বারবার ফোন দেখার অভ্যাস থেকে আজকাল বেরিয়ে আসতে চান অনেকেই। কিন্তু স্মার্টফোন ছাড়া চলার কথা ভাবতেই নানা প্রশ্ন মাথায় আসে। কোথাও যেতে হলে পথ দেখাবে কে? কনসার্টের টিকিট বুক করবেন কীভাবে? অথবা রেস্তোরাঁয় বিল মেটানোর সময় কিউআর কোড স্ক্যানই বা করবেন কীভাবে।
সারাক্ষণ ফোনে টুংটাং শব্দ। কখনো মেসেজ, কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নোটিফিকেশন। একবার ফোন হাতে নিলে কখন যে সময় পেরিয়ে যায়, টেরই পাওয়া যায় না। অথচ কাজের তালিকায় তখনো কত কিছু বাকি! এভাবে দিনের কতটা সময় যে ফোনের পেছনে চলে যায়, তা কি কখনো খেয়াল করেছেন?
বারবার ফোন দেখার অভ্যাস থেকে আজকাল বেরিয়ে আসতে চান অনেকেই। কিন্তু স্মার্টফোন ছাড়া চলার কথা ভাবতেই নানা প্রশ্ন মাথায় আসে। কোথাও যেতে হলে পথ দেখাবে কে? কনসার্টের টিকিট বুক করবেন কীভাবে? অথবা রেস্তোরাঁয় বিল মেটানোর সময় কিউআর কোড স্ক্যানই বা করবেন কীভাবে।
তবে স্মার্টফোন ছাড়া জীবন যে একেবারে অচল, তা কিন্তু নয়। বরং ফোনের ব্যবহার কমিয়ে সাধারণ একটি ফ্লিপ ফোন বা বাটন ফোনে ফিরে গেলে জীবনে কিছু ভালো পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের শিল্পী অগাস্ট ল্যাম। প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার কমানোর পক্ষে কাজ করেছেন এ শিল্পী।
নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি লিখেছেন ‘ইউ ডোন্ট নিড আ স্মার্টফোন: আ প্র্যাকটিক্যাল গাইড টু ডাউনগ্রেডিং ইয়োর ফোন অ্যান্ড আপগ্রেডিং ইয়োর লাইফ’ বইটি। বইটিতে স্মার্টফোনের ব্যবহার কমানোর কারণ, এর সম্ভাব্য উপকারিতা এবং কীভাবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেয়া যায়, তা তুলে ধরেছেন তিনি।
ল্যাম নিজেই একসময় বুঝতে পারেন, ফোনের প্রতি তার আসক্তি তৈরি হয়েছে। শিল্পচর্চার চেয়ে পর্দার দিকে তাকিয়েই বেশি সময় কাটছে। তাই ২০২২ সালে, প্রায় ২৭ বছর বয়সে তিনি স্মার্টফোন ছেড়ে দেন।
সম্প্রতি সিএনএনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে স্মার্টফোন ছেড়ে দেয়ার পর নিজের জীবনে আসা পরিবর্তনগুলো নিয়ে কথা বলেছেন ল্যাম।
অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর হয়
স্মার্টফোন ছেড়ে দেয়ার আগে ল্যামের ভয় ছিল, পরিচিত মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়তো কমে যেতে পারে। নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগও হয়তো কমবে। কারণ, বিভিন্ন অনুষ্ঠান বা আয়োজনের খবর জানতে তিনি আর অনলাইনের ওপর নির্ভর করতে পারবেন না।
কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। তার নতুন বন্ধু বেড়েছে, পুরনো বন্ধুত্বও হয়েছে আরো মজবুত।
ল্যামের মতে, কারো সঙ্গে সময় কাটানোর সময় ফোনের দিকে মন না দিলে সেই মানুষটির প্রতি পুরো মনোযোগ দেয়া যায়। আবার একা থাকলেও ফোনে ডুবে না থেকে নিজের মতো সময় কাটানো সম্ভব হয়।
স্মার্টফোন হাতে থাকলে অনেক সময় অন্যদের সঙ্গে বসেও আমরা নিজেদের গুটিয়ে রাখি। আবার একা থাকার সময়ও ফোনের মাধ্যমে অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগে ব্যস্ত থাকি। এতে একা থাকা আর মানুষের সঙ্গে সময় কাটানোর স্বাভাবিক ছন্দটাই বদলে যায়।
ফোন ছাড়ার পর ল্যাম নিজের সময় ও মনোযোগকে আরো গুছিয়ে নিতে পেরেছেন বলে জানান।
এছাড়া বন্ধুত্বের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। বন্ধুরা কোথাও বেড়াতে গেলে বা জীবনে নতুন কিছু ঘটলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিলেই আর তার কাছে খবর পৌঁছায় না। তাকে ফোন করে কিংবা সরাসরি কথা বলে খবর জানাতে হয়।
শুরুতে এতে অভ্যস্ত হতে সময় লাগলেও পরে বিষয়টি ভালো লাগতে শুরু করে। কারণ, কোনো খবর সবার সামনে পোস্ট করার বদলে নির্দিষ্ট কাউকে জানানো এবং তার প্রতিক্রিয়া শোনার সুযোগ তৈরি হয়।
নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয়ের ক্ষেত্রেও ল্যাম বদল এনেছেন। আগে পরিচয়ের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একে অন্যকে অনুসরণ করার কথা বলতেন। এখন বরং সরাসরি পরের সপ্তাহে দেখা করার পরিকল্পনা করেন কিংবা নিজের কোনো আয়োজনের কথা জানান। ফলে পরে যোগাযোগ করার কথা ভেবে বসে থাকতে হয় না।
মন খারাপ হলেই ফোন হাতে নেয়ার অভ্যাস কমে
মন খারাপ, দুশ্চিন্তা কিংবা অস্বস্তি হলে অনেকেই ফোন হাতে তুলে নেন। কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোরাঘুরি, কখনো ভিডিও দেখা—কিছুক্ষণের জন্য হলেও মন অন্যদিকে সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা চলে।
ল্যামের ভাষায়, স্মার্টফোন ছাড়ার শুরুর দিকে মনে হয় যেন খাঁচায় আটকে পড়েছেন। এত দিন যেসব অনুভূতি থেকে ফোনের সাহায্যে মন সরিয়ে রাখতেন, সেগুলোর মুখোমুখি হতে হয় নতুন করে।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিকল্প কিছু অভ্যাস গড়ে তোলেন। মানসিক চাপ বাড়লে বন্ধুকে ফোন করেন, বই পড়েন, হাঁটতে বের হন কিংবা গান শোনেন। অর্থাৎ, অস্বস্তি ভুলে থাকতে ফোনের ওপর নির্ভর না করে অন্যভাবে নিজেকে সামলাতে শেখেন।
আরেকটি পরিবর্তনও লক্ষ করেছেন তিনি। আগে কোনো অস্বস্তিকর অনুভূতি এলেই তা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেন। এখন সেই অনুভূতি এলে সেটিকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারেন। নিজের আবেগের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠায় সেগুলো আর আগের মতো অস্বস্তিকর মনে হয় না।
নিজের জন্য পাওয়া যায় বাড়তি সময়
স্মার্টফোন আমাদের অনেক কাজ সহজ করে দিয়েছে। অনলাইনে বিল দেয়া, পথ খুঁজে নেয়া কিংবা টিকিট কাটা—কয়েকটি টাচে সবই করা সম্ভব হয়। তাই ফোন ছাড়া জীবনকে অনেকের কাছে সময়সাপেক্ষ ও ঝামেলার মনে হতে পারে।
কিন্তু ল্যামের অভিজ্ঞতা বলছে, ফোনের পেছনে যে সময় ব্যয় হয়, তা হিসাব করলে চিত্রটা অন্য রকম হতে পারে।
ধরা যাক, কেউ দিনে পাঁচ ঘণ্টা ফোনে স্ক্রল করেন। সেই সময়টুকু যদি ফোনের বাইরে কাটানো যায়, তাহলে বিদ্যুৎ বা অন্য কোনো পরিষেবার বিল দিতে ফোন করার কিংবা বাসের টিকিট ছাপিয়ে নিতে অথবা লাইব্রেরিতে যাওয়ার মতো কাজে কিছুটা বাড়তি সময় লাগলেও দিনের বড় অংশ হাতে থেকে যায়।
এসব কাজ করতে বাইরে যেতে হয়, মানুষের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ তৈরি হয়, হাঁটাচলাও হয়। ফলে সামান্য অসুবিধার পাশাপাশি কিছু বাড়তি সুবিধাও পাওয়া যায়।
ল্যামের মতে, ফোনে সময় নষ্ট হওয়ার বিষয়টি সব সময় একটানা স্ক্রল করার মতো স্পষ্ট নয়। কখনো একটি মেসেজের উত্তর দিতে গিয়ে ফোন খোলা হয়, তারপর খবরের শিরোনামে চোখ বুলানো হয়। আবার কিছুক্ষণ পর অন্য কোনো নোটিফিকেশন দেখতে ফোন হাতে নেয়া হয়। এভাবে দিনে বহুবার অল্প অল্প সময় ব্যয় হতে হতে মোট সময়টা অনেক বেড়ে যায়।
ফোনের এসব টান কমে যাওয়ায় এখন ব্যস্ত দিনেও নিজের জন্য বেশ কিছুটা সময় পান ল্যাম। কাজের চাপ থাকলেও আগের মতো সব সময় তাড়াহুড়া কিংবা অস্থিরতা অনুভব করেন না বলে জানান তিনি।
নিজের স্মৃতিশক্তি ও পথ চেনার ক্ষমতার ওপর ভরসা বাড়ে
কোথাও যাওয়ার আগে গুগল ম্যাপ খুলে পথ দেখে নেয়া এখন অনেকেরই অভ্যাস। কোনো তথ্য মনে রাখার বদলে ফোনে খুঁজে নেয়াও সহজ। কিন্তু সবকিছুর জন্য ফোনের ওপর নির্ভর করতে করতে নিজের মনে রাখার ক্ষমতা কিংবা পথ চেনার দক্ষতার ওপর ভরসা কমে যেতে পারে।
ল্যামের মতে, স্মার্টফোন ছেড়ে দিলে এসব দক্ষতা আবার স্বাভাবিকভাবেই কাজে লাগতে শুরু করে। নতুন করে আলাদা কোনো প্রশিক্ষণ নিতে হয় না।
মানুষের মনে রাখার এবং আশপাশের জায়গা চিনে নেয়ার স্বাভাবিক ক্ষমতা রয়েছে। টিকে থাকার প্রয়োজনে এই দক্ষতাগুলো মানুষের মধ্যে গড়ে উঠেছে। একসময় তথ্য জমা রাখার জন্য আমাদের হাতে স্মার্টফোন তো দূরের কথা, কলম-কাগজও ছিল না। তবু মানুষ মনে রেখেছে, শিখেছে এবং নিজের পথ খুঁজে নিয়েছে।
স্মার্টফোন ছেড়ে দেয়ার পর নিজের মানসিক সক্ষমতা দেখে অবাক হয়েছেন ল্যাম। তার সঙ্গে কথা বলা অন্য যারা স্মার্টফোন ছেড়েছেন, তাদের মধ্যেও একই ধরনের অভিজ্ঞতা দেখেছেন বলে জানান তিনি।
ফোন থেকে মন সরিয়ে চারপাশে মনোযোগ
কারো সঙ্গে কথা বলছেন, অথচ মনে হচ্ছে কখন ফোনটা আবার হাতে নেয়া প্রয়োজন। কোথাও বসে আছেন, কিন্তু মন পড়ে আছে নতুন কোনো মেসেজ এসেছে কি না, তা দেখার অপেক্ষায়। এমন অভিজ্ঞতা পরিচিত হলে বুঝতে হবে, ফোন শুধু সময়ই নিচ্ছে না, মনোযোগও ভাগ করে নিচ্ছে।
ল্যাম বলেন, স্মার্টফোন ব্যবহার করার সময় তারও এমন হতো। কারো সঙ্গে কথা বলতে বলতে ভাবতেন, কখন আবার ফোন দেখবেন। মনে হতো, অন্য কিছু একটা অপেক্ষা করছে, তাই বর্তমান মুহূর্তে পুরোপুরি থাকা যাচ্ছে না।
তিনি বিষয়টিকে এমন একটি পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করেছেন, যখন প্রতিবেশী কথা বলতে এলেন, অথচ আপনার চুলায় রান্না বসানো। প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগছে, কিন্তু মনে হচ্ছে, রান্নার দিকে খেয়াল রাখতে হবে। ফলে কথোপকথনে পুরো মনোযোগ দেয়া যাচ্ছে না।
ল্যামের মতে, মনোযোগ বারবার অন্যদিকে চলে গেলে বর্তমান মুহূর্তে থাকা কঠিন হয়। বর্তমানকে উপভোগ করার অর্থ হলো, এই মুহূর্তটিকে অন্য সময়ের সঙ্গে তুলনা না করা, একে অন্য কিছু দিয়ে প্রতিস্থাপনের তাড়া অনুভব না করা কিংবা সময় নষ্ট হচ্ছে ভেবে অস্থির না হওয়া।
এক মাস চেষ্টা করেই দেখুন
স্মার্টফোন ছাড়া জীবন কেমন হবে, তা নিয়ে অনেকেরই সংশয় রয়েছে। প্রয়োজনীয় কাজ আটকে যাবে, যোগাযোগ কমে যাবে কিংবা দৈনন্দিন জীবন আরো কঠিন হয়ে পড়বে—এমন আশঙ্কাও অমূলক নয়। বিশেষ করে যেসব কাজের জন্য নির্দিষ্ট অ্যাপ দরকার, সেগুলোর বিকল্প আগে থেকে ভেবে নেয়া জরুরি।
তবে ল্যামের পরামর্শ, চেষ্টা না করেই স্মার্টফোন ছাড়া চলবে না বলে ধরে নেয়ার দরকার নেই। বরং এক মাস স্মার্টফোন ব্যবহার না করে দেখুন। মাস শেষে নিজের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিন, এই পরিবর্তন আপনার জন্য কতটা কার্যকর।
যাদের রক্তে শর্করার মাত্রা পর্যবেক্ষণের মতো চিকিৎসাসংক্রান্ত কাজে স্মার্টফোনের অ্যাপ ব্যবহার করতে হয়, তাদের জন্যও বিকল্প ভাবার সুযোগ রয়েছে। ল্যামের পরামর্শ, দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য ফিচার ফোন রেখে স্মার্টফোনটি শুধু চিকিৎসার প্রয়োজনে ব্যবহার করা যেতে পারে।
সবাইকে যে স্মার্টফোন ছেড়ে দিতে হবে, এমন নয়। তবে ফোনের নোটিফিকেশন, বারবার স্ক্রল করার অভ্যাস কিংবা অনলাইনে পড়ে থাকার কারণে যদি নিজের সময় ও মনোযোগ কমে যায়, তাহলে ব্যবহার কমানোর চেষ্টা করা যেতে পারে।
