হস্টেলের র্যাগিং, রাজনৈতিক দাদাগিরি, সামরিক ক্ষমতার ত্রাস- সবই ‘হুমকি সংস্কৃতি’-র অঙ্গ। হুমকির মুখে পড়েছেন অমিতাভ বচ্চনও।
আমরা যেন আগ্নেয়গিরির উপর বাস করছি। বাইরে থেকে তেমন হদিশ পাই না পাহাড়ের গভীর অন্দরমহলে তৈরি হচ্ছে কেমন বিস্ফোরক আলোড়ন ও উত্তাপ। সারা পৃথিবীব্যাপী এই অবস্থা। সমস্ত বাহ্যিক আনন্দ উৎসবের মধ্যেও ‘থ্রেট কালচার’ বা ‘হুমকি সংস্কৃতি’-র নেপথ্যস্রোত বিচিত্র ধারায় ছড়িয়ে চলেছে আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা। মানুষ বড় শঙ্কায় আছে।
হুমকির জোর এবং ত্রাস- মানবসভ্যতার সঙ্গে আদিকাল থেকে জড়িয়ে। ‘থ্রেট কালচার’ থেকে মানুষের মুক্তি কোনও কালেই ঘটেনি। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, যত বাড়ছে বিনাশের অস্ত্র, পদ্ধতি ও শক্তি, ততই যেন হুমকির সংস্কৃতি আরও ব্যাপ্ত ও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। সমাজ-সংসার, কর্মক্ষেত্র, রাজনীতি, ধর্মনীতি- সর্বত্র যখন-তখন থাবা বসাচ্ছে হুমকি। সম্প্রতি হুমকির শিকার ভারতজোড়া খ্যাতির অধিকারী বলিউড সুপারস্টার অমিতাভ বচ্চন। হুমকির বার্তা হল: আগামী ৩১ অক্টোবর থেকে ২৭ নভেম্বরের মধ্যে মুম্বইতে অমিতাভ বচ্চনের বাসগৃহ ‘জলসা’ গ্রেনেড দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হবে। এই হুমকির বার্তা পাঠানো হয় মুম্বইয়ের মেয়র ঋতু রাজেশ তাওরের অফিশিয়াল মেল আইডি এবং বান্দ্রা-কুরলা কমপ্লেক্সের একটি স্কুলে। মেলের দাবি অনুসারে, এ বার্তা পাঠিয়েছে ‘খলিস্তান ন্যাশনাল আর্মি’। কেন ‘বিগ বি’-কে এই হুমকি? সে বার্তা দেওয়া হয়নি। দু’-বছর আগে বান্দ্রায় আরও এক বলিউড সুপারস্টার সলমন খানের বাড়ি ‘গ্যালাক্সি’ লক্ষ্য করেও গুলি চালানো হয়। এবং সলমনকে হত্যার হুমকি জারি থেকেই গিয়েছে। উদ্বেগ থেকে তাঁর এবং তাঁর রক্ষীদের নিস্তার নেই। গত সপ্তমীর দিন থেকে আরও এক আতঙ্ক: জুহুর ফুটবল মাঠের বাইরে টাইগার শ্রুফের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি!
‘থ্রেট কালচার’ থেকে মানুষের মুক্তি কোনও কালেই ঘটেনি। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, যত বাড়ছে বিনাশের অস্ত্র, পদ্ধতি ও শক্তি, ততই যেন হুমকির সংস্কৃতি আরও ব্যাপ্ত ও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
তবে শুধু যে সেলিব্রিটি বা বিপুল ধনী মানুষরাই হুমকির শিকার, তা তো নয়। এক-এক সময় মনে হয়, প্রতিটি মানুষের জীবনে কোনও না কোনওভাবে হুমকির অভিজ্ঞতা আসে। সংবাদপত্রের পাতায় প্রায় প্রতিদিন চোখে পড়ে সাধারণ সংসারে খুনোখুনির খবর। রক্তারক্তি হত্যার ঘটনা ঘটছে সাধারণ সংসারে, স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন, নিকট আত্মীয়স্বজনের মধ্যে। যে-কাহিনি মৃত্যু পর্যন্ত গড়াতে পারে তার সঙ্গে কি মিশে থাকতে পারে না নিত্যদিনের হুমকি, ত্রাস, জবরদস্তি, অত্যাচার? হুমকির কারণ হতে পারে প্রেম, ঈর্ষা, বঞ্চনা, নানাবিধ হতাশা, প্রতিশোধ, বা আর্থিক দেনাপাওনার গরমিল। এসবের বাইরেও স্কুল-কলেজ ও ছাত্রদের হস্টেলে আরও একরকম হুমকির সংস্কৃতি চালু আছে, যার প্রধান উদ্দেশ্য হল, মানসিক বা শারীরিকভাবে দুর্বল নতুন ছাত্রের উপর নানারকম অমানবিক অত্যাচার, এও ‘হুমকি সংস্কৃতি’-র আর-একটি রূপ।
হস্টেলের র্যাগিং থেকে রাজনৈতিক দাদাগিরি থেকে কূটনীতির চাপসৃষ্টি থেকে সামরিক ক্ষমতার ত্রাসন- সবই কিন্তু মানুষের ইতিহাসে ‘হুমকি সংস্কৃতি’-র অঙ্গ। দুঃখের বিষয়, শঙ্কারও বিষয়- যতই মানুষ আপাতভাবে সভ্য হচ্ছে, ততই যেন বাড়ছে তার হুমকির জোর ও আধিপত্য। অধিকার ও ক্ষমতার শাসন বজায় রাখতে বাড়ছে নাশের প্রবণতা।
