দেশের চা শিল্পকে টেকসই ও লাভজনক করতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, উৎপাদন ব্যয় কমানো, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ এবং বাগানগুলোর আর্থিক সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। দীর্ঘদিনের ঋণের বোঝা, পুরোনো চা গাছ, উচ্চ সুদে ঋণ এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে খাতটি চাপে থাকায় নীতিগত ও আর্থিক সহায়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে চা শিল্পের উন্নয়নবিষয়ক মনিটরিং ও পরামর্শক কমিটির প্রথম বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে চা বাগানগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশল প্রণয়ন, বাগানভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তৈরি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত সহায়তার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসসকে বলেন, বৈঠকে চা খাতের উৎপাদন, অর্থায়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার ও রপ্তানি সম্প্রসারণসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দেশের চাহিদার প্রায় ৯৭ শতাংশ চা দেশেই উৎপাদিত হয়। উৎপাদনের অবশিষ্ট অংশ রপ্তানি করা হয়।
চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ৯ কোটি ৪৯ লাখ ৩০ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে উত্তরাঞ্চলে উৎপাদন হয়েছে ২ কোটি ২৩ লাখ কেজি। একই বছর দেশে প্রতি হেক্টরে গড় চা উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৫৫২ কেজি। তবে উৎপাদন বাড়লেও বাগানের পুরোনো গাছ, পুনরায় চারা রোপণের ধীরগতি, শ্রমিকের মজুরি ও কৃষি উপকরণের ব্যয় বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহারের কারণে উৎপাদনশীলতা প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে না।
চা বাগানগুলোর আর্থিক সংকটও শিল্পটির বিকাশে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঋণের উচ্চ সুদ, বকেয়া পরিশোধের চাপ এবং উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে বিক্রয়মূল্যের অসামঞ্জস্যের কারণে অনেক বাগানের পক্ষে নতুন বিনিয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল, সক্ষম বাগানগুলোর জন্য নতুন ঋণের সুযোগ এবং সহজ শর্তে অর্থায়নের বিষয়গুলো আলোচনায় এসেছে।
চা উৎপাদন ও বিনিয়োগে সহায়তা দিতে ৬ শতাংশ সুদে একটি আবর্তক তহবিল গঠনের প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি পুনঃঅর্থায়ন ঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৭ শতাংশে রাখার প্রস্তাব রয়েছে। চা বাগানগুলোকে কৃষি খাতের আওতায় বিবেচনা করে ঋণের সুদহার বর্তমান ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশে আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তবে চা চাষকে কৃষি হিসেবে গণ্য করা হবে, নাকি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে—এ নিয়ে নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রয়োজন রয়েছে।
উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। চা চাষের অনুপযোগী জমিতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাইয়ের প্রস্তাব রয়েছে। এতে একদিকে অব্যবহৃত জমির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হতে পারে, অন্যদিকে বাগানের বিদ্যুৎ ব্যয় কমাতেও সহায়তা মিলতে পারে।
রপ্তানি বাড়ানোও চা শিল্পের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ১৬ লাখ ৪০ হাজার কেজি চা রপ্তানি হয়েছে। অন্যদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চা রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩৩ লাখ মার্কিন ডলার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে রপ্তানি আয় হয়েছে ৭ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে উৎপাদন ব্যয় কমানো, মান উন্নয়ন এবং নতুন বাজার অনুসন্ধান জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারের পরিকল্পনায় তাই শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, বরং চা বাগানগুলোর আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করা, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং রপ্তানিযোগ্য চায়ের মান উন্নয়নের বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাচ্ছে। কার্যকর নীতিগত সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ এবং বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের চা শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়তে পারে।
