এক জন অন্ধ মানুষ কি স্বপ্ন দেখতে পারেন? নিশ্চয়ই পারেন। আর পারেন বলেই হয়তো এই পৃথিবীতে আজও কিছু অলৌকিক ঘটনা ঘটে। আজও নিয়ম করে সূর্য ওঠে, চাঁদ ওঠে, আলোয় ভরে যায় চরাচর। আর সেই আলোরই এক আশ্চর্য রূপ যেন ধরা দিয়েছে মালদহের এক প্রত্যন্ত গ্রামে দৃষ্টিহীন মুকুন্দ ঘরামীর দুর্গাপুজোয়।
সেই কোন ছেলেবেলায় দুরারোগ্য ব্যাধিতে চোখের আলো চিরকালের মতো হারিয়েছিলেন মুকুন্দ। কিন্তু দৃষ্টিশক্তি হারালেও স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা হারাননি। আজও তাঁর ছোট্ট ঘর আলো করে রয়েছেন দেবী দুর্গা।
মালদহের এক প্রান্তিক গ্রামের কৃষক পরিবারে জন্ম মুকুন্দর। চাষবাস করেই চলত সংসার। তার উপরে দৃষ্টিহীনতা— স্বাভাবিক ভাবেই দারিদ্র্য আরও প্রকট হয়ে উঠেছিল। এক সময়ে সংসারে এমন অবস্থা হয় যে, ‘নুন আনতে পান্তা ফুরোয়’। নিজের অসহায়তায় নিজেই বিড়ম্বিত হতেন মুকুন্দ। আর নিভৃতে দেবীর কাছে কাঁদতেন।
দেবীকে তিনি চোখে দেখতে পান না। তাই মনের চোখেই গড়ে নিয়েছিলেন তাঁর রূপ। বুকের ভিতরে সেই মানসী মূর্তিকে ধারণ করে আকুল হয়ে প্রার্থনা করতেন। ক্ষোভ, দুঃখ, অভিযোগ জানাতেন।
এমন করে ডাকলে দেবীই বা সাড়া না দিয়ে পারেন কী করে? এক দিন স্বপ্নে মুকুন্দ দেখলেন, দশভুজা দেবী দুর্গা তাঁর গৃহে অধিষ্ঠিত হয়ে পুজো নিতে চান।
ঘুম ভেঙে বিস্মিত মুকুন্দ নিজেকেই প্রশ্ন করলেন— কী করে হবে সেই পুজো? তিনি সামান্য এক ঘরামী, তার উপরে দৃষ্টিহীন। সংসারে অভাব নিত্যসঙ্গী। এমন অবস্থায় দুর্গাপুজোর আয়োজন করবেন কী করে?
পরদিন স্বপ্নেই যেন তাঁর প্রশ্নের উত্তর দিলেন দেবী। বললেন, ফুল আর জল দিয়েই তাঁর পুজো করা যাবে।
তার পরে আর পিছনে ফিরে তাকাননি মুকুন্দ ঘরামী। দেবীর নির্দেশ অমান্য করা যায় নাকি!
প্রথম দিকে স্ত্রী ছাড়া পাশে কাউকেই পাননি। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এমন স্বপ্নের কথা বিশ্বাস করানোও সহজ নয়। কিন্তু মানুষের বিশ্বাসে যখন দেবী নিজেই আশ্রয় নেন, তখন পথও বোধহয় নিজেই তৈরি হয়ে যায়।
মুকুন্দর ক্ষেত্রেও তাই হল। একদিন সকালে তাঁর বাড়িতে এসে হাজির হলেন এক শিল্পী। তিনি জানালেন, স্বপ্নে দেবী তাঁকেও দেখা দিয়েছেন। নির্দেশ দিয়েছেন, এই বাড়িতেই তাঁর একটি মূর্তি গড়ে দিতে হবে।
শিল্পী মূর্তি গড়ে দিয়ে চলে গেলেন। সেই মূর্তিতেই পরের প্রায় চল্লিশ বছর ধরে পূজিত হয়েছেন দেবী দুর্গা।
সময়ের সঙ্গে বদলেছে মুকুন্দবাবুর সংসারের পরিস্থিতিও। ছেলেরা ভিনরাজ্যে কাজে যাওয়ায় কিছুটা আর্থিক স্বস্তি এসেছে। বছর পাঁচেক আগে তাই দেবীর জন্য তৈরি হয়েছে একটি স্থায়ী কংক্রিটের মূর্তি।
তবে পুজোর আড়ম্বর বাড়েনি। আজও সেই মূর্তির বেদির সামনে বসে নিষ্ঠাভরে পুজো দেন বৃদ্ধ মুকুন্দ ঘরামী ও তাঁর স্ত্রী। নেই বড় আয়োজন, নেই জাঁকজমক। বিশ্বাসের সলতেয় ভক্তির ঘি দিয়ে সমর্পণের প্রদীপ জ্বালান তিনি। আর সেই সামান্য আয়োজনেই যেন তৃপ্ত হন বরাভয়প্রদায়িনী দেবী।
সেই কারণেই আজও মনে হয় বলা, এক জন অন্ধ মানুষ স্বপ্ন দেখতে পারেন। আর কখনও কখনও সেই স্বপ্নই সত্যি হয়ে আলো করে দেয় গোটা জীবন।
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।
