শন শেষে সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে খুলনা জেলার দাকোপ উপজেলায় অবস্থিত নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে অবতরণ করবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখান থেকে সড়কপথে লঞ্চঘাটে গিয়ে নৌপথে বাগেরহাট জেলার বানৌজা মোংলার উদ্দেশে যাত্রা করবেন। দুপুরে বানৌজা মোংলা জেটিতে পৌঁছে ওয়ার্ডরুমের উদ্দেশে যাত্রা করবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে মধ্যাহ্ন বিরতির পর বিকেল ১টা ৪৫ মিনিটে ওয়ার্ডরুমের সভাকক্ষে আয়োজিত সভায় অংশ নেবেন তিনি। বিকেলে মোংলা বন্দরের সার্বিক কার্যক্রম ও জেটি পরিদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। বিকেল ৩টা ১৫ মিনিটে তিনি প্রস্তাবিত বেজা ইকনোমিক জোন এলাকা ঘুরে দেখবেন। দিনব্যাপী সরকারি কর্মসূচি শেষে বিকেল ৪টায় মোংলার হেলিপ্যাড থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবেন তিনি এবং বিকেল ৫টায় ঢাকায় পৌঁছাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
জানা গেছে, সুন্দরবনের আকরাম পয়েন্টে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) টার্মিনাল বা ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) নির্মাণের পরিকল্পনা করছে সরকার। পাইপলাইনের মাধ্যমে সেই গ্যাস মোংলায় নিয়ে অর্থনৈতিক অঞ্চলের শিল্পকারখানায় ব্যবহার করা হবে। টার্মিনাল করার লক্ষ্য নিয়ে গত আগস্ট মাসে আকরাম পয়েন্ট এলাকা পরিদর্শন করেন নৌপরিবহনমন্ত্রী, বিদ্যুৎমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল। আজ বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্থানটি পরিদর্শনের কথা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে স্থান নির্বাচন হলে সম্ভাব্যতা যাচাইসহ অন্যান্য কাজ শুরু হবে। পরিদর্শন করবেন চায়না বিনিয়োগ ভিত্তিক বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলও। দেশের অর্থনীতিতে মোংলা বন্দরের কৌশলগত গুরুত্ব এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশাকে সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মোংলা বন্দর ও ইপিজেড অর্থনৈতিক জোন পরিদর্শন এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান সরাসরি মোংলা বন্দর ও এর সংলগ্ন জনপদ পরিদর্শনে আসছেন, যা স্থানীয় ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষের মাঝে সৃষ্টি করেছে অভূতপূর্ব উদ্দীপনা ও উৎসাহ।
মোংলা বন্দর বার্থ ও শিপ অপারেটর এ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোঃ জুলফিকার আলী বলেন, প্রধানমন্ত্রী মোংলা বন্দর পরিদর্শনে এসে চীনের সাথে চুক্তি হওয়া বন্দরের নতুন জেটি নির্মাণ এলাকা পরিদর্শন করবেন। আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানাই সঠিকভাবে যেন বন্দর চ্যানেল ড্রেজিং হয়, যাতে নাব্যতা বাড়ে, তাহলে বড় বড় জাহাজ এ বন্দরে আসতে পারবে।
উল্লেখ্য, গত ১০ অক্টোবর মোংলা বন্দরের সুবিধাদি সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ও চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের (এক্সিম ব্যাংক) মধ্যে ৩৩৫ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৩ হাজার ৫৯২ কোটি ৮৯ লাখ ৭৫ হাজার টাকা) মূল্যমানের ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। গত ১২ অক্টোবর অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে থেকে জনানো হয়, চুক্তির আওতায় চীন সরকার প্রকল্পটির জন্য ২ দশমিক ৪০৪ বিলিয়ন আরএমবি ঋণ দেবে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের আওতায় মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ গৃহীত ‘মোংলা বন্দরের সুবিধাদি সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়নে এ ঋণ ব্যবহার করা হবে। ঋণচুক্তিতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের যুগ্মসচিব আলিয়া মেহের এবং চীনের এক্সিম ব্যাংকের পক্ষে অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার ফেংজুন তিয়ান স্বাক্ষর করেন।
প্রকল্পটির আওতায় আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ দুটি কন্টেইনার টার্মিনাল, কন্টেইনার ইয়ার্ড, কন্টেইনার ডেলিভারি ইয়ার্ড ও কার্গো হ্যান্ডলিং ইয়ার্ড নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি বন্দরের প্রয়োজনীয় আধুনিকায়ন করা হবে।
