যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বাণিজ্য বিরোধের কারণে চীন এখন রফতানির জন্য আরো বিস্তৃত বাজারের ওপর নির্ভর করছে।
যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রফতানি কমলেও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপের বাজারে বিক্রি বাড়িয়ে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে চীন। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেলেও বেড়েছে দেশটির মোট রফতানি। চলতি বছর যন্ত্রপাতি, চিপ ও বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির (ইভি) রফতানিও প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বাণিজ্য বিরোধের কারণে চীন এখন রফতানির জন্য আরো বিস্তৃত বাজারের ওপর নির্ভর করছে। এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ান ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। পাশাপাশি আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গেও বাড়ছে বাণিজ্য।
আনাদোলু এজেন্সির এক বিশ্লেষণে চীনের শুল্ক বিভাগের তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৫ সালে চীনের রফতানি আগের বছরের তুলনায় ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ কমে প্রায় ৩ লাখ ১ হাজার কোটি ইউয়ানে নেমে আসে। ডলারের হিসাবে এর পরিমাণ প্রায় ৪২০ বিলিয়ন বা ৪২ হাজার কোটি ডলার। তবে একই সময়ে চীনের মোট রফতানি ৬ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৩ দশমিক ৭৭ ট্রিলিয়ন বা ৩ লাখ ৭৭ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছায়। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিক্রি কমলেও অন্যান্য দেশে রফতানি বাড়িয়ে সে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পেরেছে চীন।
আসিয়ান ও ইউরোপের বাজারে প্রবৃদ্ধি
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রফতানি কমার প্রভাব সামাল দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপ। ২০২৫ সালে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোয় চীনের রফতানি ১৪ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৬৬ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে পৌঁছায়। অন্যদিকে ইইউতে রফতানি ৯ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫৬ হাজার কোটি ডলারে।
শুল্ক বিভাগের পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে করা হিসাব অনুযায়ী, এ বাজার দুটিতে রফতানি বাড়ায় চীনের অতিরিক্ত আয় হয়েছে প্রায় ১২ হাজার ৮০০ কোটি ডলার। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রফতানি কমে যাওয়ায় ক্ষতি হয়েছে আনুমানিক ১০ হাজার ২০০ কোটি ডলার। অর্থাৎ আসিয়ান ও ইইউতে প্রবৃদ্ধির পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি হ্রাসের ক্ষতির তুলনায় প্রায় এক-চতুর্থাংশ বেশি।
এর মধ্যে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোয় রফতানি থেকে অতিরিক্ত আয় হয়েছে প্রায় ৮ হাজার ২০০ কোটি ডলার। ইইউর বাজার থেকে এসেছে আরো ৪ হাজার ৬০০ কোটি ডলার।
এর অর্থ এ নয় যে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের জন্য তৈরি পণ্য অন্য বাজারে পাঠানো হয়েছে। বরং চীনের রফতানি খাতের সামগ্রিক চিত্র বলছে, অন্যান্য বাজারে চাহিদা বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি কমে যাওয়ার প্রভাব কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে।
২০২৫ সালে আসিয়ান ও ইইউ মিলিয়ে চীন থেকে প্রায় ১ দশমিক ২৩ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ ২৩ হাজার কোটি ডলারের পণ্য কিনেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেনা পণ্যের মূল্যের তুলনায় এ পরিমাণ প্রায় তিন গুণ। চীনের মোট রফতানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ গেছে এ দুই বাজারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ছিল প্রায় এক-নবমাংশ।
এছাড়া অন্যান্য অঞ্চলেও বাণিজ্য বাড়িয়েছে চীন। ২০২৫ সালে আফ্রিকার সঙ্গে দেশটির মোট বাণিজ্য বেড়েছে ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ। লাতিন আমেরিকার সঙ্গে বেড়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এসব হিসাবের মধ্যে রফতানি ও আমদানি দুটিই অন্তর্ভুক্ত।
চীনের সাধারণ শুল্ক প্রশাসনের তথ্যানুযায়ী, ওই বছর ১৯০টির বেশি দেশ ও অঞ্চলের সঙ্গে দেশটির বাণিজ্য বেড়েছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ৬ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে পৌঁছেছে প্রায় ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন বা ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলারে। চীনের মোট পণ্যবাণিজ্যের অর্ধেকের কিছু বেশি এ দেশগুলোর সঙ্গে যুক্ত। তবে এসব অঞ্চলের মধ্যে কিছু দেশ একাধিক গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। ফলে তাদের বাণিজ্যের পরিমাণ যোগ করে আলাদা মোট হিসাব করা যাবে না। তবু এসব তথ্য চীনের বিস্তৃত বাণিজ্য নেটওয়ার্কের চিত্র তুলে ধরে।
চিপ ও ইভি রফতানি বাড়ছে
২০২৬ সালেও চীনের রফতানি প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক পণ্য, চিপ, ইভি ও ব্যাটারির বিক্রি।
চীনের প্রকাশিত বাণিজ্য পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) দেশটির রফতানি বেড়েছে ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ। ডলারে রূপান্তরিত হিসাবে এর পরিমাণ প্রায় ৩ দশমিক ৪৫ ট্রিলিয়ন বা ৩ লাখ ৪৫ হাজার কোটি ডলার।
চীনের মোট রফতানির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই যান্ত্রিক ও বৈদ্যুতিক পণ্য। জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, এ ধরনের পণ্যের রফতানি বেড়েছে ২৩ দশমিক ৭ শতাংশ, যা সামগ্রিক রফতানি প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি।
একই সময়ে চিপের রফতানি বেড়েছে ৯৯ দশমিক ১ শতাংশ। ইভি রফতানি বেড়েছে ৭২ দশমিক ৩ ও লিথিয়াম ব্যাটারির রফতানি বেড়েছে ৩৬ দশমিক ৪ শতাংশ।
শুল্ক বিভাগের তথ্যানুযায়ী, রফতানি বৃদ্ধির প্রায় ৯০ শতাংশ এসেছে সরঞ্জাম উৎপাদন খাত থেকে। এছাড়া চীনের রফতানির অর্ধেকের বেশি হলো বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, কাঁচামাল ও অন্যান্য উপকরণ, যা বিদেশের কারখানাগুলোয় পণ্য তৈরিতে ব্যবহার হয়। অর্থাৎ চীন শুধু ভোক্তাদের জন্য তৈরি পণ্যই সরবরাহ করছে না, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উৎপাদন শিল্পের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারও গুরুত্বপূর্ণ
অন্যান্য বাজারে বিক্রি বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ করেনি চীন। ২০২৬ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির মোট বাণিজ্যও বেড়েছে।
এ সময়ে আসিয়ানের সঙ্গে চীনের মোট বাণিজ্য ২২ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে প্রায় ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ ২ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছে। ইইউর সঙ্গে বাণিজ্য বেড়েছে ৮ দশমিক ৪ শতাংশ, যার পরিমাণ প্রায় ৭১১ বিলিয়ন বা ৭১ হাজার ১০০ কোটি ডলার। আর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ৪ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৪৭ হাজার ৩০০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। এসব হিসাবের মধ্যে আমদানি ও রফতানি উভয়ই রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য বিরোধ শুরু হয় ২০১৮ সালে। সে সময় ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসন চীনা পণ্যে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে। মেধাস্বত্ব নিয়ে উদ্বেগ এবং মার্কিন কোম্পানিগুলোর ওপর প্রযুক্তি হস্তান্তরের চাপের অভিযোগ ছিল এর পেছনে।
২০২৫ সালের এপ্রিলে দুই দেশ পাল্টাপাল্টি শুল্ক বাড়ালে বিরোধ আরো তীব্র হয়। পরের মাসে জেনেভায় আলোচনার পর কিছু অতিরিক্ত শুল্ক প্রত্যাহার ও অন্যকিছু শুল্ক সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়। তবে সব শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়নি।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজার চীনের জন্য এখনো গুরুত্বপূর্ণ। তবে আসিয়ান ও ইউরোপে বিক্রি বৃদ্ধি এবং চিপ, যন্ত্রপাতি ও বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির রফতানি সম্প্রসারণের ফলে চীনের বাণিজ্য প্রবৃদ্ধি এখন আর একটি বাজারের ওপর নির্ভরশীল নয়।
