ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের দাবিতে বিরোধীদের আন্দোলন নতুন মাত্রা পেয়েছে। ভোটার তালিকায় অনিয়ম ও ভোট চুরির অভিযোগ তুলে সোমবার রাজধানী নয়াদিল্লিতে সুপ্রিমকোর্টের উদ্দেশে পদযাত্রা করেছেন বিরোধী জোট ইন্ডিয়ার নেতারা। একই দিনে সিইসিকে অপসারণের দাবিতে প্রস্তাব পাস করেছে কেরালাম বিধানসভা। অন্যদিকে, দিল্লিতে বিক্ষোভের জন্য দীর্ঘদিনের নির্ধারিত স্থান যন্তর মন্তর বাতিল করে তিনটি নতুন স্থান নির্ধারণ করেছে পুলিশ।
সোমবার দিল্লির কনট প্লেস থেকে মান্ডি হাউস পর্যন্ত এলাকায় বিক্ষোভকারীদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়। ইন্ডিয়া জোটের নেতারা ‘চলো দিল্লি— গণতন্ত্রের জন্য পদযাত্রা’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে কনট প্লেস ও বারাখাম্বা রোডের
সংযোগস্থলের কাছে জড়ো হন। সেখান থেকে তারা সুপ্রিমকোর্টের দিকে যাত্রা শুরু করেন। পদযাত্রায় কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী, কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্র, শিক্ষার্থী সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) সভাপতি নেহা বোরা, কংগ্রেসের কর্ণাটক শাখার নেতা ডিকে শিবকুমারসহ বিরোধী নেতারা অংশ নেন। পরে সমাজবাদী পার্টির সভাপতি অখিলেশ যাদবও তাদের সঙ্গে যোগ দেন।
পদযাত্রার একপর্যায়ে নেতাদের একটি খোলা বাসে দেখা যায়। বাসটি তিলক মার্গ হয়ে সুপ্রিমকোর্টের দিকে এগিয়ে যায়। তবে আদালতে পৌঁছানোর আগেই ভগবান দাস রোডে পুলিশ তাদের আটকে দেয়। ব্যারিকেড টপকে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ধাক্কাধাক্কি হয়। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও ভগবান দাস রোড ও আশপাশের এলাকায় হাজারো বিক্ষোভকারী অবস্থান নেন। জ্যেষ্ঠ নেতারা বাসের ওপর থেকে নেমে এলেও কর্মসূচি চলতে থাকে।
বিক্ষোভ চলাকালে সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্টে একটি আবেদন জমা দেওয়া হয়। রাহুল গান্ধীর আইনি দল আবেদনটি দাখিল করে। এতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় ব্যাপকসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়া এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে। আবেদনকারীদের মধ্যে রয়েছেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, তৃণমূল কংগ্রেসের সৌগত রায়, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব এবং রাষ্ট্রীয় জনতা দলের নেতা তেজস্বী প্রসাদ যাদব।
এর আগে বিরোধী জোটের নেতারা ভারতের প্রধান বিচারপতিকে চিঠি দেন। রাহুল গান্ধী সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া বার্তায় জানান, প্রধান বিচারপতি তাদের আবেদন দাখিল করার নির্দেশ দিয়েছেন। সোমবার ইন্ডিয়া জোটের নেতারা সেই নির্দেশনা অনুসরণ করে সুপ্রিমকোর্টে আবেদন করেন। তাদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে ভোটাধিকার থেকে যোগ্য নাগরিকদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। তারা নির্বাচন কমিশনের প্রধানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং নির্বাচনব্যবস্থায় সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন।
সোমবার কংগ্রেসের সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে সিইসি জ্ঞানেশ কুমারকে উদ্দেশ করে রাহুল গান্ধী বলেন, ‘পদত্যাগ করুন, রাজসাক্ষী হয়ে যান। আপনি ভুল করেছেন, কিন্তু এই ভুলের মূল পরিকল্পনাকারী আপনি নন।’
জ্ঞানেশ কুমার অভিযোগের চাপে রয়েছেন দাবি করে রাহুল বলেন, ‘আমরা জানি, জ্ঞানেশ কুমার রাতে ঘুমাতে পারছেন না। আমি তাকে সরাসরি বলছি, আপনি প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে টিকে থাকতে পারবেন না।’
সোমবারের সমাবেশে রাহুল গান্ধী আরও দাবি করেন, মোদি সরকারের প্রায় ২০০ কর্মকর্তা বিরোধীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, সংবিধান রক্ষার আন্দোলন চলবে। তার ভাষায়, ‘এটি সংবিধান বাঁচানোর লড়াই। এখানে আমরা গুরুত্বপূর্ণ নই।’ দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তরুণেরা পিছু হটবেন না বলেও জানান তিনি।
বিরোধীদের পদযাত্রার দিনই দিল্লি পুলিশ ঘোষণা করে, যন্তর মন্তর আর বিক্ষোভ-সমাবেশের নির্ধারিত স্থান থাকছে না। সোমবার পুলিশ কমিশনার অনুরাগ কুমারের জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নাগরিকদের বিক্ষোভ ও সমাবেশের অধিকার নিশ্চিত করতে বিকল্প স্থান নির্ধারণের জন্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করেছিল। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে যন্তর মন্তরকে নির্ধারিত বিক্ষোভস্থলের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
নতুন তিনটি স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে— মধ্য দিল্লির রামলীলা ময়দান, উত্তর দিল্লির বুরারি ময়দান এবং পূর্ব দিল্লির সিবিডি ময়দান।
অষ্টাদশ শতকের মানমন্দির যন্তর মন্তরের পাশের প্রশস্ত ফুটপাত ও সড়কসংলগ্ন এলাকাটি বহু বছর ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের পরিচিত কেন্দ্র। সেখানে বিক্ষোভের সুযোগ বন্ধের সিদ্ধান্তে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)।
দলটির মুখপাত্র সৌরভ দাস এক্সে দেওয়া বার্তায় বলেন, ‘এটি অগ্রহণযোগ্য। নরেন্দ্র মোদি যন্তর মন্তরকে ভয় পাচ্ছেন কেন? যন্তর মন্তর ভারতের জনগণের। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কি দেশের মানুষের সঙ্গে পরামর্শ করেছে? কোনো পক্ষ বা সংগঠনের মতামত নেওয়া হয়েছে?’
সিজেপির নেতা আশুতোষ রাঙ্কা সোমবার দিল্লি পুলিশকে ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা দিয়ে বলেন, এই সময়ের মধ্যে যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের দিন ও সময় নির্ধারণ না করা হলে দলটি নতুন করে আন্দোলনের ডাক দেবে।
এর আগে শনিবার যন্তর মন্তরে পৌঁছানোর চেষ্টা করা বিক্ষোভকারীদের বাধা দেয় পুলিশ। ওই দিন দিল্লির বিভিন্ন স্থানে হাজারো মানুষকে আটক করা হয়। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং দলের জ্যেষ্ঠ নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে আটকের পর দলের পক্ষ থেকে নতুন কর্মসূচির কথা জানানো হয়।
বিরোধীদের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সোমবার দিল্লি মেট্রোর ছয়টি স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বিকেল ৪টা পর্যন্ত বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়। স্টেশনগুলো হলো জনপথ, মান্ডি হাউস, বারাখাম্বা রোড, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট, রাজীব চক ও প্যাটেল চক। কংগ্রেসের বিক্ষোভের আগে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার অংশ হিসেবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে দিল্লি মেট্রো রেল করপোরেশন (ডিএমআরসি) জানায়, স্টেশনগুলোতে এক লাইন থেকে অন্য লাইনে যাতায়াতের ব্যবস্থা চালু থাকবে। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পরবর্তী নির্দেশনা দেওয়া হবে বলেও জানানো হয়।
এদিকে, সোমবার বিজেপির মুখপাত্র অনুরাগ ঠাকুর সংবাদ সম্মেলনে রাহুল গান্ধী ও বিরোধী নেতাদের সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, বিরোধীরা নিয়ম ও আইন বোঝেন না। তার ভাষায়, ‘তারা শুধু বিশৃঙ্খলা ও অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে, সাংবিধানিক পদ ও প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করতে, বিশ্বে ভারতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে এবং দেশের মর্যাদা কমাতে জানেন। এমন অস্থিতিশীল, বিশৃঙ্খল ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বিরোধীদলীয় নেতার নাটকীয়তা ও খামখেয়ালিপনা দেশকে দেখতে হচ্ছে— এটি দুর্ভাগ্যজনক।’
দিল্লিতে বিরোধীদের পদযাত্রা ও সুপ্রিমকোর্টে আবেদন দাখিলের দিনই সিইসি জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের দাবিতে প্রস্তাব পাস করেছে কেরালাম বিধানসভা। সোমবার মুখ্যমন্ত্রী ভি ডি সতীশন বিধানসভার কার্যপ্রণালির ১১৮ নম্বর বিধির অধীনে প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। এতে কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ায় কথিত অনিয়মের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া, সিইসিকে অপসারণের প্রক্রিয়া শুরু করা এবং নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিটির সংস্কারের আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রস্তাবটি পাস হওয়ার পর সতীশন বলেন, ‘প্রথমবারের মতো কেরালাম বিধানসভা প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের দাবি জানিয়ে প্রস্তাব পাস করেছে।’ তিনি এটিকে গণতন্ত্র ও সংবিধানপ্রদত্ত ভোটাধিকার রক্ষার ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেন।
প্রস্তাব উত্থাপনের পর চার বিধায়ক খসড়ায় সংশোধনীর প্রস্তাব দেন। তাদের মধ্যে ছিলেন বিজেপির বি গোপকুমার ও ভি মুরলীধরন এবং সিপিআইএমের সাজি চেরিয়ান ও এম বিজিন। মুখ্যমন্ত্রী তাদের সংশোধনী প্রস্তাবগুলো প্রত্যাখ্যান করেন। তবে বিরোধীদলীয় নেতা পিনারাই বিজয়ন ‘লাখ লাখ ভোটার’-এর পরিবর্তে ‘কোটি কোটি ভোটার’ শব্দবন্ধ ব্যবহারের প্রস্তাব দিলে সতীশন তা গ্রহণ করেন। বিজেপির তিন বিধায়ক প্রস্তাবটির বিরোধিতা করেন।
