ধরো, তোমার বাসায় আজ দুপুরে ইলিশ ভাজা হয়েছে। পাশের বাটিতে রুই মাছের ঝোল। তবু দাদি রান্নাঘরের কোনায় ছোট একটা হাঁড়ি নিয়ে বসেছেন। হাঁড়িতে লইট্টা শুঁটকির ভর্তা। গন্ধে বাড়ি ম ম করছে। তুমি নাক কুঁচকালে। দাদি হেসে বললেন, ‘আগে খেয়ে দেখ, তারপর বলিস।’
নদীর দেশে তাজা মাছের অভাব নেই। তবু মানুষ শুঁটকি খায়। টাকা দিয়ে কিনে খায়, বিদেশে যাওয়ার সময় ব্যাগে ভরে নেয়। কারণটা কী, সেটাই আজ খুঁজে দেখব।
শুরুটা অনেক আগে। তখন ফ্রিজ ছিল না, বরফও না। মাছ ধরার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে খেয়ে ফেলতে হতো। নইলে পচে যেত। আমাদের গরম আর স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় মাছ বড় তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়।
বর্ষায় একটা বিলে হঠাৎ প্রচুর মাছ উঠল। জাল ভরে গেছে। পুরো গ্রাম মিলেও এক দিনে এত মাছ খেতে পারবে না। বাজারও দূরে। তখন কেউ একজন মাছে লবণ মাখিয়ে রোদে মেলে দিল। কয়েক দিন পর মাছ শক্ত আর হালকা হয়ে গেল। মাসের পর মাস রেখে দিলেও কিছু হয় না। শুঁটকির শুরু এভাবেই। তাজা মাছের বদলে নয়, তাজা মাছকে ধরে রাখার উপায় হিসেবে।
শুঁটকি হালকা, তাই বাজারে সহজেই পরিবহন যায়। নৌকায় চাপিয়ে সহজেই দূরের হাটে নেওয়া যেত। এভাবে সাগরের মাছ পৌঁছে গেছে নদীর ধারের গ্রামে, সমতলের মাছ পাহাড়ে।
বন্যার সময় হাটবাজার বন্ধ থাকে, জেলের নৌকা নামতে পারে না। তখন ঘরের শুঁটকিই ভরসা। পাহাড়েও তাই। পার্বত্য চট্টগ্রামে নদী আছে, কিন্তু সব সময় মাছ মেলে না। সেখানকার মানুষ শুকনো আর গাঁজানো মাছ দিয়ে নিজেদের পদ বানিয়েছে। সিলেটের শিদল, চাকমাদের সিদোল, মারমাদের নাপ্পি, নাম আলাদা হলেও ভাবনা এক।

কিন্তু এখন তো ফ্রিজ আছে, বরফ দেওয়া মাছও মেলে। তবু শুঁটকি টিকে আছে। কারণ, স্বাদ।
মাছ শুকালে ভেতরের পানি বেরিয়ে যায়। পড়ে থাকে মাছের সারটুকু। প্রোটিন ভেঙে গ্লুটামেট নামে একটা উপাদান তৈরি হয়, যা খাবারে ভরাট, মজাদার স্বাদ আনে। জাপানিরা একে বলে ‘উমামি’। পনির আর টমেটোতেও এটা আছে। তাজা মাছের স্বাদ নরম আর মিষ্টি, শুঁটকির স্বাদ ঘন আর কড়া। কাঁচা আম আর আমসত্ত্ব তো এক জিনিস নয়। আমসত্ত্ব আছে বলে কেউ আম খাওয়া ছাড়ে না।
রান্নার সময় এর জোর টের পাবে। একমুঠো শুঁটকি হাঁড়িতে পড়লেই পুরো তরকারির স্বাদ বদলে যায়। কুমড়া বা শাকের মতো সাদামাটা তরকারিতে তাই শুঁটকি এত মানায়।
গন্ধ নিয়ে অভিযোগ আছে, সেটা মানতেই হবে। অনেকের কাছে অসহ্য। যাঁরা ভালোবাসেন, তাঁদের কাছে ওই গন্ধেই খিদে পায়। পেঁয়াজ, রসুন আর কাঁচা মরিচের সঙ্গে মিশলে গন্ধটা আবার অন্য রকম হয়ে যায়। অনেকে প্রথমে নাক সিঁটকায়, পরে একবার চেখে আর ছাড়তে পারে না। শুঁটকির ভক্ত হওয়ার গল্প প্রায়ই এভাবেই শুরু হয়।
কক্সবাজারের নাজিরারটেকে শুঁটকি পল্লী আছে। সাগরের লইট্টা, ছুরি, ফাইস্যা, চিংড়ি সেখানে রোদে শুকায়। হাওর আর নদীর পুঁটি, চান্দা শুকিয়েও শুঁটকি হয়। কাজটা সহজ নয়। মাছ পরিষ্কার করে, বড় মাছ কেটে, লবণ মাখিয়ে বাঁশের মাচায় সাজাতে হয়। রোদ ভালো থাকলে কয়েক দিনেই শেষ। হঠাৎ বৃষ্টি নামলে সব ঢাকতে দৌড়াতে হয়।
শুঁটকির মৌসুম শীতকাল। তখন আকাশ পরিষ্কার থাকে, বৃষ্টি কম। মাছ সাজানো, উল্টে দেওয়া আর কাক-কুকুর তাড়ানোর কাজে তখন সবাই ব্যস্ত থাকে।
রান্নাও আলাদা। লইট্টার ভর্তা হয়, ছুরি রান্না হয় আলু বা কচুর সঙ্গে, চিংড়ি যায় লাউয়ের তরকারিতে, পুঁটি যায় ঝাল ভুনায়। কেউ ভাজে, কেউ আগুনে ঝলসে ভর্তা পেষে। এক এলাকার পছন্দ আরেক এলাকায় হয়তো অচেনা।
পুষ্টির দিকটাও দেখো। শুকালে ওজন কমে, প্রোটিন কমে না। তাই একই ওজনে শুঁটকিতে প্রোটিন বেশি। ছোট মাছ কাঁটাসুদ্ধ খেলে ক্যালসিয়ামও মেলে। লবণ অবশ্য বেশি, একবারে অনেকটা খাওয়া ঠিক নয়। দামেও সুবিধা। অল্প শুঁটকিতে পুরো পরিবারের তরকারি হয়ে যায়। গরিব ঘরে এটাই ছিল ভরসা। আবার ধনী ঘরের পাতেও গরম ভাতের সঙ্গে শুঁটকির ভর্তা জায়গা পায়।
স্মৃতির টানও আছে। ছোটবেলায় দাদির হাতে শুঁটকি খাওয়া ছেলেটা বিদেশে গিয়ে ওই স্বাদ খোঁজে। প্রবাসীর ব্যাগে প্রায়ই পলিথিনে মোড়া শুঁটকি পাওয়া যায়। ওটা শুধু খাবার নয়, বাড়ির এক টুকরা। আবার ফ্ল্যাট বাড়িতে শুঁটকি রাঁধলে পাশের ঘরের লোক জানালা বন্ধ করে দেয়, এমন গল্পও শোনা যায়। কেউ ভালোবাসে, কেউ পালায়।
শুকনো মাছ খাওয়ার চল অন্য দেশেও আছে। নরওয়েতে শুকনো কড মাছের নাম স্টকফিশ। পর্তুগিজরা বড়দিনে লবণ দেওয়া শুকনো ‘বাকালিয়াউ’ ছাড়া ভোজ ভাবতেই পারে না। জাপানে শুকনো টুনার কুচি ‘কাতসুওবুশি’ ঝোলে দেওয়া হয়। সব জায়গায় শুরুটা দরকারে, টিকে থাকাটা স্বাদে।
একটা সাবধানবাণী আছে। বাজারের সব শুঁটকি নিরাপদ নয়। পোকা ঠেকাতে কিছু ব্যবসায়ী কীটনাশক মেশান, এমন অভিযোগ আগে উঠেছে। তাই পরিচিত দোকান থেকে কিনবে। ভালো করে শুকানো কি না দেখবে, গায়ে ছাতা বা ভেজা ভাব থাকলে নেবে না। বাড়িতে এনে কয়েকবার ধুয়ে নেবে। বড়দের সঙ্গে নিয়ে গেলে ভালো।
তাহলে প্রশ্নের উত্তর কী দাঁড়াল? শুঁটকি তাজা মাছের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। অভাবের দিনে বাঁচার উপায় হিসেবে এর শুরু, আর স্বাদের টানে এটা টিকে গেছে।