নির্বাচনে ব্যবহার বন্ধের পর এবার ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) অধ্যায়ের ইতি টানতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কারণ ইভিএম ব্যবহার না করলেও তা সংরক্ষণে প্রতি মাসে গুনতে হচ্ছে লাখ টাকা। এমন পরিস্থিতিতে আইনি জটিলতা মাথায় রেখে বাকি ইভিএম ধ্বংসের পথে হাঁটছে ইসি। ফলে নানা ধরনের জটিলতা পেরিয়ে দেড় দশকের মাথায় ইভিএমের ইতি ঘটছে।
জানা গেছে, ইভিএম নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করছে। এ ছাড়া অডিট বিভাগ থেকেও নিরীক্ষা করা হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ের তিনটি নির্বাচন নিয়ে পর্যালোচনা চলছে। এই বিষয়গুলো মাথায় রেখেই অধিকাংশ ইভিএম ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। তবে যেসব নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে মামলা রয়েছে, সেই নির্বাচনে ব্যবহৃত ইভিএমগুলো সংরক্ষণ করা হবে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, কমিশন
সভায় ইভিএম আর ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু যন্ত্রগুলো এখনও কমিশনের কাছে রয়ে গেছে। এগুলো নিয়ে কমিশনকে নানা ধরনের জটিলতা মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
ইসি সানাউল্লাহ জানান, ইভিএম নিয়ে গঠিত বিভিন্ন কমিটির বক্তব্য শুনেছে কমিশন। এরপর চূড়ান্ত নিষ্পত্তিসহ আগের কমিটির সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সেই বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কমিশন চায়, যত দ্রুত সম্ভব ইভিএমগুলো নিষ্পত্তি করা হোক। তবে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন সংস্থার তদন্ত এবং অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়ার জন্য যেসব আলামত সংরক্ষণ করা প্রয়োজন, সেগুলো রেখে দেওয়া হবে। এরপর অবশিষ্ট ইভিএমগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সম্প্রতি কমিশন বৈঠকে ভোটযন্ত্রটি ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ জন্য কমিটি গঠন করে দিয়েছে সংস্থাটি। মামলাসংক্রান্ত বিষয় বা আইনি জটিলতা আছে, এমন নির্বাচনে ব্যবহৃত মেশিনগুলো রেখে বাকিগুলো ধ্বংস করার জন্য সিদ্ধান্ত হয়েছে।
২০১০ সালে ইভিএম চালুর পর স্থানীয় নির্বাচনেই তা ব্যবহার হচ্ছিল। এটিএম শামসুল হুদা কমিশন সিটি করপোরেশনে বড় পরিসরে ব্যবহার করেছিল। কিন্তু সংসদ নির্বাচনে নিতে পারেনি। ২০১২ সালে কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন ইসি আগের ইভিএমকে অনেকটা অকেজো অবস্থায় ফেলে গিয়েছিল। তখন সিটি নির্বাচনেও ইভিএম ব্যবহার হোঁচট খায়। এরপর কেএম নূরুল হুদার কমিশন নতুন করে ইভিএম নিয়ে এগোয়। ৩ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে দেড় লাখ ইভিএম কেনার প্রকল্প অনুমোদন পায়। আইন সংশোধন করে ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে ছয়টি সংসদীয় আসনে ইভিএম ব্যবহার করা হয়। এসব যন্ত্রের আয়ুষ্কাল ১০ বছর ধরা হলেও পাঁচ বছরের মাথায় অধিকাংশ ইভিএম অকেজো হয়ে যায়। সেগুলো মেরামতে বড় অঙ্কের অর্থের সংস্থান আর পরে হয়নি। এর মধ্যেও কাজী হাবিবুল আউয়াল কমিশন স্থানীয় সরকারের বেশিরভাগ নির্বাচন আয়োজন করে ইভিএমে। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে অন্তত দেড়শ আসনে ইভিএমে ভোট করার পরিকল্পনা ছিল ইসির। তবে কোভিড পরবর্তী সময়ে আর্থিক সংকটের মধ্যে আরও দুই লাখ নতুন ইভিএম কেনার প্রস্তাবে সরকার সায় দেয়নি। ফলে দ্বাদশ সংসদে ইভিএম ব্যবহারের পরিকল্পনা থেকে কমিশন সরে আসে। এরপর পুরনো ইভিএমের কার্যকারিতা যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ৪০ হাজার যন্ত্র ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বাকি ১ লাখ ১০ হাজার ইভিএম মেরামতের জন্য ১ হাজার ২৬০ কোটি টাকা প্রয়োজন বলে জানায় বিএমটিএফ। সরকার এ অর্থ দিতেও অপারগতা প্রকাশ করায় শেষ পর্যন্ত ব্যালট পেপারেই ভোট গ্রহণ করা হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পরে এএমএম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশন দায়িত্ব নিয়ে আয়োজন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই কমিশন ভোটের আগে দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতে ইভিএম ব্যবহার থেকে সরে আসে। পরে তারা সংসদ নির্বাচন আইন ও বিধিমালা থেকেও এ সংক্রান্ত বিধান তুলে দেয়। সম্প্রতি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইন ও বিধিমালা থেকেও মেশিনটির ব্যবহারের বিধান তুলে দেওয়া হয়। ফলে সকল নির্বাচনেই এই ভোটযন্ত্র ব্যবহারের পথ বন্ধ হয়ে যায়। তাই আইনি প্রক্রিয়ায় মেশিনটি ব্যবহার অযোগ্য করার পর এখন ধ্বংস করে দেওয়ার প্রক্রিয়া হাতে নিচ্ছে ইসি।
জানা গেছে, বর্তমানে ইসির কাছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৪০১টি ইভিএম রয়েছে। ১ হাজার ৫৯৯টির মতো মেশিন খোয়া গেছে। অন্যগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) কাছে রাখা মেশিনগুলোর জন্য ওয়্যারহাউজের ভাড়া ৭০ কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে। মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন গোডাউনে রাখা মেশিনগুলোর জন্য গুনতে হচ্ছে মাসে প্রায় ৩০ লাখ টাকা।
বর্তমানে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরিতে ৮৬ হাজার ২৩৩টি, সিলেট অঞ্চলে ২ হাজার ৬০৭টি, রাজশাহী অঞ্চলে ১৩ হাজার ৫৩০টি, রংপুর অঞ্চলে ৪ হাজার ৪০৫টি, ময়মনসিংহ অঞ্চলে ৬ হাজার ৪২৮টি, চট্টগ্রাম অঞ্চলে ৪ হাজার ১৩৫টি, খুলনা অঞ্চলে ৭ হাজার ১২টি, কুমিল্লা অঞ্চলে ৬ হাজার ৮৭৫টি, ফরিদপুর অঞ্চলে ৩ হাজার ৮৮৫টি, বরিশাল অঞ্চলে ৫ হাজার ৮৭টি এবং ঢাকা অঞ্চলে ৭ হাজার ৪২৯টি ইভিএম রয়েছে। এ ছাড়া নির্বাচন ভবনের বেজমেন্ট এবং দুটি উপজেলা নির্বাচন অফিসে আগুনে ১৫৭টি ইভিএম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে ইসির কাছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৪০১টি ইভিএম রয়েছে।
ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সম্প্রতি ইভিএম নষ্ট করে ফেলার বিষয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে ইসি। চিঠিতে জানতে চাওয়া হয়েছে, নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারসংক্রান্ত কোনো মামলা আছে কিনা। মামলা থাকলে নির্বাচনের নাম, নির্বাচনি এলাকা, নির্বাচনের তারিখ, মামলাসংক্রান্ত বিবরণ, সংশ্লিষ্ট ইভিএমের পরিমাণ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অন্যান্য তথ্য। ইভিএম সংরক্ষণের জন্য গোডাউন বা জায়গা ভাড়াসংক্রান্ত মামলার তথ্য। ইভিএমের জন্য ভাড়া করা গোডাউনের বকেয়া থাকলে, সেসব তথ্য জানাতে বলা হয়েছে।
ইভিএমের ভবিষ্যৎ ব্যবহার সম্পর্কে নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ বলেন, জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হয়নি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও যন্ত্রগুলো ব্যবহার করা হবে না। তবে ইভিএম নিয়ে দুদক একটি বিষয়ে তদন্ত করছে। অডিট বিভাগ থেকেও একটি নিরীক্ষা করা হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ের তিনটি নির্বাচন নিয়ে পর্যালোচনা চলছে। এই বিষয়গুলো মাথায় রেখেই এখন ধ্বংস করা হবে।
