ভবানীপুরের পাড়ায় পাড়ায় তখন বিজয়ার আনন্দ। বাবার হাত ধরে ঠাকুর দেখতে যাওয়া, সন্ধিপুজো দেখতে দেখতে বাবার কোলে ঘুমিয়ে পড়া। সেই দিনগুলোর স্মৃতি এখনও টাটকা বর্ষীয়ান অভিনেত্রী মিতা চট্টোপাধ্যায়ের মনে।
ঢাকের আওয়াজ কানে এলেই তাঁর মনে পড়ে ছোটবেলার টুকরো টুকরো ঘটনা। যেমন বহু বার হয়েছে ঠাকুর দেখতে গিয়ে বাবার কোলেই ঘুমিয়ে পড়েছেন তিনি। আর ঘুম থেকে উঠেই দেখেছেন, পুজোবাড়ি থেকে তাঁর জন্য পাঠানো হয়েছে ফুলকো ফুলকো লুচি আর পায়েস। আর পুজো মিটলে বাবার বড় রুমালের চার কোণ বেঁধে বানানো থলিতে জমাতেন প্রতিবেশীদের দেওয়া নাড়ু-মিষ্টি। তবে সেই বিজয়া আর আজকের বিজয়ার মধ্যে যে বিস্তর ফারাক!
এখন আর আগের মতো বাড়িতে বাড়িতে আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা নেই, নেই পাড়ার প্রতিবেশীদের সঙ্গে দেখা করে প্রণাম করার সেই আনন্দ। তার বদলে মুঠোফোনে কয়েকটি কথা, ছোট্ট একটি বার্তা। সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া বিজয়ার ছবিটা নিয়ে তাই আক্ষেপ ঝরে পড়ে অভিনেত্রীর গলায়। আনন্দবাজার ডট কম-এর ফোন পেয়ে সেই ফেলে আসা দিনের স্মৃতিতে ডুব দিলেন অভিনেত্রী।
১৯৪০ সালে শিশুশিল্পী হিসাবে অভিনয়জীবন শুরু মিতা চট্টোপাধ্যায়ের। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে ‘হানাবাড়ি’, ‘এক টুকরো আগুন’, ‘অন্নপূর্ণার মন্দির’, ‘বিয়ের ফুল’, ‘বেয়াদপ’-এর মতো একাধিক ছবিতে অভিনয় করেছেন। থিয়েটার, বেতার নাটক থেকে টেলিভিশনের ধারাবাহিক, নানা মাধ্যমে নিজের অভিনয় প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। কলকাতা দূরদর্শনের ‘জন্মভূমি’ ধারাবাহিকের ‘পিসিমা’ নামে তাঁকে এখনও চেনে বহু দর্শক। বর্তমান স্টুডিয়োপাড়ার সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ শিল্পীদের অন্যতম এই অভিনেত্রী। বয়স ৯৪ হলেও তাঁর কাছে তা নিছকই একটি সংখ্যা। হাসিতে আজও আলো ছড়ান তিনি। মাথার ঘোমটা যেন তাঁর আভিজাত্যের নিজস্ব পরিচয়। দীর্ঘজীবনে পুজোর রং, রস, রূপ যেমন বদলাতে দেখেছেন, তেমনই বদলাতে দেখেছেন বিজয়া উদ্যাপনের ধরনও।
বাঙালির দুর্গাপুজো শুধু চার দিনের উৎসব নয়, পুজো শেষের বিজয়াও তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর সেই বিজয়ার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কত ছোট ছোট স্মৃতি। মিতা চট্টোপাধ্যায়ের কাছেও বিজয়া মানে শুধু গুরুজনদের প্রণাম করা কিংবা মিষ্টিমুখ নয়, বরং একসঙ্গে মিশে থাকা গোটা পাড়ার ছবি। ছোটবেলার কথা বলতে গিয়ে অভিনেত্রী বলেন, ‘‘বিজয়া বললেই মনে পড়ে আমার ছোটবেলার কথা। তখন প্রতিটি বাড়িতে বিজয়া মানেও এক উৎসব। পুজোর পরেও পুজোর আনন্দ নিভত না। আমার ছোটবেলা কেটেছিল ভবানীপুরে। দুর্গাপুজোর প্রথম মজা ছিল বাবার হাত ধরে ঠাকুর দেখা, সন্ধিপুজো দেখতে দেখতে বাবার কোলে ঘুমিয়ে পড়া, ঘুম ভাঙত যখন দেখতাম সেই পুজোবাড়ি থেকে আমার জন্য ফুলকো ফুলকো লুচি আর পায়েস, মালসা ভর্তি করে দিয়েছে।’’
পুজো শেষ হওয়ার পরেও তাঁদের বাড়িতে উৎসবের আবহ কাটত না। একের পর এক আত্মীয়স্বজন, পরিচিত মানুষ বিজয়া করতে আসতেন। মিতার মা অনেক দিন আগে থেকেই তৈরি করতেন নারকেলের নানা রকম মিষ্টি। আবার বিকেল হলেই ছোট ছোট বন্ধুরা মিলে পাড়ার প্রতিবেশীদের বাড়ি বিজয়ার প্রণাম করতে বেরিয়ে পড়তেন। সেই যাত্রায় মিতার সঙ্গী ছিল বাবার রুমাল। কারণ, সেই রুমালেই তো জমত প্রতিবেশীদের দেওয়া নাড়ু-মিষ্টি! ছোটবেলার সেই মজার কথা আজও স্পষ্ট মনে রয়েছে তাঁর।
মিতার কথায়, ‘‘পুজো শেষ হয়ে গেলে আমাদের বাড়িতে একের পর এক লোক আসত বিজয়া করতে। মা অনেকদিন ধরেই নারকেলের অনেকরকম মিষ্টি তৈরি করতেন। আর বিকেলবেলা আমরা ছোট ছোট বন্ধুরা মিলে পাড়ার প্রতিবেশীদের বাড়ি বিজয়ার প্রণাম করতে যেতাম। আমি সঙ্গে নিতাম বাবার রুমাল। কেন? বাবাদের রুমালগুলো বড় হয় আর মায়েদের রুমাল ছোট্ট ছোট্ট। তাই বাবার রুমাল হাতিয়ে নিয়ে তার চারটে কোণ বেঁধে নিলে একটা থলির মতো হত। তাতে সব প্রতিবেশীদের দেওয়া নাড়ু, মিষ্টি সব জমা করে বাড়ি ফিরতাম। কী যে আনন্দের ছিল।’’
সেই বিজয়ার আনন্দে ছিল পাড়ার মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগও। প্রতিবেশীদের বাড়িতে গিয়ে প্রণাম করা, আশীর্বাদ নেওয়া, আর সঙ্গে মিষ্টিমুখ—সব মিলিয়ে উৎসবের আলাদা একটা রূপ ছিল। মিতা স্মরণ করেন সমরেশ রায়ের বাবার কথা। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে গান করতেন সমরেশ রায়। তাঁর বাবা ছিলেন মিতাদের প্রতিবেশী। তাঁকে তাঁরা ‘দাদু’ বলে ডাকতেন। বিজয়া করতে গেলে তিনি রেকাবিতে রাখা ধান-দূর্বা দিয়ে মন্ত্র পড়ে আশীর্বাদ করতেন। আবার অন্য কোনও বাড়িতে মিলত কালোজিরে দেওয়া ছোট ছোট নিমকি। সেই নিমকি অবশ্য বাড়ি ফেরার জন্য অপেক্ষা করত না। হাতে পেয়েই মুখে পুরে ফেলতেন তাঁরা। কারও বাড়িতে আবার ছোটদের জন্য তৈরি হত হালুয়া। তখন বাজার থেকে মিষ্টি কিনে খাওয়ানোর রীতি ছিল না বললেই চলে। প্রতিটি বাড়ির আয়োজনেই থাকত নিজস্বতা, আর সেই আয়োজনের মধ্যেই তৈরি হত উৎসবের আনন্দ।
সেই স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে মিতা বলেন, ‘‘হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে গান করতেন সমরেশ রায়, তাঁর বাবা আমাদের প্রতিবেশী ছিলেন। তাঁকে আমরা দাদু বলতাম। বিজয়ার প্রণাম করতে গেলে উনি আমাদের রেকাবিতে রাখা ধান দূর্বা দিয়ে মন্ত্র পড়ে আশীর্বাদ করতেন। আরেকজনদের বাড়ি কালোজিরে দেওয়া ছোট্ট ছোট্ট নিমকি দিত। নিমকি ঝোলার মধ্যে রাখতাম না, দিলেই কটাং কটাং করে খেতাম। অনেকে হালুয়া করতেন ছোটদের জন্য। বাজার থেকে কিনে খাওয়ানোর রীতি একেবারেই তখন ছিল না। এই যে একটা মজা সেটাই এখন হারিয়ে গিয়েছে।’’
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সেই সময়ের সঙ্গে বর্তমানের তুলনা টানতে গিয়ে আক্ষেপ করেন অভিনেত্রী। এখন আর আগের মতো বিজয়া করতে বাড়িতে বাড়িতে লোকজন আসেন না। আত্মীয়স্বজনের ভিড়ে সকাল থেকে হইচই, দুপুর পর্যন্ত জমিয়ে খাওয়াদাওয়া, একদল চলে গেলে আরেক দলের আগমন—সেই চেনা ছবি ক্রমশ ফিকে হয়ে এসেছে। ছোটদের জন্য বড়দের আশীর্বাদের সঙ্গে থাকত টাকা দেওয়ার রীতিও। মিতার শ্বশুরবাড়ি ছিল বীরভূমে। সেখানেও বিশাল বড় করে বনেদি দুর্গাপুজো হত। পুজোর সময়ে সারা গ্রামের লোক তাঁদের বাড়িতে খেতে আসতেন। অর্থাৎ উৎসবের আনন্দ কেবল পরিবারের মধ্যে আটকে থাকত না, ছড়িয়ে পড়ত গোটা গ্রামে।
এখন অবশ্য বিজয়ার শুভেচ্ছা পৌঁছে যায় অনেক সহজে। ফোনের ওপার থেকে কয়েকটি কথা, কখনও বা একটি বার্তা—সেখানেই শেষ হয় যোগাযোগ। মিতা চট্টোপাধ্যায়ের নিজের বাড়িতেও বিজয়া করতে আসা লোকজনের সংখ্যা কমেছে। অভিনেত্রীর কথায়, ‘‘আমার বাড়িতেও বিজয়া করতে আসার লোকজন কমে গিয়েছে। এখন সবটাই মোবাইল মারফত বিজয়া। বিজয়ার সকাল থেকেই মোবাইল ধরলেই ‘শুভ বিজয়া! প্রণাম নিও। শরীর কেমন আছে? ভাল তো? আচ্ছা রাখলাম।’ এখন বিজয়া মানেই এই ‘শুকনো আদিখ্যেতা’।
‘‘এখনকার ছোটোরা আমাদের ছোটবেলার দিনগুলো ভাবতেই পারবে না। কাকা, পিসি, মাসি তাঁদের ছেলেপুলেদের নিয়ে সকাল থেকে আমাদের বাড়ি আসছেন, হই চই হচ্ছে, সকালে-দুপুরে জমাটি খাওয়া-দাওয়া। একদল আত্মীয়স্বজন চলে গেলে প্লেট গ্লাস সব ধুয়ে মেজে রাখতে রাখতেই আরেকদল আত্মীয় বিজয়া করতে চলে এল বাড়িতে। ছোটদের তো বিজয়াতে বড়রা টাকাও দিতেন। আমার শ্বশুরবাড়ির দেশ ছিল বীরভূমে। সেখানেও বিশাল বড় করে বনেদি দুর্গাপুজো হত। সারা গ্রামের লোক পুজোর সময় আমাদের বাড়িতে খেত।’’
তবে সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া সব কিছুকেই খারাপ বলতে চান না মিতা। প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকেও মানিয়ে নিয়েছেন তিনি। ৯৪ বছর বয়সেও হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করেন। কিন্তু বার্তা পাঠানো আর সরাসরি কথা বলার মধ্যে যে তফাত রয়েছে, তা তাঁর চোখ এড়ায় না। মিতার মতে, কথা বললে যে আন্তরিকতা তৈরি হয়, কেবল লিখে পাঠানো কয়েকটি শব্দে তা সব সময় ধরা পড়ে না। তাঁর কথায়, ‘‘আমি এ যুগের সব খারাপ বলব না। ৯৪ বছর বয়সেও আমি হোয়াটস অ্যাপ করতে পারি। কিন্তু লেখার থেকেও কথা বললে বেশি আন্তরিক হয় ব্যাপারটা। এখন লোকের ধৈর্য কম, সময় কম, আন্তরিকতাও কম। এখন মানুষের নিজেদের মধ্যে আনন্দ করার অনেক অন্য উপকরণ রয়েছে। যে যার সে তার।’’
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিজয়ার প্রণাম পাওয়ার অভিজ্ঞতাও যেন অন্য অর্থ পেয়েছে তাঁর কাছে। কখনও ফোন ধরতে পারেন না তিনি। তখন কেউ বার্তা পাঠিয়ে জানান বিজয়ার প্রণাম। মিতা পাল্টা ফোন করতে বললেও অনেক সময় আর ফোন আসে না। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তাঁর মনে হয়, তিনি এখনও পৃথিবীতে রয়েছেন বলেই হয়তো বছরে একবার ফোন করার কর্তব্যটুকু পালন করেন কেউ কেউ। তাঁর কথায়, ‘‘আজকাল মনে হয় এই ৯৪ বছর বয়সেও আমি আছি বলে বিজয়ার প্রণামের ফোনটা এল। আমি না থাকলে আর টেলিফোন আসবে না। অনেকসময় আমি হয়তো ফোনটা ধরতে পারিনি, সে আমাকে একটা মেসেজ করে দিল, ‘বিজয়ার প্রণাম নিও’, ব্যস। আমি তখন ভাবলাম আমাকে তো আশীর্বাদ করতে হবে তাই তাকে মেসেজ করলাম ‘একটু পরে ফোন কর’। সে ফোন আর এল না। কারণ সে জানে ইনি এখনও আছেন পৃথিবীতে, ফোন করা কর্তব্য, তাই করে ছেড়ে দিল। আমি মনে করব আমার এই পড়তি জীবনে যা পাওয়া যায় তাই ভাল। তবু তো একটা লোক সারা বছরে একবার আমার নম্বরে ফোন করল।’’
বাবার রুমালের চার কোণে গিঁট দিয়ে বানানো থলি, তাতে জমিয়ে রাখা প্রতিবেশীদের দেওয়া নাড়ু-মিষ্টি, ধান-দূর্বা দিয়ে আশীর্বাদ, বাড়িতে আত্মীয়স্বজনের ভিড় আর জমিয়ে খাওয়াদাওয়া—মিতা চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিতে বিজয়া মানে এই সবই। আজ ৯৪ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে সেই দিনগুলোর সঙ্গে বর্তমানের তুলনা করে তাঁর আক্ষেপ হয় ঠিকই, কিন্তু বদলে যাওয়া সময়ের মধ্যেও যে সামান্য যোগাযোগটুকু রয়ে গিয়েছে, তাকেও অস্বীকার করেন না তিনি। বরং জীবনের এই পড়তি বেলায় বছরে একবার পাওয়া ফোনের মধ্যেও খুঁজে নেন আনন্দের কারণ।
এই প্রতিবেদনটি 'আনন্দ উৎসব' ফিচারের একটি অংশ।
