চলছে বাঙালির উৎসবের মরশুম। দুর্গাপুজোর রেশ কাটতে না কাটতেই দরজায় কড়া নাড়ছে লক্ষ্মীপুজো, কালীপুজো, ভাইফোঁটা, তারপর জগদ্ধাত্রী পুজো। উৎসব মানেই জমিয়ে খাওয়াদাওয়া, বাড়িতে বাড়িতে নানা পদের আয়োজন আর প্রিয় খাবারের স্বাদ নেওয়া। লুচি, আলুরদম, পোলাও, মটন, মিষ্টি থেকে তেলেভাজা, উৎসবের মরশুমে রসনাতৃপ্তির তালিকা দীর্ঘ হতেই থাকে।
কিন্তু স্বাদের টানে একটু বেশি খেয়ে ফেললেই অনেক সময় পিছু নেয় অম্বল, বুকজ্বালা ও বদহজম। অতিরিক্ত খাওয়াদাওয়া, তেল-মশলাদার খাবার এবং রাতে দেরি করে খাওয়ার অভ্যাসে বাড়তে পারে অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যা।
তবে কয়েকটি সহজ অভ্যাসের পাশাপাশি রান্নাঘরের পরিচিত কিছু উপাদান হালকা অস্বস্তি সামলাতে সাহায্য করতে পারে। জেনে নিন এমনই সাতটি ঘরোয়া উপায়।

১. আদা চা
হজমের অস্বস্তি সামলাতে আদার ব্যবহার বহু দিনের। আদায় থাকা জিঞ্জেরলের মতো সক্রিয় উপাদানের প্রদাহবিরোধী গুণ রয়েছে। কয়েক টুকরো তাজা আদা জলে মিনিট দশেক ফুটিয়ে ছেঁকে পান করতে পারেন। তবে আদা চা সবার ক্ষেত্রে অম্বল কমায় না। কারও কারও ক্ষেত্রে এটি বুকজ্বালা বাড়িয়েও দিতে পারে। তাই খাওয়ার পর অস্বস্তি বাড়লে আদা চা এড়িয়ে চলুন।

২. দইয়ের ঘোল
বাঙালির উৎসবের ভুরিভোজে ভারী খাবারের পর এক গ্লাস দইয়ের ঘোল অনেকেরই পছন্দের। এতে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়া অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। চাইলে ঘোলের সঙ্গে সামান্য ভাজা জিরে গুঁড়ো মিশিয়ে খেতে পারেন। তবে ঘোল অম্বলের ওষুধ নয়। দুগ্ধজাত খাবার খেলে যাঁদের পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি হয়, তাঁদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

৩. মৌরি
খাওয়ার পর মৌরি চিবোনোর অভ্যাস অনেকেরই রয়েছে। মুখের দুর্গন্ধ কমানোর পাশাপাশি পেট ফাঁপার অস্বস্তি দূর করতেও অনেকে মৌরি ব্যবহার করেন। ভারী খাবারের পর অল্প মৌরি চিবিয়ে খেতে পারেন। গরম জলে মৌরি ভিজিয়ে সেই জলও পান করা যায়। তবে অ্যাসিড রিফ্লাক্স বা বুকজ্বালা কমাতে মৌরির কার্যকারিতার পক্ষে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

৪. কলা
উৎসবের মরশুমে খাবারের তালিকায় পাকা কলা রাখতে পারেন। এতে রয়েছে পটাশিয়াম ও ফাইবার-সহ একাধিক পুষ্টি উপাদান। কলা পেট ভরাতে সাহায্য করে। তবে কলা খেলেই পাকস্থলীর অ্যাসিড কমে যাবে বা অম্বল নিশ্চিত ভাবে দূর হবে, এমনটা বলা যায় না। প্রত্যেকের শরীরে খাবারের প্রতিক্রিয়াও এক রকম হয় না।

৫. ডাবের জল
বাইরে বেরিয়ে বা উৎসবের এই মরশুমে কেনাকাটার ফাঁকে তেষ্টা মেটাতে ডাবের জল ভালো বিকল্প হতে পারে। এতে রয়েছে বিভিন্ন ইলেকট্রোলাইট, যা শরীরের জলীয় ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। তবে ডাবের জল পাকস্থলীর অ্যাসিড কমায় বা অ্যাসিড রিফ্লাক্সের চিকিৎসা, এমনটা কখনও-ই ভাববেন না। হাইড্রেশন পানীয় হিসেবে একে দেখাই ভালো।

৬. ঠান্ডা দুধ
বুকজ্বালা শুরু হলে অনেকেই ঠান্ডা দুধের উপর ভরসা করেন। কারও কারও ক্ষেত্রে সাময়িক আরাম মিললেও দুধ অম্বলের চিকিৎসা নয়। বিশেষত, বেশি ফ্যাটযুক্ত দুধে অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যা বাড়তে পারে। তাই দুধ খাওয়ার পর বুকজ্বালা বা পেটের অস্বস্তি বাড়লে তা এড়িয়ে চলাই উচিত।

৭. জোয়ান
লুচি, কচুরি বা নানা রকম তেলেভাজা খাওয়ার পর পেট ফাঁপা ও ভার লাগার সমস্যা হলে অনেকে জোয়ান খান। জোয়ান হজমের অস্বস্তি কমাতে ব্যবহৃত হলেও অ্যাসিড রিফ্লাক্সের চিকিৎসায় এর কার্যকারিতার পক্ষে পর্যাপ্ত গবেষণা নেই। তাই জোয়ানকে অম্বলের নিশ্চিত ঘরোয়া ওষুধ বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
অম্বল এড়াতে কী করবেন?
উৎসবের আনন্দে খাওয়াদাওয়ার পরিমাণের দিকে নজর রাখা জরুরি। একবারে অনেকটা না খেয়ে অল্প অল্প করে খান। অতিরিক্ত তেল-মশলাদার খাবার কমান এবং কোন খাবার খেলে আপনার বুকজ্বালা বাড়ে, তা খেয়াল রাখুন। খাওয়ার পরই শুয়ে পড়বেন না। বিশেষত, রাতে ঘুমতে যাওয়ার অন্তত দু থেকে তিন ঘণ্টা আগে রাতের খাবার খেয়ে নেওয়ার চেষ্টা করুন। খাওয়ার পর ১০ থেকে ১৫ মিনিট হালকা হাঁটাহাঁটিও করতে পারেন। পর্যাপ্ত জল পান করুন এবং রাতের খাবার খুব ভারী না রাখাই ভালো।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি?
মাঝেমধ্যে অম্বল হলে খাওয়াদাওয়ার অভ্যাসে পরিবর্তন এনে উপকার পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু বারবার বুকজ্বালা, টক জল উঠে আসা, খাবার গিলতে অসুবিধা বা দীর্ঘদিন ধরে হজমের সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। বুকে তীব্র ব্যথা হলে সেটিকে শুধু অম্বল ভেবে অবহেলা করবেন না। এমন ব্যথার সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, ঘাম বা মাথা ঘোরার মতো উপসর্গ থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি।
