সংবাদ · সাধারণ
সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের কথাসাহিত্য: একজন কুশলী গল্পকথকের বয়ান
১১/১০/২০২৬

গত ১০ অক্টোবর ছিল কথাসাহিত্যিক-শিক্ষাবিদ ও নন্দনতাত্ত্বিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। তাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রকাশিত হলো তাঁর কথাসাহিত্য ঘিরে একটি আলোচনা।কোনো দশক ওয়ারী বিভাজনে না পড়েও বাংলা সাহিত্যের একজন অন্যতম প্রধান কথাশিল্পী সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। বাংলা কথাসাহিত্যে উত্তরাধুনিকতার অন্যতম প্রবর্তক তিনি। তাঁর লেখা গল্প ও উপন্যাস পড়লে সহজেই অনুমেয় হয়, তিনি তাঁর সমকালীন অপরাপর সাহিত্যিকদের থেকে নানা দিক বিবেচনায় ভিন্ন। প্রথমত, তিনি ভিন্নতা তৈরি করেছেন ভাষা নির্মাণের ক্ষেত্রে। তাঁর ভাষা অনায়াসেই পাঠককে টেনে ধরে রাখে; যে কোনো ভাষা-সচেতন পাঠক মাত্রই তাঁর ভাষার প্রেমে পড়বেন তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। তাছাড়া বর্ণনা ভঙ্গিতে তিনি যে ভিন্নতা তৈরি করেছেন তা এককথায় অনন্য ও অসামান্য। তাঁর লেখা গল্প-উপন্যাসে উত্তরাধুনিকতা ও মার্ক্সবাদের এক অপূর্ব মিশ্রণ রয়েছে। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম এক সাক্ষাৎকারে আমাকে বলেন, ‘গল্প বলায় ও লেখায় একটা সূক্ষ্ম তফাৎ আছে। আমাদের বাংলা সাহিত্যে রয়েছে গল্প বলার ঐতিহ্য, লেখার নয়। আর পাশ্চাত্যে রয়েছে গল্প লেখার ঐতিহ্য। গল্প বলতে গেলে ভাষার মৌখিকতাকে প্রাধান্য দিতে হয়।’ উদাহরণ হিসেবে তিনি লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের কথা বলেন। বাংলা সাহিত্যের মতো লাতিন আমেরিকার সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে রয়েছে গল্প বলার ঐতিহ্য। সৈয়দ ইসলাম বাংলা সংস্কৃতিতে হাজার বছর ধরে বিদ্যমান ঐ গল্প বলার ঐতিহ্যকে ধারণ করেছেন। তাই তাঁর গল্প মানুষকে একঘেয়েমি করে তুলে না। বাস্তবিক অর্থে, এ বিশ্লেষণ তাঁর পক্ষে এত চমৎকারভাবে করা সম্ভব হয়েছে কারণ তিনি নিজেও একজন উত্তরাধুনিক গল্পকথক, যিনি বিশ্বাস করেন গল্প বলায়। ঐ সাক্ষাৎকারে তিনি আরো জানান, ‘সার্থক গল্প নির্মাণের জন্য গল্প বলা ও লেখা উভয় ঐতিহ্যের মিশ্রণও জরুরি।’ বোধ করি, এ-আলোচনা উপর্যুক্ত কথাগুলোর সত্যতা অনেকাংশে প্রমাণ করবে। এ লেখার দুটি অংশ—প্রথমটি তাঁর ছোটগল্প নিয়ে আলোচনা করবে, দ্বিতীয়টি এগুবে ঔপন্যাসিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের নির্মাণ নিয়ে।সমকালীন সমাজের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি, রাজনীতি সবকিছু সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের গল্পের পরিসরভুক্ত। এ যাবৎ তাঁর প্রকাশিত গল্প-সংকলন সংখ্যা দশ। তবে এ আলোচনায় তাঁর রচিত ‘প্রেম ও প্রার্থনার গল্প’ এবং ‘সুখদুঃখের গল্প’-এ দু’টো সংকলন থেকে কয়েকটি গল্প বিশ্লেষণ করা হবে। উপর্যুক্ত সংকলনের গল্পসমূহে লেখকের চরিত্র নির্মাণে এক ধরনের বিচিত্রতা ও ব্যাপ্তি বিদ্যমান। ‘প্রেম ও প্রার্থনার গল্প’ সংকলনের দশটি গল্পে আমরা নানা শ্রেণি পেশা মানুষের বর্ণনা পাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থেকে মজুর পর্যন্ত। এ থেকে তাঁর শ্রেণি বৈষম্যহীনতা ও মানব সচেতনতার পরিচয় পাওয়া হয়। আধুনিক জীবনের বিচ্ছিন্নতা আর নিসংঙ্গতা, সুখ ও অসুখের মননশীল প্রকাশ এই সংকলনের প্রতিটি গল্প। এই সব সংবেদী গল্পে জীবন ও জীবনহীনতা একইভাবে মূর্ত হয়। আধুনিক মানুষের বিচ্ছিন্নতা, হতাশা আর সমস্যা দিয়ে লেখকের প্রায় অধিকাংশ গল্পের শুরু। আবার এই সকল সমস্যা সমাধানে লেখক নিজেই সচেষ্ট ভূূূমিকা রাখেন। তাঁর প্রতিটি গল্পের চরিত্রই গল্প শেষে এক ধরনের আশাবাদ ব্যক্ত করে। তাই পাঠক মনেও আশার সঞ্চার হয়। তিনি মানবমনের গোপন রহস্যেরও আবিষ্কারক। অতীত ও বর্তমানের মিশেলে বর্তমান বাস্তবতাকে উত্তরাধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ব্যাখ্যা করে থাকেন। মানবমনের চেতন ও অবচেতন দিক উন্মোচনেও তিনি অত্যন্ত পারদর্শী। নগর জীবনের দান্ধিকতা তাঁর গল্পে সবসময় খুব প্রাসঙ্গিক। গল্পগুলো কেমন তার উদাহরণ হিসেবে ‘প্রেম ও প্রার্থনার গল্প’ ও ‘সুখদুঃখের গল্প’ গ্রন্থ দু’টি থেকে কয়েকটি গল্প নিয়ে একটু বিস্তারিত আলোচনা করা যাক।‘প্রেম ও প্রার্থনার গল্প’-এর ‘ডিডেলাসে ঘুড়ি’ গল্পে হোসেন মিয়ার গ্যারেজের কর্মচারী ইনাম লুকিয়ে ঘুড়ি উড়ায়। যদিও ইনাম জানে তার বাবা সেতু মিয়া ঘুড়ি উড়াতে যেয়ে মারা গেছেন। হোসেন মিয়া নিজেও অপছন্দ করেন ঘুড়ি উড়ানো। কারণ ঘুড়ি উড়াতে গিয়ে তার বড় ভাই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন। সাংবাদিক আবদুল মুয়ীদ তালুকদার হোসেন মিয়ার গ্যারেজে তাঁর ভেসপা ঠিক করাতে দেন। হোসেন মিয়া ছুটির দিন সত্ত্বেও মুয়ীদ ভাইয়ের ভেসপা রেভ দিয়ে দেন। কারণ সাংবাদিক মুয়ীদ তালুকদার হোসেন মিয়ার গ্যারেজ মেয়র সাহেবের লোকজনের হিংস্র থাবা থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। এভাবেই শুরু গল্প। লেখক ঢাল্কা বাজারের ঘুড়ি তৈরির অন্যতম স্রষ্টা সেতু মিয়াকে গ্রীক পুরাণের ডিডেলাসের সাথে তুলনা করেছেন। ইনাম গ্যারেজে তার হাতের কাজ সেরে আবার ঘুড়ি উড়াতে চলে যায়। কিন্তু হায়! ঘুড়ি কান্নির অভাবে শুধু ডান দিকে কানাচ্ছে। ইনাম এই ত্রুটি লক্ষ্য করেনি। ঘুড়ি মাঠের পাশ্ববর্তী পাঁচ তলা ফ্ল্যাটের গাঁ ঘেষে দাঁড়িয়ে থাকা নারিকেল গাছে আটকে যায়। ঘুড়ি আনতে যেয়ে ইনাম একটি মেয়ের চিৎকার শুনতে পায়। সে দেখতে পায় ঢাল্কা বাজারের সবার চেনা দারোগা সাহেব উলঙ্গ মেয়েটিকে জাপটে ধরেছে। জাপটে ধরার পূর্বে মেয়েটি সাহায্য চেয়েছিল ইনামের কাছে। পরক্ষণেই সে ব্যালকনিতে দারোগা ও তার স্ত্রীকে দেখল। তারা দু’জনে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে মেয়েটিকে। ইনাম মুয়ীদ ভাইকে সব জানাল। মুয়ীদ ভাই কণ্ঠে ও লেখায় তীব্র প্রতিবাদ জানাল। এবং আছমা হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করল। গ্রেফতার হলো অবসরপ্রাপ্ত দারোগা কলিমুল¬াহ্ ও তদীয় স্ত্রী আলেফা বেগম। তবে সত্যধর্মে বিশ্বাসী মানুষজন দেখল রাজনৈতিক আশীর্বাদপুষ্ট দারোগা ও তার স্ত্রী দ্রুত ছাড়া পেল। বরং মামলার নতুন চার্জশীট হলো। এতে ইনামকে দারোগা সাহেবের ঘরের মূল্যবান সামগ্রী চুরির দায়ে অভিযুক্ত করা হলো। বলা হলো “ছেলেটা গাছ বেয়ে উঠত, আর আছমা পুঁটলা চালান দিত।” লেখক এ গল্পে সমকালীন রাজনীতির একটি অন্তসারশূন্য চিত্র অংকন করেছেন। রাজনীতিবিদ ও সমাজের বিত্তশালীদের অন্যায় দাপটে সাধারণ মানুষ যে পর্যুদস্ত এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ ডিডেলাসের ঘুড়ি গল্পটি। উত্তর-আধুুনিকতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য আধুনিক মানুষের বিচ্ছিন্নতার চিত্র তুলে ধরেছেন লেখক সাংবাদিক নীনা ও মুয়ীদ ভাইয়ের আলাপচারিতার মাধ্যমে। এবার বলি ‘সুখদুঃখের গল্প’-এ সংকলন এর কথা। যেহেতু সুখদুঃখ নিত্যদিনের জীবনযাত্রায় অবধারিত উপাদান তাই নিরবচ্ছিন্ন সুখ কিংবা দুঃখ কোনোটিই মানুষের জীবনে সম্ভব না। সুখ ও দুঃখের দোলাচলে মানব জীবনে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হয় নানা উত্থান-পতন। মানুষে-মানুষে সম্পর্ক, হাসি-কান্না, তৃপ্তি-অতৃপ্তি, প্রেম-অপ্রেম, স্মৃতি-বিস্মৃতি প্রভৃতি সবকিছুই সুখদুঃখের আওতাভুক্ত। সুখদুঃখে আছে স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন, আছে পাওয়ার সুখ, না পাওয়ার বেদনা। আছে কাম-ভোগ-বাসনা। রয়েছে রহস্যে ঘেরা মানবমন। উত্তর-আধুনিকতার বৈশিষ্ট্য সম্বলিত সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের প্রায় প্রতিটি গল্পের ভিত্তি শোনা বা দেখা ঘটনা। বলার অপেক্ষা রাখে না শহীদুল জহিরের পর, সমকালীনদের মধ্যে তিনিই সর্বাপেক্ষা সফল উত্তরাধুনিক গল্প নির্মাণে। ‘সুখদুঃখের গল্প’ সংকলনটির গল্পগুলো বাস্তব-অবাস্তব আর জাদুবাস্তবতার মিশেলে পরিবেশিত। কুড়িটি গল্প চলমান চিত্রের মতো । নগর আর প্রান্ত বাংলার মানুষ গল্পগুলোর কুশীলব। সুখদুঃখের মনস্তাত্বিক বিশ্লেষণও গল্পগুলোতে পাওয়া যায়। উত্তর-আধুনিকতাবাদের যে বিষয়গুলো গল্পগুলোতে স্পষ্ট তা হলো- চরিত্র নির্মাণে গবেষণা, গতানুগতিক গল্পকাঠামো ও চরিত্র নির্মাণে অনাগ্রহ, গল্প কথনে নতুন ধারা সৃষ্টি, cultural hibridity, মেদহীন বাক্যবিন্যাস এবং শব্দশক্তি উদ্ঘাটন। সাহিত্যের একজন সিরিয়াস পাঠক থেকে সরল-সাধারণ পাঠক পর্যন্ত তাঁর গল্পে অনায়াসে মজে যাবে প্রাঞ্জল ভাষাবোধের জন্য। এই অসামান্য ভাষাবোধ তাঁর গল্পগুলোকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তাই বলে ভাষা, গল্পের বিষয়বস্তু ছাপিয়ে ওঠেনি বরং ভাবকে প্রস্ফুটিত করে এমন একটি উপযোগী ভাষা তৈরি করেছেন লেখক। পাঠকের আগ্রহ নিবৃত্তায়নে ‘সুখদুঃখের গল্প’ সংকলন থেকে দু’একটি গল্পের কিছু দিক নিয়ে আলাপ করা যাক। প্রথমেই বলি ‘এক জীবন’ গল্পটির কথা। গল্পটি বিভিন্ন চরিত্রের বিরতিহীন চৈতন্যপ্রসূ অভিজ্ঞতা বা ভাবনাচিন্তা নিয়ে তৈরি যাকে ইংরেজি সাহিত্যে বলেstream of consciousness technique. ইংরেজি সাহিত্যে এ কৌশল জেমস্ জয়েস ও ভার্জিনিয়া উলফ্ সফলভাবে ব্যবহার করেছেন । সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ‘এক জীবন’ গল্পে এই কৌশলটি ব্যবহার করেছেন। গল্পে খুব একটা বর্হিমুখী কর্মস্পৃহা চোখে পড়েনা। যা ঘটে তার সবটুকুনই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রসমূহের মনোরাজ্যে ঘটে যাওয়া চেতন চিন্তার সম্মিলন। এ ধরনের গল্পে সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । পুরো গল্পের সময়সীমা ভোর ৫টা থেকে রাত ১২.৩০ এর মধ্যে। গল্পকার অতি দ্রুত এক চরিত্রের viewpoint থেকে অন্য চরিত্রে যান। সময় ও চরিত্রসমূহের মনোরাজ্যে চেতন চিন্তাসমূহের মধ্যে এক ধরনের মেলবন্ধন তৈরি করেন। এ ধরনের ছোটগল্প লেখার অভিজ্ঞতা বাংলা সাহিত্যে খুব বেশি লেখকের নেই। এ মুহূর্তে মনে পড়ছে রশীদ করিমের নাম যিনি প্রাগুক্ত ধারায় গল্প তৈরিতে পারদর্শী ছিলেন। যাহোক, ‘সুখদুঃখের গল্প’ সংকলনের আরেকটি অসাধারণ গল্প ‘মেয়ে’। লেখক এখানে সমকালীন সমাজে নারী স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতার চিত্র দেখিয়েছেন। এবং একইসাথে গল্পশেষে নারীর স্বাধীনচেতা রূপটিও দেখিয়েছেন। সামাজিক ভীতি, কুসংস্কার আর জড়তার ঊর্ধ্বে ওঠে গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র তার দৃপ্ত প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। অন্যদিকে ‘কাঁঠাল কন্যা’ গল্পটিতে জাদুবাস্তবতার ছোঁয়া পাওয়া যায়। আফসার রাতে স্বপ্নে দেখেন কাঁঠাল ফেঁড়ে একটি বিবস্ত্র মেয়ে বেরিয়ে আসে। আফসার এই কাঁঠাল কন্যার গল্প গল্পকথককে বলেন। গল্পকথকের এমন সক্রিয় উপস্থিতি বর্ণনাকে আরো আকর্ষণীয় করে তোলে। ‘সুখদুঃখের গল্প’ গ্রন্থের এমন বিষয় বৈচিত্র্য মানুষের জীবন যাপনের বিচিত্রতার সাক্ষ্য দেয়, বের করে আনে মানুষের মনে লুকিয়ে থাকা নিগূঢ় ভাবনা। এসব ভাবনা কখনও নৈতিক, কখনও অনৈতিক, কখনও প্রথাগত আবার কখনও প্রথাবিরোধী। তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলোতে দন্ধের মেরুকরণ চলছেই।এবারে বলি ঔপন্যাসিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের কথা।শকুনের ডানা: প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের এক সংবেদী গল্প : ভি. এস. নাইপলের একটি নাতিদীর্ঘ বাক্য দিয়ে শুরু করি। তাঁর ভাষায়-“একটি উপন্যাসের ‘ভালো শুরু’ একজন লেখককে হাজার বছর বাঁচিয়ে রাখে”। সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ‘শকুনের ডানা’ (২০১৩) উপন্যাসটি আমাকে নাইপলের ঐ কথার মতোই আকৃষ্ট করে, যেমন আকৃষ্ট করে ‘খোয়াবনামা’ উপন্যাসে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের দেয়া বিলের বর্ণনাটি। অথবা গার্সিয়া মার্কেজের ‘দি অন হানড্রেড ইয়ারস অব সলিচিউড’ কিংবা তাঁর ছোটগল্প ‘বিগ মামাস্ ফিউনারেল’ বা নাইপলের ‘দি এনিগমা অব এরাইভল’-এর শুরুর লাইনগুলো পড়ে যেভাবে আন্দোলিত হই, ঠিক তেমনি ‘শকুনের ডানা’-এর শুরুটা আমাকে চৌম্বকের মতো ধরে রাখে, প্রশান্তি দেয়। একজন উত্তরাধুনিক লেখক তাঁর গল্প বা উপন্যাসে ঘটনা পরম্পরা বজায় রাখতে পছন্দ করেন না। তাই মূল আখ্যানের মধ্যে ঢুকে পড়ে অনকগুলো প্রতি আখ্যান। ‘শকুনের ডানা’ উপন্যাসে সৈয়দ ইসলামও মূল গল্পের ছায়ায় গুটিকয়েক ছোট ছোট গল্প বলেছেন। প্রচলিত ধারার উপন্যাসে পাঠক কেবল একটি নির্দিষ্ট ঘটনা বা কাহিনির আগাগোড়া শুনে অভ্যস্থ। অথচ ‘শকুনের ডানা’র মতো একটি উপন্যাস পড়ে পাঠক ভাববেন, তাঁরা যেন একটি সরু গলি দিয়ে প্রবেশ করে বিশাল এক মাঠে পেীঁছেছেন, যেখানে বহুজনের জীবনের গল্প মিলেমিশে একাকার। এসব গল্পে উঠে এসেছে অজানা অথচ মনে হবে চিরচেনা এক ভূগোলের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের কথা। ‘শকুনের ডানা’ উপন্যাসে মূল গল্পের ছায়ায় ও যত্নে বেড়ে ওঠা প্রতিটি খণ্ড গল্প বিচরণে স্পষ্ট হয়ে ওঠে মনজুরুল ইসলামের ক্ষুদ্রতা (microcosm) থেকে সমগ্রতায় (macrocosm) যাত্রার প্রয়াস। এটি নিশ্চিত, বহু পাঠক এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গল্পে নিজেদের খুঁজে পাবেন। অথবা এসকল গল্পের সাথে মেলানোর চেষ্ট করবেন নিজের ভেতর লুকিয়ে থাকা গল্পসমূহের। খুব বেশি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও যে মানুষ প্রবল বোধসম্পন্ন হয় এ উপন্যাসের কিছু চরিত্র যেমন-শৈলেন কাকু, আজম প্রমুখ এর প্রমাণ দেয়, আবার লেখাপড়া জানা মানুষও বোধে খাটো হয়ে থাকে কিংবা সারাজীবন একই আদর্শ নিয়ে বাঁচতে পারেন না-এমন উদাহরণও ‘শকুনের ডানা’তে নেহাত কম নয়। যেমন-এনজিও কর্মকর্তা ড. ইরফান মালিক। বরাবরই সৈয়দ ইসলাম তাঁর প্রায় সব উপন্যাসে চরিত্রদের পূর্ণাঙ্গভাবে বেড়ে উঠার জন্য পর্যাপ্ত স্বাধীনতা দিয়ে থাকেন। এ বেলায়ও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। গতানুগতিক উপন্যাসের মতো কোনো একটি বা দুটি চরিত্র এ উপন্যাসে অতি জরুরি নয় বরং মূলগল্পের পাশাপাশি প্রায় সব চরিত্রের জীবনের গল্প লেখক বলে যান সমান গুরুত্ব দিয়ে। গল্প বলতে গিয়ে কখনও কখনও লেখক নিজেই একটি সক্রিয় চরিত্রে আবির্ভূত হন। আর উত্তরাধুনিকতার এমন বৈশিষ্ট্য লেখক হিসেবে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে তাঁর সমকালীনদের চেয়ে আলাদা করেছে। এবার একটু মূল গল্পে প্রবেশ করি। চন্ডিপুর, ভদরটেক গ্রাম সংলগ্ন বিস্তর হাওড় এলাকায় বিদেশি অর্থায়ন ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সমন্বিত উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে উঠে পড়ে লেগেছে স্থানীয় সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কিছু মানুষ। একদিকে বিশ্বমহাজন, সরকারি চাটুকার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, এনজিও কর্মকর্তাদের নানান হিসাব নিকাষ, মাপজোখ ও তদারকির মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন উত্তর নিজেদের পকেট ভারি করার লোলুপ ইচ্ছা, অন্যদিকে প্রকল্প সংস্লিষ্ট অরিন এবং গ্রামবাসীদের মধ্যে আজম, সাফিয়া ও শৈলেন কাকুর মতো বোধসম্পন্ন মানুষদের হাওড় এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার দৃঢ় প্রয়াস-এই দুয়ে মিলে এ উপন্যাসের এগিয়ে চলা। হাওর অঞ্চলের সহজ-সরল-সংযমী মানুষের ওপর শকুনরূপী জনাকতক মানুষের লোলুপ দৃষ্টি জাগিয়ে দেয় কিছু মানুষের বোধকে। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে হাওড় অঞ্চলের মানুষের সুবিধার চেয়ে অসুবিধাই হবে বেশি এমন চিন্তার উন্মেষ ঘটে প্রকল্প বাস্তবায়নে নিয়োজিত বিজ্ঞানী ভন হফম্যান ও এনজিও এর মাঠ পর্যবেক্ষক অরিনের মাঝে। হফম্যান প্রকল্পের ভবিষ্যত ফলাফল জনগণের অনুকূলে না দেখে চাকুরি ছেড়ে নিজ দেশে ফিরে যান। অপরদিকে, অরিন, সাফিয়া, আজমের মতো কিছু মহৎ প্রাণ তরুণ-তরুণীদের ঐকান্তিক চেষ্টায় গ্রামবাসি একত্র হয়ে এ প্রকল্পের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। সরকারি লুটেরা উপায়ন্তর না দেখে প্রকল্প উদ্বোধনের তারিখ নির্ধারণ করেও শেষমেষ তা স্থগিত করতে বাধ্য হয়। এলাকার জনপ্রতিনিধি আফসার মিয়াও রীতিমতো টালমাটাল হয়ে পড়েন রাস্তায় হাজার হাজার মানুষের প্রতিবাদ সমাবেশ দেখে। এমন একটি উপন্যাসকে নানাদিক থেকে বিচার-বিশ্লেষণ করে prophetic বলা যেতে পারে। ওরহান পামুকের ‘মাই নেম ইজ রেড’ কিংবা ‘স্নো’ পড়ে যেমন তুরস্ককে জানা যায়, তেমনি ‘শকুনের ডানা’ পড়ে জানা যাবে সমসাময়িক বাংলাদেশকে। এদিক বিবেচনায়, ‘শকুনের ডানা’ এর মতো একটি উপন্যাসের প্রাসঙ্গিকতা, হলফ করে বলা যায়, বহুকাল পরেও আমরা অনুভব করব। ২. তিন পর্বের নিষ্ঠুর জীবনসৈয়দ মনজুরুল ইসলাম-এর দ্বিতীয় উপন্যাস, তিন পর্বের জীবন (২০০৮) পড়ার সময় আমি এক মুহূর্তের জন্যও আলবেয়র কামুর ‘দি আউটসাইডার’-এর কথা মন থেকে সরাতে পারিনি, বিশেষভাবে ওই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র মিয়েরসোর কথা। মিয়েরসোর নানা প্রশ্নের উত্তর এখনও খুঁজি আমি। ভোলা কঠিন কামু সৃষ্ট মিয়েরসোকে। প্রথাগত সমাজের চোখে সে ঘৃণ্য হলেও যে কোনো চিন্তাশীল মানুষের কাছেই মিয়েরসো ভাবনার খোরাক। তার মুখ দিয়ে উচ্চারিত সত্যকে পাশ কাটানোর সাহস আমাদের নেই, আরেকটু গভীরভাবে বললে, অনেকেরই নেই। মিয়েরসোর মতো ‘তিন পর্বের জীবন’ উপন্যাসের কেন্দ্রিয় চরিত্র শাহীনও পাঠকের মনোজগতে গুটিকয়েক প্রশ্নের জন্ম দেয়, যেসবের উত্তর দেয়া দুরূহ। পাঠক বোধ হয় ভাবছেন, আমি উক্ত দুই উপন্যাসের মধ্যে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করতে শুরু করেছি। না, সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের শাহীন আর কামুর মিয়েরসোর মধ্যে ব্যবধান বিস্তর—প্রেক্ষাপটগত, ধারণাগত ও সময়গত। তবে তাদের মিল রয়েছে সত্য প্রকাশের অমিত ক্ষমতা ও এক জীবনের সত্যিকার মানে খুঁজে না পাওয়ার মধ্যে।পুরো উপন্যাসটির তিনটি ভাগ- বৃত্তপর্ব, বিন্দুপর্ব ও শূন্যপর্ব। বৃত্তপর্বে দেখা যায়, স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে সুখের জীবন শাহীনের। সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ভাষায়: ‘জড়াজড়ি করা সুখী পরিবার।’ নাদিরা পাগলের মতো ভালোবেসে বিয়ে করেছে শাহীনকে। সমাজতন্ত্রের আদর্শে বিশ্বাসী শাহীন ছিল একটা সাপ্তাহিক পত্রিকার সহকারি সম্পাদক। বেশি কথা বলতে পছন্দ করত না। সত্যের সাথে কখনো আপষ করত না। শাহীন সম্পর্কে এতসব তথ্য উপস্থাপন করতে গিয়ে লেখক এটিও আমাদের জানিয়ে দেন, শাহীনকে তিনি বহুবছর ধরে চেনেন। এবং শাহীন যে পত্রিকায় কাজ করত তাতে প্রায়ই তিনি উপসম্পাদকীয় লিখতেন। বর্তমানে শাহীন কারাগারে। এবার বলি শাহীনের কারাবাসের কারণ সম্পর্কে। মিয়েরসো কিংবা শাহীনের মতো মানুষ খুন করতে পারে তা বিশ্বাস করতে সকলেরই কষ্ট হওয়ার কথা। ভূমধ্যসাগরীয় উত্তাপ আর সূর্যের অসহনীয় আলোকরশ্মি যেমন মিয়েরসোকে তাড়িত করেছিল খুন করতে, তেমনি শাহীনের হাতে থাকা ছুরিও তার অনিচ্ছা সত্ত্বে ঢুকে পড়ে সুখেন্দুর বুকে। অতিরিক্ত মদ্যপান তাকে অপ্রকৃতস্থ করেছিল। গোটা পাঁচেক মানুষের ধস্তাধস্তির মাঝে নিজেকে সামলাকে পারেনি শাহীন। আদালতে সত্য কথা স্বীকার করে শাহীন, যেমনটি করেছিল মিয়েরসো। অথচ সত্যটিকে একটু এড়িয়ে বা ঘুরিয়ে বললে শাহীনের সাজার পরিমান হয়তো অনেক কমে যেত। যাহোক, নাদিরার বাবা অর্থাৎ শাহীনের শ্বশুর অনেক চেষ্টা করেন মামলার একটা সুরাহার জন্য কিন্তু তেমন একটা লাভ হয়নি। প্রথমে ঢাকা জেলে থাকাকালে নাদিরা প্রায়ই বাচ্চাদের সঙ্গে নিয়ে শাহীনকে দেখতে যেত। কুমিল্লা জেলে স্থানান্তরিত হওয়ার পর নাদিরার সে সুযোগ কমে আসে। তখন যোগাযোগ হতো চিঠির মাধ্যমে। বছর চারেক অতিবাহিত হওয়ার পর নাদিরা চিঠি লেখাতেও অনিয়মিত হয়ে পড়লো।এদিকে নাদিরার জীবনে বাদলের প্রবেশ অনেকটা এক সংস্কৃতির ভেতর ভিন্ন আরেক সংস্কৃতির অনুপ্রবেশের মতো, যা চাইলেও ঠেকানো যায় না। নাদিরা শাহীনের জায়গাটা অন্য কাউকে দিতে চায়নি, বরং বাদল সেই জায়গাটা তৈরি করে নিয়েছে। শাহীনের সত্যবাদিতার চর্চা তো নাদিরার নিসঙ্গতা ও কষ্টকে মোচন করতে পারেনি। গভীর সমবেদনা নিয়ে বাদল নাদিরার কষ্টগুলো ভাগ করে নিতে এগিয়ে আসে। এই সমবেদনা নাদিরার মধ্যে ভিন্ন এক অনুভূতির জন্ম দেয়, যা নাদিরার তৈরি আপন জগতে পরিবর্তন আনে। এদিকে শাহীন তার ছোট ভাই জাহিনের মাধ্যমে জানতে পারে নাদিরার জীবনে বাদলের উপস্থিতির কথা। পরবর্তী সময়ে দেখি, শাহীন জেলে ম্যনিক ডিপ্রেশনে ভুগছিল। তার সুস্থতার সব ধরনের চেষ্টা চলছিল। দেখতে দেখতে ঘনিয়ে আসলো তার ছাড়া পাওয়ার দিন।বিন্দুপর্বের শুরু। কাকতালীয়ভাবে জেল থেকে বের হওয়ার দিন শাহীনের দেখা হয় এ-উপন্যাসের গল্পকথকের সঙ্গে। সংক্ষিপ্ত কুশল বিনিময়ের পর বিদায় নেয় শাহীন। খোঁজ নিয়ে সে জানতে পারে, নাদিরা এখন বাদলের স্ত্রী। নাদিরার সাথে যোগাযোগ করে এ ব্যাপারে শাহীন নিশ্চিত হয় যে, তাদের উভয়ের গতিপথ এখন ভিন্নœ। তাছাড়া মেয়ে, সামিয়া ও ছেলে, ইমরানের সঙ্গে কথা বলে এটিও সে বুঝতে পারে যে, নাদিরার প্রতি আর কোনো টান অনুভব না করাটা সবার জন্য মঙ্গলের। যাহোক, দৈনিক ‘সাত সতেরো’য় যোগদান করে বিষণ্ন বিপন্ন ও নিঃসঙ্গ জীবন কাটাচ্ছে শাহীন। খুব ইচ্ছে হলো সুখেন্দুর স্ত্রী মীনা ও তার মেয়ে উর্বশীর সাথে দেখা করার। খোঁজ-খবর নিয়ে জানতে পারে রাজশাহীর দেওয়ানবাজার কিংবা বসুপাড়ায় তাদের দেখা মিলতে পারে। কিন্তু দুই জায়গার কোথাও তাদের দেখা মিলল না উপরন্তু দেওয়ানবাজারে সন্ত্রাসীদের আক্রমণের শিকার হলো সে। পরে রায়হানা নামের এক সংবাদকর্মী ও কয়েকজন মানবাধিকার কর্মীর চেষ্টায় বিপদমুক্ত হয় সে। ধীরে ধীরে রায়হানা ও শাহীনের মধ্যে বন্ধুসুলভ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। রায়হানাও তার নিজ জীবনের সুখ-দুঃখের কথা ভাগাভাগি করে শাহীনের সঙ্গে। হঠাৎ রায়হানার ঠোঁটে শাহীনের চুমু কি তাদের সম্পের্কে চির ধরাবে-এ প্রশ্ন লেখকের, সেইসাথে আমাদেরও। কিন্তু এর উত্তর আমাদের কারো জানা নেই।উপন্যাসের শেষ অংশ, শূন্য পর্বে দেখা যায়, শাহীন দুই মাসের ছুটি নিয়ে রাঙামাটির উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে। যাওয়ার সময় ট্রেনে বসে যা ভাবছে তা লেখকের ভাষায়— ‘ট্রেনের জানালার পাশে বসে ক্লান্ত মাথাটা সিটে ফেলে দিয়ে সে চোখ বন্ধ করল। তার চোখের সামনে একটা সবুজ বন ভেসে উঠল। এবং একটি নির্জন-নিঃসঙ্গ ঘর। সেই ছবিটা দেখতে দেখতে— অনেক দিন পর— তার একটুখানি স্বস্তি ফিরে এল। সে জানল, তার ভেতরের সেই অবাধ্য এবং অস্থির মানুষটিকে সে আজ যাবজ্জীবন কারাবাসের—সলিটারি কনফাইনমেন্টের— দণ্ড দিয়েছে, গতকাল ঘটানো একটা ভয়ানক খুনের অপরাধে।এখন এই অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত সেই মানুষটি কীভাবে করে, সে তা বসে বসে দেখবে।’আর উপন্যাসটি পড়া শেষে আমার কানে বাজছিল শাহীনের সেই উক্তি, যা প্রকারান্তরে ঔপন্যাসিকেরই কথা: ‘জীবনটা একটা কৌতুক। নিষ্ঠুর কৌতুক। এই কৌতুক দুবার শোনাটা অশ্লীল।’শেষান্তে যা না বললেই নয়, সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের উপন্যাস কিংবা ছোটগল্পে কোনো একটি বিশেষ চরিত্রকে সবিশেষ গুরুত্ব দেয়া অনেক ক্ষেত্রেই অসম্ভব বরং স্থান বা সময়ভেদে একটি ডিসকোর্সের সব চরিত্রই জরুরি কিংবা অনিবার্য হয়ে ওঠে। তাঁর ফিকশানে সমাজের নানা শ্রেণিপেশার মানুষ একই মঞ্চে জায়গা করে নেয়, যা উঁচু-নিচুর ব্যবধানকে ঘুচিয়ে দেয়। তাই উত্তরাধুরিকতার পাশাপাশি মার্ক্সসিজমের আঁচও তাঁর ফিকশানে সুস্পষ্ট।***
মূল প্রতিবেদনে যান ↗