রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ সচিবালয় স্থানান্তরের প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠের প্রায় ৩১ একর জায়গায় ১৪টি ১২ তলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
দাপ্তরিক কাজ শুরু হবে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ সচিবালয় স্থানান্তরের প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠের প্রায় ৩১ একর জায়গায় ১৪টি ১২ তলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে প্রায় ৩৩ লাখ ১৬ হাজার বর্গফুট অফিস স্পেস তৈরি হবে। থাকবে তিনটি বেজমেন্ট, গাড়ি পার্কিং, মসজিদ, মাল্টিপারপাস হল, ক্যাফেটেরিয়া ও ডাকঘর। প্রকল্প এলাকায় প্রায় ৩০ শতাংশ জায়গা সবুজায়ন ও জলাধারের জন্য রাখা হবে। মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান।
গতকাল রোববার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার ২৫তম বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ করার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। এ ছাড়া ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে বিশেষ অধ্যাদেশের খসড়া এবং বিপজ্জনক রাসায়নিক ও কীটনাশকের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যসংক্রান্ত রটারডাম কনভেনশনে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সচিবালয় স্থানান্তর প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় চিন্তা করা হয়েছে ৩ হাজার ৪০৯ কোটি ৪৪ লাখ ২৯ হাজার টাকা। বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে চলতি বছরের নভেম্বর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
প্রস্তাবে যা বলা হয়-
বাংলাদেশ সচিবালয়ের বর্তমান অবস্থানে ১৭.৫৭ একর জায়গায় মোট ১৩টি ভবন আছে, তারমধ্যে ৮টি ভবন স্বাধীনতা-পূর্বকালে নির্মিত। সচিবালয়ের পুরোনো ১ ও ২, ৩ ও ৮ নম্বর ভবনগুলো ১৯৩৭ থেকে ১৯৩৯ সালে এবং ৫ নম্বর ভবনটি ১৯৪৭ সালে নির্মিত হওয়ায় ভূমিকম্প সহনীয় হিসেবে নির্মিত হয়নি। ঢাকা শহর ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় ওই স্থাপনাগুলোতে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়/বিভাগের কার্যক্রম পরিচালনা করা ঝুঁকিপূর্ণ।
এছাড়া ভবনগুলোতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যবহারযোগ্য পর্যাপ্ত স্পেস না থাকায় স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ ব্যহত হচ্ছে। ভবনগুলোতে পর্যাপ্ত সংখ্যক ওয়াশ-ব্লক নেই, ধারণক্ষমতার অধিকসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্তৃক ব্যবহৃত হওয়ায় স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। বিদ্যমান বাংলাদেশ সচিবালয়ে মোট অফিস স্পেস প্রায় ১৮.৭৬ লাখ বর্গফুট। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত অফিস স্পেসের চাহিদা এবং সচিবালয়ের কমপাউন্ডের বাইরে অবস্থিত বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগের স্থান সংকুলানের জন্য আরও প্রায় ১০ লাখ বর্গফুটের বেশি অফিস স্পেস প্রয়োজন।
কেমন হবে নতুন সচিবালয়?
এ বিষয়ে একনেক সভার সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে, লুই আই কান-এর মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী ঢাকার শেরেবাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠ প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ সচিবালয় স্থাপনের লক্ষ্যে স্থাপত্য অধিদপ্তর কর্তৃক ধারণাগত স্থাপত্য নকশা প্রণয়ন করা হয়। প্রণীত নকশা অনুযায়ী- শেরেবাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠের প্রায় ৩১.৫৮ একর জায়গায় মোট প্রায় ৩৩.১৬ লাখ বর্গফুট স্পেস সংবলিত ৩টি বেজমেন্টসহ (২০০টি ভূ-উপরিস্থ পার্কিংসহ ৩,৮০০টি গাড়ি পার্কিং) ১৪টি ১২ তলা ভবন (মসজিদ, ৩৫০ জন ধারণক্ষমতা সম্পন্ন ২টি মাল্টিপারপাস হল, ১টি ক্যাফেটেরিয়া, ১টি ডাকঘর ইত্যাদি) নির্মাণ করা হবে। প্রকল্প এলাকায় প্রায় ৩০% জায়গায় সবুজায়ন ও জলাধারের সংস্থান রাখা হয়েছে।
মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত সংক্রান্ত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বিদ্যমান সচিবালয়ে প্রায় ১৮ লাখ ৭৬ হাজার বর্গফুট অফিস স্পেস রয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত চাহিদা এবং সচিবালয় কমপাউন্ডের বাইরে থাকা মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর স্থানসংকুলানের জন্য আরও ১০ লাখ বর্গফুটের বেশি অফিস স্পেস প্রয়োজন। এই চাহিদা পূরণে শেরেবাংলা নগরে নতুন সচিবালয় স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। একনেকের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে লুই আই কানের মাস্টারপ্ল্যান অনুসরণ করে পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে নতুন সচিবালয়ের ধারণাগত স্থাপত্য নকশা তৈরি করেছে স্থাপত্য অধিদপ্তর।
৩৩ লাখ বর্গফুটের বেশি অফিস স্পেস
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় ৩১ দশমিক ৫৮ একর জায়গায় ১৪টি ১২ তলা ভবন নির্মাণ করা হবে। তিনটি বেজমেন্টসহ এসব ভবনে মোট প্রায় ৩৩ লাখ ১৬ হাজার বর্গফুট স্পেস থাকবে। প্রস্তাবিত নকশায় ৩ হাজার ৮০০টি গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ২০০টি পার্কিং হবে ভূ-উপরিস্থ। এ ছাড়া একটি মসজিদ, ৩৫০ জন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন দুটি মাল্টিপারপাস হল, একটি ক্যাফেটেরিয়া ও একটি ডাকঘর নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
মন্ত্রী পরিষদ সচিব বলেন, প্রকল্প এলাকার প্রায় ৩০ শতাংশ জায়গা সবুজায়ন ও জলাধারের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। নতুন সচিবালয় নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বর্তমান সচিবালয়ের স্থানসংকট কতটা কমবে, তা নির্ভর করবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের স্থানান্তর পরিকল্পনা এবং ভবনগুলোর কার্যকর ব্যবহারের ওপর।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে বিশেষ অধ্যাদেশ
বিদ্যুৎ খাতে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো, ভর্তুকির চাপ হ্রাস এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর খসড়া নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। অধ্যাদেশটি লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের ভেটিং সাপেক্ষে চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি বলেন, সরকারের পরিকল্পনা, আগামী গ্রীষ্মের আগে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ও সরকারি কোম্পানির ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে দুটি অর্থায়ন মডেল রাখা হয়েছে। প্রথমটি অপারেশনাল এক্সপেনডিচার বা ওপেক্স মডেল, যেখানে বিনিয়োগকারী নিজস্ব অর্থায়নে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করবে। দ্বিতীয়টি ক্যাপিটাল এক্সপেনডিচার বা ক্যাপেক্স (ঈঅচঊঢ) মডেল, যেখানে নিজস্ব আয় রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যৎ আয় বিবেচনায় নিয়ে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করতে পারবে।
মন্ত্রিসভার প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বর্তমানে সার্ভিস প্রোভাইডারের মাধ্যমে ওপেক্স মডেলে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ, ছাদের ভাড়া হিসেবে বিদ্যুতের অংশীদারত্ব এবং রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধিবিধান নেই। একইভাবে ক্যাপেক্স মডেলে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ও সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য আইনগুলোতে প্রয়োজনীয় সুস্পষ্ট বিধান নেই।
এ কারণে এ খাতে বিনিয়োগ, সেবা গ্রহণ ও রক্ষণাবেক্ষণসংক্রান্ত নিয়ম নির্ধারণে নতুন অধ্যাদেশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে বিনিয়োগের কাঠামো ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দায়িত্ব নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হবে।
মন্ত্রণালয়ের নাম বদল
মন্ত্রিসভার বৈঠকে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ করার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবটি উত্থাপন করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। এছাড়া বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থ ও কীটনাশকের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ রটারডাম কনভেনশনে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাবও অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা।
মন্ত্রিপরিষদের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, ‘রটারডাম কনভেনশন অন দ্য প্রায়র ইনফর্মড কনসেন্ট প্রসিডিউর ফর সার্টেন হ্যাজার্ডাস কেমিক্যালস অ্যান্ড পেস্টিসাইডস ইন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড’ নামে পরিচিত এ আন্তর্জাতিক চুক্তিটি ১৯৯৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর গৃহীত হয়। পরে ২০০৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি কার্যকর হয়। মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তসংক্রান্ত তথ্যে বলা হয়েছে, ইতোমধ্যে ১৬৭টি দেশ কনভেনশনটির সদস্য হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভুটান ছাড়া দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) অন্য সদস্যদেশগুলোও এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
কনভেনশনে অন্তর্ভুক্ত হলে বিপজ্জনক রাসায়নিক ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়ানো, সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে বৈদেশিক অর্থায়ন বৃদ্ধিতে সহায়তা, রাসায়নিক পদার্থের তথ্যভান্ডার তৈরি এবং সেগুলোর গতিবিধি অনুসরণে সহযোগিতা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
এ ছাড়া কনভেনশনের তৃতীয় সংযোজনী বা অ্যানেক্স-৩-এ তালিকাভুক্ত রাসায়নিক আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে পূর্বসম্মতিভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ থাকবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক দেশের মধ্যে দায়িত্ব ভাগাভাগির কাঠামোও শক্তিশালী হবে।
কনভেনশনের তথ্য বিনিময়বিষয়ক ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সদস্যদেশগুলোর সঙ্গে বিপজ্জনক রাসায়নিক ও কীটনাশকসংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক, প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক ও আইনি তথ্য বিনিময় করতে পারবে বাংলাদেশ। পাশাপাশি ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাসায়নিক ব্যবস্থাপনায় রটারডাম কনভেনশনের সচিবালয় থেকে কারিগরি সহযোগিতা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এ প্রস্তাব উত্থাপন করে। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের ফলে আন্তর্জাতিক চুক্তিটিতে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির পরবর্তী প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হলো।
