এ কোলাহল সে কোলাহল নয়। নিঃশব্দে কেবল মাথার ভিতরে চলতে থাকে। খাবারের চিন্তা মাথা ছেড়ে যেতে চায় না। কিন্তু সেখানে খিদের কোনও ভূমিকাই নেই। আর সেই কোলাহলকেই সমাজমাধ্যমে ‘ফুড নয়েজ়’ বলা হচ্ছে। খাবার নিয়ে মনের মধ্যে বার বার চিন্তা ঘুরপাক খাওয়া, খিদে না পেলেও কিছু খেতে ইচ্ছা করা বা পেট ভরে যাওয়ার পরেও মুখরোচক খাবারের প্রতি আকৃষ্ট হওয়াকে এই শব্দবন্ধ দিয়ে বোঝানো হয়। এটি কোনও স্বতন্ত্র রোগের নাম নয়। তবে খাবার নিয়ে এই ক্রমাগত ভাবনা অনেকের যাপন ও খাদ্যাভ্যাসকে প্রভাবিত করতে পারে।
ধরা যাক, দুপুরে পেট ভরে ভাত খেয়েছেন। অথচ কিছুক্ষণ পরেই চোখ চলে যাচ্ছে বিস্কুটের কৌটোয়। রাতে খাওয়াদাওয়া সেরে সোফায় বসেছেন, হঠাৎ মনে হল মিষ্টি খেতে ইচ্ছা করছে। পেট খালি নয়, তবু মুখ চালানোর তাগিদ যেন কিছুতেই থামছে না! এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই হয়। কিন্তু এর নেপথ্যে কারণ কী?
কেন হয় এই ‘ফু়ড নয়েজ়’?
১. শরীরের খিদে ও মনের খিদে এক নয়: শরীরের শক্তির প্রয়োজন হলে খিদে পায়। কিন্তু খাবারের প্রতি আকর্ষণ সবসময়ে শরীরের প্রয়োজন থেকে আসে না। পছন্দের খাবারের গন্ধ, ছবি, বিজ্ঞাপন বা অন্য কাউকে খেতে দেখলেও খাবারের ইচ্ছা জাগতে পারে। অর্থাৎ পেট ভরে গেলেও মস্তিষ্ক সুস্বাদু খাবারের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে। এই কারণেই ভরপেট খাওয়ার পরেও চকোলেট, আইসক্রিম বা পছন্দের কোনও মুখরোচক খাবার খেতে ইচ্ছা করে। শরীরের খিদে মিটে গেলেও খাবারের থেকে আনন্দ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে যেতে পারে।
২. মানসিক চাপেও বাড়ে আকর্ষণ: কাজের চাপ, উদ্বেগ, একঘেয়েমি বা মন খারাপের সময়ে অনেকেই খাবারের মধ্যে সাময়িক স্বস্তি খোঁজেন। বিশেষ করে মিষ্টি বা ফ্যাটে ভর্তি খাবার খেলে আনন্দ হয়। ফলে ধীরে ধীরে মানসিক অস্বস্তির সঙ্গে খাবার খাওয়ার একটি যোগ তৈরি হয়। এ ক্ষেত্রে খাওয়ার তাগিদ সবসময়ে পেটের খিদের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। কখনও মন ভাল করার চেষ্টা থেকেই বার বার খেতে ইচ্ছা করে।
৩. খাবারের ধরনও গুরুত্বপূর্ণ: চিনি, নুন ও ফ্যাট বেশি রয়েছে, এমন অনেক মুখরোচক খাবার বার বার খেতে ইচ্ছা করতে পারে। মস্তিষ্ক মনে করে, সে পুরস্কৃত হচ্ছে। ফলে আনন্দ বাড়তে থাকে। পেট ভরে যাওয়ার পরেও সেই স্বাদ আবার পাওয়ার ইচ্ছা হতে পারে।
৪. ঘুমের অভাব: পর্যাপ্ত ঘুম না হলে খিদে ও পেট ভরার সঙ্কেত সঠিক ভাবে পাওয়া যায় না। এগুলি নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের স্বাভাবিক কাজকর্মে পরিবর্তন আসতে পারে। এর ফলে পরের দিন বেশি খিদে পাওয়া বা ক্যালোরি-সমৃদ্ধ খাবারের প্রতি আকর্ষণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
৫. অনিয়মিত খাওয়াদাওয়া: দিনের বেলায় দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকা বা প্রয়োজনের তুলনায় কম খাবার খাওয়ার পর সন্ধ্যায় তীব্র খিদে পেতে পারে। সেই সময়ে বার বার কিছু খেতে ইচ্ছা হতে পারে। তখন বুঝতে হবে, দেহ সঠিক পরিমাণে পুষ্টি পায়নি। তাই খিদে চাগা়ড় দিতে পারে বেলা গড়ালে।
সমস্যা থেকে মুক্তি পাবেন কী ভাবে?
১. খিদে পাচ্ছে, নাকি অন্য কারণে খেতে ইচ্ছা করছে, সেটা বুঝতে হবে। খাওয়ার ইচ্ছা জাগলে নিজেকে প্রশ্ন করুন, শেষ কখন খেয়েছেন? পেটে সত্যিই খিদে আছে না কি একঘেয়েমি, উদ্বেগ কিংবা ক্লান্তি থেকে কিছু খেতে ইচ্ছা করছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেলে নিজের অভ্যাস সম্পর্কে সচেতন হওয়া যায়। তবে সত্যিই খিদে পেলে খাবার এড়িয়ে যাওয়াটা আবার ঠিক নয়।
২. খাওয়ার সময়ে খাবারেই মন দিন। টেলিভিশন দেখতে দেখতে অথবা ফোন ঘাঁটতে ঘাঁটতে খেলে কতটা খাচ্ছেন, তা খেয়াল না-ও থাকতে পারে। তাই সম্ভব হলে ধীরে খান, খাবারের স্বাদ ও গন্ধ অনুভব করুন এবং পেট ভরার সঙ্কেতের দিকে মন দিন।
৩. খাবার বাদ দেবেন না। অনেকেই ওজন কমানোর তাড়নায় দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকেন বা ডায়েটে অতিরিক্ত কড়াকড়ি রাখেন। অনেকের ক্ষেত্রে পরে তীব্র খিদে ও খাবারের প্রতি আকর্ষণ বাড়িয়ে দিতে পারে এই অভ্যাস। দিনের বিভিন্ন সময়ে প্রয়োজনমতো সুষম খাবার খান। খাবারে প্রোটিন, ফাইবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি রাখার চেষ্টা করুন।
৪. মানসিক চাপের অন্য সমাধান খুঁজুন। মন খারাপ হলেই খাবারের দিকে হাত বাড়ানো বন্ধ করুন। অল্প হাঁটাচলা, পছন্দের গান শোনা, বন্ধুর সঙ্গে কথা বলা বা কয়েক মিনিট বিশ্রাম নেওয়া যেতে পারে। তবে খাবার খাওয়াকে অপরাধ বলে ভাবারও প্রয়োজন নেই।
