‘ক্লাসিকো সবসময়ই আলাদা। এটা ফুটবলের সেরা ম্যাচ। পুরো বিশ্ব এই ম্যাচে চোখ রাখে। এখানে তিন পয়েন্ট জিততে পারেন, কিন্তু ব্যাপারটা এর চেয়েও বড় কিছু। ক্লাসিকোর অংশ হতে পারা অসাধারণ,’ কথাগুলো বলেছেন বার্সেলোনার জার্মান কোচ হ্নসি ফ্লিক!
লা লিগার চলতি মৌসুমের প্রথম ক্লাসিকো অনুষ্ঠিত হবে রোববার বার্সেলোনার কাম্প ন্যুতে। বাংলাদেশ সময় রোববার দিবাগত রাত ১টায় শুরু হবে ম্যাচটি। শিরোপার দৌড়ে ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগ যেমন বার্সেলোনার সামনে, তেমনি ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফেরার বড় মঞ্চ রিয়ালের জন্য।
এবার এল ক্লাসিকোর বাড়তি আকর্ষণ মোরিনিওর প্রত্যাবর্তন। একসময় পেপ গার্দিওলার বার্সেলোনার সঙ্গে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িয়েছিলেন এই পর্তুগিজ কোচ। দীর্ঘ বিরতির পর আবারও তাঁর সামনে সেই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী। অন্যদিকে, হান্সি ফ্লিকের বার্সেলোনা মৌসুমের শুরুতে দুর্দান্ত ছন্দে থাকলেও চ্যাম্পিয়নস লিগে পিএসজির কাছে হার তাদের সামনে কিছু প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে মোরিনিও বলেন, ‘বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ আরও অনেক ম্যাচ আছে, কিন্তু ক্লাসিকো একটাই, এটি এলে যেন পুরো পৃথিবী থমকে যায়’ দ্বিতীয় মেয়াদে রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হিসেবে বার্সেলোনার বিপক্ষে আবারও এই দ্বৈরথে নামার আগে তাঁর বক্তব্য যেন ক্লাসিকোর মাহাত্ম্যই নতুন করে মনে করিয়ে দেন স্পেশাল ওয়ান।
পয়েন্টের ব্যবধান, চাপ বেশি রিয়ালের ওপর
মৌসুমের প্রথম নয়টি লিগ ম্যাচেই জয় পেয়েছে বার্সেলোনা। পূর্ণ ২৭ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে থাকা ফ্লিকের বার্সা এবারও টানা তৃতীয় লিগ শিরোপার লক্ষ্যে এগোচ্ছে। বিপরীতে, রিয়াল বেতিস ও আতলেতিকো মাদ্রিদের কাছে হারের খেসারতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে ছয় পয়েন্ট পিছিয়ে রয়েছে রিয়াল।
২০১২-১৩ মৌসুমের পর লিগের শুরুর দিকে এত বড় ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েনি মাদ্রিদের দলটি। সেবারও কোচ ছিলেন মোরিনিও। নয় ম্যাচ শেষে বার্সেলোনার চেয়ে আট পয়েন্ট পিছিয়ে থাকা রিয়াল শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় হয়েছিল ১৫ পয়েন্টের ব্যবধানে।
এবার অবশ্য সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে রিয়াল। আন্তর্জাতিক বিরতির পর সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা চার ম্যাচ জিতেছে তারা। লিগে ভিয়ারিয়াল ও সেভিয়াকে হারানোর পাশাপাশি চ্যাম্পিয়নস লিগে রোমা ও আরবি লাইপজিগের বিপক্ষেও পেয়েছে জয়। শেষ তিন ম্যাচেই প্রতিপক্ষের জালে চারটি করে গোল করেছে দলটি।
তবে ক্লাসিকোতে আগের ম্যাচের ফল খুব একটা কাজে আসে না, এমনটাই মনে করেন মোরিনিও। এই পর্তুগিজ কোচ বলেন, ‘আমরা বেশ ভালো ছন্দে আছি, ম্যাচ জিতেছি, ভালো খেলছি, গোল করছি। তবে ক্লাসিকোর ক্ষেত্রে এর আগে কী করেছেন, তা মোটেও গুরুত্বপূর্ণ নয়; এর কোনো প্রভাবই এখানে পড়ে না। ক্লাসিকো একেবারেই আলাদা। আশা করি, ম্যাচটি দারুণ হবে এবং আমরাই জিতব।’
ইয়ামাল-এমবাপের দিকে নজর
বার্সেলোনার আক্রমণে সবচেয়ে বড় ভরসা লামিন ইয়ামাল। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই স্প্যানিশ এই উইঙ্গার দলের আক্রমণভাগের অন্যতম প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছেন। চলতি লিগে প্রথম নয় ম্যাচে ৮ গোল করেছেন তিনি। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ১২ ম্যাচে তাঁর গোলসংখ্যা ১০, সঙ্গে সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ১০ গোল।
তবে রিয়ালের বিপক্ষে ইয়ামালের সামনে থাকবে কঠিন পরীক্ষা। মাদ্রিদের আক্রমণের প্রধান অস্ত্র কিলিয়ান এমবাপে। বার্সেলোনার বিপক্ষে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ১০ ম্যাচে ১২ গোল করেছেন ফরাসি ফরোয়ার্ড। এর মধ্যে পিএসজির হয়ে ৩ ম্যাচে ৪টি এবং রিয়ালের জার্সিতে ৭ ম্যাচে ৮টি গোল রয়েছে তাঁর।
একবিংশ শতাব্দীতে বার্সেলোনার বিপক্ষে এমবাপের চেয়ে বেশি গোল করেছেন রিয়ালের সাবেক দুই তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও করিম বেনজেমা। রোনালদোর গোল ২০টি, বেনজেমার ১৬টি। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, ক্লাসিকোয় এমবাপেকে সামলানো বার্সেলোনার রক্ষণভাগের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
ভিনিসিউস নেই, বিকল্প খুঁজতে হবে মরিনিয়োকে
রিয়ালের জন্য বড় ধাক্কা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের অনুপস্থিতি। প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়ের চুল টেনে লাল কার্ড দেখার ঘটনায় ৪ ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা পেয়েছেন ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড। ফলে ক্লাসিকোয় আক্রমণভাগে নতুন সমীকরণ খুঁজতে হবে মরিনিয়োকে।
যদিও চলতি মৌসুমে ভিনিসিয়ুস নিজের সেরা ছন্দে নেই। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ১১ ম্যাচে তাঁর গোল মাত্র ১টি, সঙ্গে ৩টি অ্যাসিস্ট। সাম্প্রতিক ম্যাচগুলোতে বরং নজর কেড়েছেন তরুণ উইঙ্গার ইয়ান দিওমান্ডে। এমবাপের পাশাপাশি তাঁর গতিও বার্সেলোনার রক্ষণকে চাপে ফেলতে পারে।
রিয়ালের আরেকটি ভরসা মোরিনিওর অভিজ্ঞতা। বার্সেলোনার বিপক্ষে ২৭ ম্যাচে কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এর মধ্যে রিয়ালের ডাগআউটে ছিলেন ১৭টি ক্লাসিকোয়। প্রথম মেয়াদে নিজের প্রথম ১০ ক্লাসিকোর মধ্যে মাত্র একটিতে জয় পেলেও শেষ পাঁচ ম্যাচে অপরাজিত ছিলেন, জিতেছিলেন তিনটিতে।
অন্যদিকে, বার্সেলোনাও পুরো শক্তি নিয়ে নামতে পারছে না। দানি ওলমো ও জুল কুন্দেসহ কয়েকজন খেলোয়াড়ের চোট ফ্লিকের পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে। পিএসজির কাছে ৪-২ গোলে হারের পর রক্ষণে কিছু দুর্বলতাও সামনে এসেছে। তবে ক্লাসিকোর আগে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি নেই বার্সেলোনা কোচের।
এক ম্যাচে বদলে যেতে পারে শিরোপার হিসাব
বার্সেলোনা জিতলে ব্যবধান বেড়ে দাঁড়াবে নয় পয়েন্টে। মৌসুমের এত শুরুতে এমন ব্যবধান শিরোপার দৌড়ে বড় বার্তা দিতে পারে। আর রিয়াল জিতলে ব্যবধান কমে আসবে তিন পয়েন্টে, যা প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরও জমিয়ে তুলবে।
