সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যকার চলমান সংঘাত নতুন করে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ সৌদির বিভিন্ন বেসামরিক স্থাপনায় হুথিদের ধারাবাহিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তীব্র নিরাপত্তা সংকট তৈরি হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে। সুদূর সৌদি আরবে এই যুদ্ধ চললেও এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব গভীর সংকটে ফেলেছে বাংলাদেশকে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্ট খাতের তথ্য অনুযায়ী, মূল ৫টি কারণে সৌদি আরবের এই চলমান যুদ্ধের প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের ওপর আঘাত হানছে:
বিজ্ঞাপন
১. প্রবাসীদের প্রাণহানি ও নিরাপত্তার চরম ঝুঁকি
সৌদি আরবে বর্তমানে প্রায় ৩০ লাখের বেশি বাংলাদেশি বসবাস করছেন। সম্প্রতি রিয়াদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের চালানো হামলায় ইতোমধ্যে দুই বাংলাদেশি নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন অনেকে। সৌদির বেসামরিক বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনাগুলোতে হুথিদের হামলার পরিধি বাড়ায় সেখানে কর্মরত বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশির জানমালের নিরাপত্তা এখন চরম ঝুঁকিতে পড়েছে।
২. বিমান চলাচল স্থগিত ও ফ্লাইট বিপর্যয়
সৌদি আরবের আকাশসীমায় ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং বিমানবন্দরে অবতরণ ব্যাহত হওয়ায় ঢাকা–রিয়াদ রুটের নিয়মিত ফ্লাইট চলাচল স্থগিত বা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট বিলম্ব ও বাতিলের ফলে যাত্রীদের শিডিউল বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। আকাশপথে যোগাযোগ বন্ধ বা সীমিত থাকায় দুই দেশের নিয়মিত যাতায়াত ব্যবস্থা কার্যত স্থবির হয়ে পড়ছে।
৩. ভিসার মেয়াদ শেষ ও কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কা
বিমানের টিকিট ও ফ্লাইট অনিশ্চয়তার কারণে সময়মতো সৌদি আরবে ফিরতে পারছেন না ছুটি কাটাতে দেশে আসা হাজার হাজার প্রবাসী। একইভাবে নতুন ভিসা পাওয়া কর্মীরাও যথাসময়ে নিয়োগকর্তার কাছে রিপোর্ট করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে না পারলে অনেকের আকামা ও ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে চাকরি হারানোর প্রবল ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা দেশের শ্রমবাজারে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
৪. রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধাক্কার শঙ্কা
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো সৌদি আরব থেকে আসা রেমিট্যান্স। সর্বশেষ অর্থবছরেও দেশটিতে থাকা প্রবাসীরা প্রায় ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন। তবে বিমানবন্দর ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে যুদ্ধাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে প্রবাসীদের স্বাভাবিক আয়-রোজগার ব্যাহত হবে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক রেমিট্যান্স প্রবাহ ও ডলার মজুতের ওপর।
৫. হজ, ওমরাহ যাত্রী ও ভ্রমণকারীদের বিপর্যয়
প্রতিবছর লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ বাংলাদেশি ওমরাহ ও হজ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে যাতায়াত করেন। বিমানবন্দরগুলো লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা এবং ফ্লাইট অনিশ্চয়তার কারণে ওমরাহ কাফেলা ও সাধারণ যাত্রীদের পুরো পরিকল্পনা ভেঙে পড়ছে। মক্কা ও মদিনা সরাসরি আক্রমণের বাইরে থাকলেও ট্রানজিট বিমানবন্দর হিসেবে রিয়াদ ও জেদ্দার ওপর নির্ভর করতে হওয়ায় যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে মারাত্মক আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের মতে, রিয়াদ ও হুথিদের সংঘাত কেবল সৌদি আরবের নিজস্ব সামরিক বা অভ্যন্তরীণ সংকট নয়; অর্থনৈতিক, মানবিক ও কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি এখন বাংলাদেশের জন্যও এক গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
