ঢাকার ধামরাইয়ের চৌহাট এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে জিম্মি করে তুলে নিয়ে মাহফুজুর রহমান ইমন (২৮) নামে এক ছাত্রদল নেতাকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীর দাবি, চৌহাট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম মোকসেদ ও তার অনুসারীরা এ হামলা করেছেন।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে উপজেলার বালিয়া ইউনিয়নের বালিয়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
ভুক্তভোগী মাহফুজুর রহমান ইমন ধামরাইয়ের চৌহাট ইউনিয়নের চৌহাট এলাকার বাসিন্দা। তিনি ধামরাই উপজেলা ছাত্রদলের প্রচার সম্পাদক। অভিযুক্ত রফিকুল ইসলাম মোকসেদও একই এলাকার বাসিন্দা।
প্রত্যক্ষদর্শী, উভয়পক্ষ এবং পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সকালের দিকে ব্যক্তিগত কাজে ভাড়া করা প্রাইভেট কারে করে চৌহাট থেকে ধামরাইয়ের উদ্দেশে রওনা হন ইমন। একপর্যায়ে বালিয়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পৌঁছালে ৮-১০টি মোটরসাইকেল নিয়ে প্রায় ২০-২৫ জন ব্যক্তি তার গাড়ির পথরোধ করে জিম্মি করে। এ সময় গাড়িচাপা দিয়ে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মোকসেদকে হত্যারচেষ্টার অভিযোগে তার ওপর উপর্যুপরি হামলা করা হয়। মারধর ও ধারালো দেশীয় অস্ত্রের কোপে তিনি আহত হন। পরে তাকে ধামরাই ৫০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
এ ঘটনার পর ভাড়া করা প্রাইভেটকারটি আটক করে ধামরাই থানার কাওয়ালীপাড়া বাজার পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে নেওয়া হয়। পুলিশের জানায়, ইমনের ভাড়া করা গাড়ি থেকে ৩০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী মাহফুজুর রহমান ইমন বলেন, ‘‘আমি ধামরাই উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শামসুল ইসলামের সঙ্গে দেখা করতে ভাড়া করা গাড়ি নিয়ে যাচ্ছিলাম। বালিয়া স্ট্যান্ডে পৌঁছালে হঠাৎ ১০টি মোটরসাইকেল এসে আমার প্রাইভেট কার ঘেরাও করে। তারা বলে, ‘চেয়ারম্যানের ডাকে।’ আমি বলি, ‘আমার তাড়া আছে।’ কিন্তু তারা জবরদস্তি করছিল। আমি চিন্তা করলাম, গাড়ির কোনো ক্ষয়ক্ষতি হলে ঝামেলা হবে। তারা চাপ সৃষ্টি করছিল। পরে তারা আমাকে নিয়ে গেছে। সেখানে আমি জানতে চাই, ‘কী সমস্যা, কী কারণে এমন করা হচ্ছে।’ তখন মোকসেদ বলে, ‘তুই আমাকে প্রাইভেট কার দিয়ে মেরে ফেলতে চেয়েছিস, পরিকল্পিতভাবে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘এরপরই নিজের অনুসারীদের মোকসেদ বলেন, ‘কই, এখনও মারস নাই?’ এ সময় আমি গাড়ির দরজা খুলতেই অতর্কিতভাবে ২৫ থেকে ৩০ জন আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। চেয়ারম্যান নিজে ও তার ছেলেও আমাকে গাড়ি থেকে টেনে বের করে জামাকাপড় ছিঁড়ে ফেলে। আমার ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। শরীরে কাটা-ছেঁড়ার চিহ্নও স্পষ্ট রয়েছে।’’
তিনি বলেন, আমি ও মোকসেদ একই এলাকার। আমি আগামী নির্বাচনে জুয়েল আহমেদ বাদলকে সমর্থন করছি। তিনি কিছু দিন ধরেই এই বিষয় নিয়ে আমার সঙ্গে বিরোধ করছিলেন। তিনি এমনও বলেছেন, ‘তুই ওর সঙ্গে থাকবি কেন? তুই আমার সঙ্গে থাকবি। তোর যে ক্যারিয়ার, তুই আমার সঙ্গে থাকবি। তুই ওর সঙ্গে কেন যাবি? আর ওর সঙ্গে তোর কী?’
এরপর মোকসেদ জুয়েল আহমেদ বাদলকে হাজির করতে বলেন জানিয়ে ইমন বলেন, ‘আমার ধারণা, তাকে পেলে হয়তো মারধর করা হতো। আমি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছি। নেতাদের অবহিত করেছি। আমি মামলা করবো।’
গাড়ি থেকে গাঁজা উদ্ধারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি একটা জানাজায় যোগ দিতে যাচ্ছিলাম। আমার এলাকায় খোঁজ নেন। আমার বিষয়ে এমন কিছু পাওয়া যায় কি না। আমি নিজে মাদকবিরোধী কর্মসূচি করি। তারা আমার গাড়ি উল্টো ভাঙচুর করেছে। গাড়ি তল্লাশি করেও কিছু পাওয়া যায়নি। আমাকে ছেড়ে দেওয়া হলেও আমার চালককে সেখানে রেখে দেওয়া হয়। এরপর তার সঙ্গে কী করা হয়েছে, তা আমি জানি না। তারা নিজেরাই রেখে কিছু দাবি করতে পারে। কারণ, মোকসেদ এলাকায় ফিরে গত কিছু দিন ধরেই কয়েকজনকে মাদকসহ আটক করেছেন। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি। আর মাদক ধ্বংসও করা হয়নি৷ জমিয়ে রাখা সেই মাদক দিয়েই আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করতে পারে।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ‘মোকসেদের বিরুদ্ধে সাতটি হত্যা মামলা রয়েছে। তিনি ১২ বছর জেল খেটে কয়েক দিন আগে মুক্তি পেয়েছেন। বালিয়া স্কুলের পেছনে একজন সেনাসদস্যকে প্রকাশ্যে হত্যা করেছেন তিনি। ওই ঘটনায় হাত-পা কেটে মাথা কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল বলে আমি জানি। তার নামে এখনো ডাকাতি, অস্ত্র ও হত্যা মামলাসহ ৩৩টি মামলা রয়েছে। আপনাদের সঙ্গে বসলে এসবের তথ্যপ্রমাণ দেখাব।’
যদিও ঘটনার ভিন্ন বিবরণ দেন চৌহাট ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান পারভীন হাসান প্রীতি, যিনি আবার রফিকুল ইসলাম মোকসেদের সহধর্মিণী। প্রীতি বলেন, ‘গাড়ির মধ্যে মাদক নিয়ে পালানোর সময় তাকে স্থানীয়রা ধাওয়া দেয়। এ সময় সাবেক চেয়ারম্যান রাস্তার পাশে ছিলেন। তখন তাকে চাপা দেওয়ার চেষ্টাও করা হয়। এ ঘটনায় কোনো মারধরের ঘটনা ঘটেনি। আর ওই যুবক পালিয়ে যায়। তবে চালককে আটক করে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়েছে।’
এসব বিষয়ে জানতে রফিকুল ইসলাম মোকসেদকে মুঠোফোনে ও হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এসব বিষয়ে ধামরাই থানার কাওয়ালিপাড়া বাজার পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ (আইসি) ইলিয়াস বলেন, ‘চৌহাটে গাড়ি ক্রসিংয়ের সময় ঝামেলা হয়েছিল। গাড়িকে সাইড দেওয়া নিয়ে সমস্যা হয়েছিল বলে জানতে পেরেছি। যে গাড়িতে ছিলেন, তার নাম ইমন। আর চালকের নাম রায়হান। গাড়ির ভেতরে বাদল ছিলেন। ঘটনাটি বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঘটেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তাদের বক্তব্য ছিল, মোকসেদকে গাড়িচাপা দিয়ে মারার চেষ্টা করা হয়েছে। তারা আরও বলেছেন, ইমন মাদক ব্যবসা করেন এবং তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদকের অনেক মামলা রয়েছে। ২০০৫ সালে রংপুরে অস্ত্র ও মাদকসহ তিনি ধরা পড়েছিলেন বলেও তারা জানিয়েছেন। তার গাড়িতে মাদক থাকতে পারে বলে সন্দেহ ছিল। পরে স্থানীয় লোকজনের উপস্থিতিতে আমরা সেখানে যাই। বিষয়টি আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানাই। সেখানে যাওয়ার পর তার গাড়িতে ৩০ থেকে ৩৫ গ্রাম গাঁজা পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
