সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়া ইউনিয়নের ওয়াহেদুজ্জামান সানা ওরফে শামীমকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনী আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
রোববার (১৮ অক্টোবর) রাত ৭টার দিকে সাতক্ষীরার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম তৃতীয় আদালতের বিচারক নূসরত জাহানের খাসকামরায় তিনি জবানবন্দি দেওয়া শুরু করেন। রাত সাড়ে ৯টার দিকে তা শেষ হয়।
গ্রেফতার ফজলুল হক আমিনী দেবহাটা উপজেলার দক্ষিণ পারুলিয়া গ্রামের কারী রুহুল আমিনের ছেলে।
কালিগঞ্জ উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের ফরিদপুর গ্রামের বাসিন্দা ও ফজলুলের চাচাতো ভাই বসির আহম্মেদ জানান, ফজলুলের জন্ম ফরিদপুর গ্রামে। প্রায় ২৮ বছর আগে তার বাবা কারী রুহুল আমিন পরিবার নিয়ে দক্ষিণ পারুলিয়ায় বসবাস শুরু করেন। ফজলুল ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
বসির আহম্মেদের ভাষ্য অনুযায়ী, শামীমকে হত্যার পর ফজলুল তার বাড়িতে চলে আসেন। শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাত ১০টার দিকে স্ত্রী ও সন্তানের জীবন রক্ষায় আদালতে আত্মসমর্পণের বিষয়ে তিনি বসিরের সঙ্গে পরামর্শ করেন। এ বিষয়ে স্থানীয় বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন বসির। তবে এরই মধ্যে রাত সাড়ে ১০টার দিকে এসআরবি সদস্যরা বসিরের বাড়িতে প্রবেশ করেন। ফজলুলের অবস্থান জানতে চাইলে বসির তা নিশ্চিত করেন। রাত পৌনে ১১টার দিকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দেবহাটা থানার উপপরিদর্শক আল আমিন জানান, শনিবার রাত পৌনে ১১টার দিকে কালিগঞ্জ উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের ফরিদপুর গ্রামের বেসরকারি বিমা কর্মী বসির আহম্মেদের বাড়ি থেকে ফজলুল হক আমিনীকে গ্রেফতার করা হয়। রোববার রাত ৭টার দিকে তাকে আদালতে হাজির করা হলে তিনি শামীম হত্যা মামলায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।
আদালতের দায়িত্বশীল সূত্রের বরাতে জানা যায়, জবানবন্দিতে ফজলুল হক আমিনী বলেছেন, শামীম নাস্তিক ছিলেন। তাকে হত্যার কোনো উদ্দেশ্য তার ছিল না, ঘটনাটি দুর্ঘটনাবশত ঘটেছে বলে তিনি দাবি করেন। এ সময় হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের নামও প্রকাশ করেন বলে জানা গেছে। তবে হত্যাকাণ্ডের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে এ ঘটনায় বীরত্ব প্রকাশ করে বক্তব্য দিতে দেখা যায়।
সাতক্ষীরা আদালত পুলিশের পরিদর্শক নাজমুল হক জানান, ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি শেষে রোববার রাত ৯টার পর ফজলুল হক আমিনীকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, দেবহাটা উপজেলার বড়শান্তা গ্রামের মৃত শামসুদ্দিন সানার ছেলে ওয়াহেদুজ্জামান সানা ওরফে শামীম ১০ থেকে ১২ বছর ধরে মানসিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। মহানবীকে কটূক্তি করেছেন—এমন একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর গত ১৩ অক্টোবর সন্ধ্যার পর ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বে তার বাড়িতে ভাঙচুর ও মারধরের ঘটনা ঘটে।
আহত শামীমকে কুলিয়ার ডা. এমএ সবুরের ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। পরদিন ১৪ অক্টোবর সন্ধ্যায় একই ব্যক্তির নেতৃত্বে তার ওপর দ্বিতীয় দফায় হামলা হয়। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। রাত সাড়ে ১০টার পর হাসপাতালের ওয়ার্ডে ঢুকে চিকিৎসক, পুলিশ ও আনসার সদস্যদের সামনে তার ওপর তৃতীয় দফায় হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই আব্দুল জলিল বাদী হয়ে গত ১৫ অক্টোবর দেবহাটা থানায় মামলা করেন। মামলায় ফজলুল হক আমিনী, পারুলিয়া ইউনিয়ন জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক সাদিকুল ইসলাম, ৭ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি কামরুল গাজীসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ২৫০ জনকে আসামি করা হয়। এর আগে ১৫ অক্টোবর রাতে মোক্তার হোসেন খান এবং ১৬ অক্টোবর সকালে নিজ বাড়ি নাজিরের ঘের থেকে আসাদুল্লাহ মোল্ল্যাকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
