সীমান্তঘেঁষা জেলা সাতক্ষীরায় মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ফেনসিডিল, ইয়াবা, গাঁজা ও ক্রিস্টাল মেথসহ বিভিন্ন মাদকের অবৈধ বেচাকেনা এবং মাদকাসক্তির কারণে তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, মাদকের সহজলভ্যতা, চোরাচালান এবং প্রভাবশালী কারবারিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, মাদকাসক্তির প্রভাবে চুরি, ছিনতাই, কিশোর অপরাধ ও পারিবারিক সহিংসতার মতো সামাজিক সমস্যাও বাড়ছে। তবে এসব অপরাধের সঙ্গে মাদকাসক্তির সম্পর্ক এবং জেলায় মাদক সমস্যার প্রকৃত চিত্র নির্ধারণে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য প্রয়োজন।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সাতক্ষীরার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো দিয়ে মাদক চোরাচালানের ঝুঁকি রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্ত পেরিয়ে আসা মাদক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত। তাঁদের দাবি, মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করেও মাদকের বেচাকেনা চলছে। এতে অবৈধ লেনদেন শনাক্ত করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও বেকার তরুণদের একটি অংশ মাদকাসক্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। মাদকের পেছনে অর্থ ব্যয় করতে গিয়ে অনেকে পড়াশোনা ও স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন বলেও দাবি তাঁদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শহরের এক কলেজ শিক্ষক বলেন, “আমাদের চোখের সামনে একটা প্রজন্ম শেষ হয়ে যাচ্ছে। পড়ালেখা বাদ দিয়ে তরুণরা দিন-রাত মাদকের টাকার খোঁজে ঘুরছে। মাদক না পেয়ে নিজ ঘরে বাবা-মাকে মারধর করার ঘটনা এখন নিত্যদিনের।” তবে এ ধরনের ঘটনার ব্যাপকতা যাচাই করতে স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য জরুরি।
মাদকাসক্তির কারণে অনেক পরিবার আর্থিক ও মানসিক সংকটে পড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ নেই। বিদ্যমান সেবাকেন্দ্রগুলোর ব্যয়ও অনেক পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মাদক সমস্যার কার্যকর সমাধানে শুধু অভিযান পরিচালনা যথেষ্ট নয়। পাশাপাশি সহজলভ্য চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান এবং পরিবারভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঝেমধ্যে মাদকসেবী ও খুচরা বিক্রেতারা গ্রেপ্তার হলেও মাদক সরবরাহের নেটওয়ার্কের মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়ে কেউ কেউ অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে তদন্ত প্রয়োজন।
অন্যদিকে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও জেলা পুলিশের দাবি, মাদকের বিরুদ্ধে তাঁদের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি রয়েছে। নিয়মিত অভিযান চালিয়ে মাদক ও চোরাচালানে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো জানিয়েছে।
সাতক্ষীরার তরুণ প্রজন্মকে মাদকের ঝুঁকি থেকে রক্ষায় সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি, মাদক সরবরাহের নেটওয়ার্ক শনাক্ত, নিয়মিত ও জবাবদিহিমূলক অভিযান এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা।
তাঁদের মতে, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এ সমস্যা মোকাবিলা কঠিন। তরুণদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি মাদকবিরোধী সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি।
মাদকমুক্ত সাতক্ষীরা গড়তে বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, বরং মাদক চোরাচালানের উৎস থেকে শুরু করে বিক্রি, সেবন, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন—সব পর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন স্থানীয়রা।
The post সাতক্ষীরায় মাদকের বিস্তার, ঝুঁকিতে তরুণ প্রজন্ম appeared first on ভোরের চেতনা.
