পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের বলেছেন, দেশের সেচ ব্যবস্থায় ডিজেলের পরিবর্তে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর যে রূপান্তর চলছে, সেটিকে কর্মসূচি হিসেবে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)। মোবাইল সোলার প্যানেল ব্যবহার করে উদ্যোক্তারা সেচ মৌসুমে ডিজেলের বিকল্প হিসেবে সেচ কাজে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবেন। সেচ মৌসুম শেষে একই প্যানেল দিয়ে চাতাল বা কৃষকের গোডাউনে ধান শুকানোর কাজও করা যাবে। এতে অসময়ের বৃষ্টিতে ধান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাজধানীর হোটেল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে বণিক বার্তা আয়োজিত ‘গ্রিন ডায়ালগ: জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস’ শীর্ষক আয়োজনে এসব কথা বলেন তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তনকে শুধু ক্ষয়ক্ষতির বিষয় হিসেবে না দেখে নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে ফজলুল কাদের বলেন, বাংলাদেশের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন কঠোর বাস্তবতা। দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, বন্যা ও অতিবন্যা এবং বরেন্দ্র অঞ্চলসহ বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও মরুময়তা—এ তিন ধরনের প্রভাব দেশের অর্থনীতি ও জীবিকায় নতুন চাহিদা তৈরি করছে। এসব চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে নতুন বাজার ও বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরি করা সম্ভব।
তিনি বলেন, লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে লবণাক্ততা সহনশীল ফসলের চাহিদা বাড়ছে। একই সঙ্গে পানি সাশ্রয়ী কৃষি ব্যবস্থাপনা, ড্রিপ সেচ এবং নতুন ধরনের কৃষিপদ্ধতির প্রয়োজন তৈরি হচ্ছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে শীতলীকরণ ব্যবস্থা, তাপসহনশীল আবাসন ও নির্মাণপ্রযুক্তির চাহিদাও বাড়ছে। এসব খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলার পাশাপাশি নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে তোলা সম্ভব।
জলবায়ু অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলনগুলোর আলোচনা ও বাস্তবতা থেকে মনে হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী দেশগুলো অর্থায়নে অনিচ্ছুক। ফলে আন্তর্জাতিক অনুদানের ওপর নির্ভর করে দেশের জলবায়ু মোকাবেলার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা যথেষ্ট হবে না। গত ১০ থেকে ১২ বছরে পিকেএসএফ প্রায় ১২৫ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করতে পারলেও প্রতিটি প্রকল্প বাস্তবায়নে ছয় থেকে সাত বছর লেগে যায়। তাই শুধু অনুদানের অপেক্ষায় না থেকে বিকল্প অর্থায়ন ও বিনিয়োগের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
এ ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুৎকে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন ফজলুল কাদের। তিনি বলেন, পেট্রোলিয়ামভিত্তিক জ্বালানি সীমিত এবং এর দাম ক্রমাগত বাড়ার প্রবণতা রয়েছে। অন্যদিকে সৌর প্যানেলের দক্ষতা আগের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ বেড়েছে এবং প্যানেল, ইনভার্টার ও লিথিয়াম ব্যাটারির দাম কমেছে। ফলে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে পাকিস্তানের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশটি গত পাঁচ বছরে প্রায় ৫০ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় যুক্ত করতে পেরেছে। এর ফলে তিন থেকে চার বছরে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের পেট্রোলিয়াম আমদানি কমাতে সক্ষম হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে পিকেএসএফের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে ফজলুল কাদের বলেন, বিশ্বব্যাংকের একটি প্রকল্পের আওতায় গ্রামীণ এলাকার আট হাজার ক্ষুদ্র উদ্যোগে মোট ১ দশমিক ৬ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মধ্যেও এসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে গ্রামীণ এলাকায় নতুন ধরনের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা গড়ে উঠছে, যারা মোবাইল প্যানেল ব্যবহার করে বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবেন। সেচের কাজে ডিজেলের বিকল্প হিসেবে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের পাশাপাশি কৃষিপণ্য শুকানোসহ অন্যান্য কাজেও এসব প্যানেল ব্যবহার করা যাবে। ফলে একটি প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে একাধিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে এ ধরনের নতুন অর্থনৈতিক মডেল ও জ্বালানি রূপান্তর ত্বরান্বিত করতে প্রচলিত ব্যাংকনির্ভর অর্থায়ন যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন তিনি। বলেন, ব্যাংক সাধারণত স্বল্পমেয়াদি আমানতের ওপর নির্ভর করে ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। কিন্তু জ্বালানি রূপান্তর ও নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন। এ ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি অর্থের সমন্বয়ে ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্স, ফার্স্ট-লস ফ্যাসিলিটি এবং পেশেন্ট ক্যাপিটাল চালু করা প্রয়োজন। সরকারি অর্থায়নের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং প্রকল্পের প্রাথমিক ঝুঁকি মোকাবেলায় সহায়তা দেয়া।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষয়ক্ষতি কমানোর চিন্তার পাশাপাশি একে অর্থনৈতিক সুযোগ হিসেবেও দেখতে হবে। আবাসন, লজিস্টিকস এবং দেশে সৌর প্যানেল ও ব্যাটারি উৎপাদনের মতো খাতে বড় বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে ধারাবাহিক ও অনুকূল সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি প্রয়োজন, যাতে উদ্যোক্তারা দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগের বিষয়ে আস্থা পান।
সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণে সরকারের অর্থায়ন উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি বলেন, সম্প্রতি সরকার পিকেএসএফ, ইডকল ও বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স ফান্ড লিমিটেডকে (বিআইএফএফএল) সৌরবিদ্যুৎ প্রসারে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এ অর্থ স্বল্প সুদে ঋণ হিসেবে দেওয়া হবে। তবে এ উদ্যোগের সুফল পেতে নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে উদ্যোক্তারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে উৎসাহিত হন।
ফজলুল কাদের বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণ, নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। এসব উদ্যোগ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে জলবায়ু সংকট মোকাবেলার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
