প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খুলনা-বাগেরহাট সফর সম্পন্ন হয়েছে। একটি সফর, কিন্তু এর বার্তা অনেক গভীর।
নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী আকাশপথে সুন্দরবনের হিরণ পয়েন্ট পরিদর্শন করেন, দাকোপের নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে অবতরণ করেন, এরপর নৌপথে বানৌজা মোংলায় যান এবং মোংলা বন্দরের জেটি, সার্বিক কার্যক্রম ও প্রস্তাবিত বেজা ইকোনমিক জোন সরেজমিনে পরিদর্শন করেন।
এই সফর প্রমাণ করে, সরকারের দৃষ্টি এখন শুধু ঢাকা-চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক নয়, উপকূল কেন্দ্রিকও।
কেন এই সফর টার্নিং পয়েন্ট?
তিনটি কারণে।
প্রথম, মোংলা বন্দরকে জাগানো। বাংলাদেশের মোট আমদানি-রপ্তানির ৯২ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে হয়। এই একমুখী নির্ভরতা আমাদের অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। অথচ মোংলা বন্দরের সক্ষমতার ৩০-৪০ শতাংশও আমরা ব্যবহার করতে পারিনি। নাব্যতা সংকট, রাত্রিকালীন নৌ-চলাচল বন্ধ, আধুনিক কোল্ড চেইন ও সংযোগ সড়কের অভাব — এই বাস্তবতায় মোংলা ছিল কাগজে-কলমে সম্ভাবনা। প্রধানমন্ত্রীর সরেজমিন পরিদর্শন সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রমাণ।
দ্বিতীয়, বেজা ইকোনমিক জোন। মোংলা বন্দরের পাশেই প্রস্তাবিত বেজা ইকোনমিক জোন বাস্তবায়িত হলে চিত্র বদলে যাবে। খুলনা-বাগেরহাট-সাতক্ষীরা-যশোর অঞ্চলের কৃষি, চিংড়ি, পাট, হিমায়িত মৎস্য ও শিল্পপণ্য আর ঢাকায় এনে চট্টগ্রামে নিতে হবে না। সরাসরি মোংলা থেকেই বিশ্ববাজারে যাবে। এতে পরিবহন খরচ ৩০% কমবে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উপর চাপ কমবে এবং স্থানীয়ভাবে ২ লক্ষাধিক মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান হবে।
তৃতীয়, সুন্দরবন। প্রধানমন্ত্রী উন্নয়নের আগে সুন্দরবনকে দেখেছেন, আকাশপথে হিরণ পয়েন্ট দেখেছেন। এর বার্তা পরিষ্কার — উন্নয়ন হবে, কিন্তু সুন্দরবনকে রেখে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়, এটি ৪ কোটি উপকূলবাসীর জন্য জাতীয় নিরাপত্তা ঢাল। এই ঢাল রক্ষা করেই বাণিজ্য বাড়াতে হবে।
এই সফর থেকে এখন জনগণের প্রত্যাশা তিনটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপের:
১. মোংলা বন্দরের পূর্ণাঙ্গ ড্রেজিং ও রাত্রিকালীন নৌ-চলাচলের সময়সীমা ঘোষণা।
২. বেজা ইকোনমিক জোনে বিনিয়োগ আহ্বান ও অবকাঠামো নির্মাণের সুস্পষ্ট টাইমলাইন।
৩. সুন্দরবনকেন্দ্রিক ইকো-ট্যুরিজম ও উপকূলীয় বেড়িবাঁধ সংস্কারে একটি বিশেষ তহবিল গঠন।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল দীর্ঘদিন উন্নয়ন বৈষম্যের শিকার। এই সফর যদি দ্রুত কর্মপরিকল্পনায় রূপ নেয়, তবে “আঞ্চলিক বাণিজ্য-বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রত্যাশা” শুধু একটি শিরোনাম থাকবে না, এটি হবে উপকূলের ২ কোটি মানুষের ভাগ্য বদলের ইতিহাস।
আমরা আশাবাদী, মোংলা থেকে যে জাগরণ শুরু হলো, তা পুরো উপকূলকেই জাগিয়ে তুলবে।
লেখক: রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিক এবং রাষ্ট্রচিন্তক।
