Published on
:
2 min read
পিনাকী চক্রবর্তী, আলিপুরদুয়ার
সময় বদলেছে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেরিয়েছে। দেশভাগের যন্ত্রণা বুকে নিয়ে ওপার বাংলা থেকে এপার বাংলায় চলে আসতে হয়েছে গঙ্গোপাধ্যায় পরিবারকে। কিন্তু বদলায়নি তাঁদের পারিবারিক দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য। কঠোর অনুশাসন, নিষ্ঠা ও প্রাচীন রীতির ধারা বজায় রেখেই আজও আলিপুরদুয়ারের গঙ্গোপাধ্যায় বাড়িতে পুজো হয় মা অজন্তার। এই পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য মায়ের ভোগে অনন্য বৈচিত্র্য। কলার বড়া ও পিঠের পাশাপাশি মায়ের ভোগে থাকে ইলিশ এবং কালজানি নদীর নদিয়ালি মাছও।
১৬৬০ সালে ওপার বাংলার ফরিদপুরে গঙ্গোপাধ্যায় পরিবারের পারিবারিক দুর্গাপুজোর সূচনা হয়েছিল। দেশভাগের পরে পরিবারের সদস্যরা চলে আসেন আলিপুরদুয়ারে। এখানেই বাড়ি তৈরি করে বসবাস শুরু হয় পরিবারের। শহরের ১১ নম্বর ওয়ার্ডের জামতলায় মা তারা মন্দিরের পাশে গঙ্গোপাধ্যায় বাড়ির ঠাকুরদালানে রয়েছে স্থায়ী মন্দির। সেখানে ১৯১১ সাল থেকে পূজিত হচ্ছেন মা অজন্তা। ওপার বাংলা থেকে প্রতিমার পুরোনো কাঠামোটি নিয়ে আসা হয়েছিল আলিপুরদুয়ারে। আজও সেই কাঠামোতেই একচালার প্রতিমা তৈরি করে পুজো হয়।
গঙ্গোপাধ্যায় বাড়ির পুজোয় পশুবলি প্রথা বহু আগেই বন্ধ হয়েছে। তবে, বলিপ্রথার ঐতিহ্য ধরে রাখতে আজও চালের গুঁড়োর মণ্ড বলি দেওয়া হয়। পাশাপাশি হলুদ রং লাগানো কাঠকয়লা দিয়ে শত্রুর প্রতীকী বলি দেওয়ার প্রথাও রয়েছে। বাড়ির বড় ছেলে এই বলি দেন। পরিবারের জ্যেষ্ঠপুত্র হিসেবে এবার সেই প্রথা পালন করবেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়।
এই বাড়ির পুজোয় ষষ্ঠীতে প্রতিমাকে সোনা ও রুপোর অলংকারে সাজানো হয়। টিপ, মুকুট, ত্রিনয়ন-সহ নানা অলঙ্কারে সাজানো হয় প্রতিমাকে। সাবেক সাজসজ্জা ও পুরনো রীতির মধ্যেই পরিবারের সদস্যরা খুঁজে পান পূর্বপুরুষদের স্মৃতি।
পুজোর ভোগেও রয়েছে বিশেষত্ব। কলার বড়া ও পিঠের পাশাপাশি ইলিশ মাছ এবং কালজানি নদীর নদিয়ালি মাছ রান্না করে নিবেদন করা হয়। তবে ইলিশের ভোগ দেওয়ার পরে রয়েছে বিশেষ নিয়ম। সরস্বতী পুজোর আগে পর্যন্ত গঙ্গোপাধ্যায় বাড়ির হেঁশেলে আর ইলিশ মাছ রান্না হয় না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই রীতি নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে আসছেন পরিবারের সদস্যরা।
নিরঞ্জনের দিনও রয়েছে এক বিশেষ প্রথা। প্রতিমার পিছনে দাঁড়িয়ে বাড়ির পুরুষেরা ধান, দুর্বা এবং ইঁদুর খোঁড়া মাটি বাড়ির মহিলাদের দিকে ছুড়ে দেন। মহিলারা আঁচল পেতে সেগুলি সংগ্রহ করেন। পরে সংগৃহীত ওই উপকরণ বাড়ির তুলসীতলায় রেখে দেন তাঁরা।
কর্মসূত্রে গঙ্গোপাধ্যায় পরিবারের বহু সদস্য আজ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছেন। কিন্তু দুর্গাপুজোর টানে তাঁরা সবাই ফিরে আসেন আলিপুরদুয়ারের বাড়িতে। পুজোর কয়েকটা দিন একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া, আড্ডা ও আনন্দে মেতে ওঠেন পরিবারের সদস্যরা। ফলে এই পুজো শুধু দেবীর আরাধনা নয়, পরিবারের সদস্যদের পুনর্মিলনেরও এক বিশেষ উপলক্ষ।
পরিবারের প্রবীণ সদস্য এবং বিশিষ্ট আইনজীবী সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, ‘আমাদের পারিবারিক পুজোয় পূর্বসূরি চালু করা শাস্ত্রীয় অনুশাসন, প্রাচীন রীতি ও নিষ্ঠা ভাঙার কোনও জো নেই। উত্তরসূরি হিসেবে আমরা আজও সেই ধারা বহন করে চলেছি।’
