মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর থেকে গৃহযুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত উত্তর আফ্রিকার তেলসমৃদ্ধ দেশ লিবিয়া মূলত পূর্ব ও পশ্চিম—এই দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। প্রায় সব জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়েই এই দুই পক্ষের অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। তবে চিরচেনা সেই বিপরীত অবস্থান ভুলে ভূমধ্যসাগরের সমুদ্রসীমা ইস্যুতে তুরস্কের সঙ্গে এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছে লিবিয়ার দুই পক্ষই।
দীর্ঘদিন বিরোধিতার পর সম্প্রতি ২০ অক্টোবর আঙ্কারার সঙ্গে সম্পাদিত সমুদ্রসীমা চুক্তিটি অনুমোদন দিয়েছে লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় পার্লামেন্ট। তবে দুই মুসলিম দেশের এই ঐতিহাসিক সমঝোতা মেনে নিতে পারছে না মিসর, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), গ্রিস ও ইসরায়েল। চুক্তিটির ফলে পূর্ব ভূমধ্যসাগরের ভূরাজনীতি ও জ্বালানি কূটনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।
বিজ্ঞাপন
চুক্তির পটভূমি ও কৌশলগত গুরুত্ব
২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েব এরদোয়ান এবং জাতিসংঘ স্বীকৃত ত্রিপোলিভিত্তিক লিবিয়া সরকারের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ফায়েজ আল সাররাজের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল পূর্ব ভূমধ্যসাগরে দুই দেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (EEZ) ও সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করা।
এর মাধ্যমে আঙ্কারা পূর্ব ভূমধ্যসাগরের বিস্তীর্ণ জলসীমায় নিজেদের অর্থনৈতিক অধিকার ও খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানের আইনি ভিত্তি তৈরি করে। ধারণা করা হয়, এই অঞ্চলে রয়েছে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ। তবে ২০২০ সালে চুক্তিটির তীব্র বিরোধিতা করে তা প্রত্যাখ্যান করেছিল লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় সরকার এবং তাদের সামরিক কমান্ডার খলিফা হাফতার। কিন্তু সম্প্রতি হাফতারের ছেলে সাদ্দাম হাফতারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং ক্ষমতার মসনদে বসার সমীকরণে তুরস্কের সঙ্গে কৌশলগত আপস করে পূর্বাঞ্চলীয় পার্লামেন্টও এটি অনুমোদন করে।
যে কারণে ক্ষুব্ধ সংশ্লিষ্ট দেশগুলো
• মিসরের অসন্তোষ: প্রতিবেশী মিসরের দাবি, এই চুক্তির কারণে ভূমধ্যসাগরে তাদের নিজস্ব সমুদ্রসীমা ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের অধিকার ক্ষুণ্ণ হবে। এ ছাড়া কায়রোর দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র খলিফা হাফতারের সঙ্গে তুরস্কের সামরিক সখ্য এবং পূর্ব লিবিয়ায় তুর্কি বাহিনীর সম্ভাব্য উপস্থিতি মিসরের প্রেসিডেন্ট আব্দেল ফাত্তাহ আল-সিসির প্রশাসনকে চরম উদ্বেগে ফেলেছে।
• ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) আপত্তি: ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিরোধিতার প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তাদের সদস্য দেশ গ্রিস ও সাইপ্রাসের স্বার্থ। ব্রাসেলসের অভিযোগ, এই চুক্তি গ্রিস ও সাইপ্রাসের সার্বভৌম জলসীমার অধিকার চরমভাবে লঙ্ঘন করে। ইইউ একে জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক সনদের (UNCLOS) পরিপন্থি বলেও দাবি করছে। যদিও তুরস্ক এই সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ না হওয়ায় তারা এটি মানতে বাধ্য নয় বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে।
• ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া: চুক্তির তীব্র নিন্দা জানিয়ে ইসরায়েল অভিযোগ করেছে, আঙ্কারা পূর্ব ভূমধ্যসাগরের স্থিতিশীলতা নষ্ট করছে। তেল আবিবের ক্ষোভের মূল কারণ হলো জ্বালানি রাজনীতি। গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে ইসরায়েলের গভীর সামরিক ও জ্বালানি অংশীদারত্ব রয়েছে। ওই অঞ্চলে তেল আবিবের পাইপলাইন ও গ্যাস উত্তোলন প্রকল্পের জন্য তুরস্কের এই সমুদ্রসীমা চুক্তি সরাসরি কৌশলগত হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তুরস্কের শক্ত অবস্থান
আন্তর্জাতিক মহলের এই তীব্র সমালোচনার মুখেও নিজেদের অবস্থান থেকে একচুল নড়তে নারাজ আঙ্কারা। তুরস্কের দাবি, চুক্তিটি আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায্যতার নীতির ভিত্তিতেই কার্যকর হয়েছে। তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান স্পষ্ট বার্তা দিয়ে জানিয়েছেন, কারা এই চুক্তির বিরোধিতা করছে তা তাদের জানা রয়েছে এবং বিরোধীদের এসব আপত্তিকে কোনোভাবেই গুরুত্ব দেবে না আঙ্কারা।
বিশ্লেষকদের মতে, দৃশ্যত এটি কেবল সমুদ্রসীমা নির্ধারণের চুক্তি মনে হলেও এর পেছনে জড়িয়ে আছে বিপুল গ্যাস মজুদের নিয়ন্ত্রণ, সামরিক প্রভাব বিস্তার এবং মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার গভীর খেলা। ফলে চুক্তিটি বিরোধ নিষ্পত্তির চেয়ে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে পরাশক্তিগুলোর মুখোমুখি অবস্থানকে আরও তীব্র করে তুলছে।
