লন্ডন ভ্রমণের দিনগুলোতে আমার সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয়গুলোর একটি ছিল প্রবাসী বাংলাদেশিদের আন্তরিকতা, তাঁদের অতিথিপরায়ণতা এবং প্রবাসের মাটিতে ইসলামী মূল্যবোধকে ধারণ করে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মকে কাছ থেকে দেখা।
লন্ডন ভ্রমণের দিনগুলোতে আমার সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয়গুলোর একটি ছিল প্রবাসী বাংলাদেশিদের আন্তরিকতা, তাঁদের অতিথিপরায়ণতা এবং প্রবাসের মাটিতে ইসলামী মূল্যবোধকে ধারণ করে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মকে কাছ থেকে দেখা। বিদেশের মাটিতে থেকেও কীভাবে মানুষ নিজের শিকড়, সংস্কৃতি, ধর্মীয় পরিচয় ও দেশপ্রেমকে হৃদয়ে ধারণ করতে পারে, লন্ডনে অবস্থানকালে তার অনেক সুন্দর উদাহরণ দেখার সুযোগ হয়েছে। তেমনই একটি পরিবারের সদস্য মারুফ হোসেন (নাদিম), মীর হোসেন সেলিম সাহেবের ছেলে।
নাদিমের জন্ম লন্ডনে, বেড়ে ওঠাও এ শহরেই। এখানকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তার পড়াশোনা। জন্ম, শিক্ষা ও বেড়ে ওঠার সবকিছুই পাশ্চাত্যের পরিবেশে হলেও তার জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, ছোটবেলা থেকেই ইসলামের প্রতি তার গভীর আকর্ষণ। সে ইসলামী জীবনবিধানের আলোকে নিজেকে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। প্রবাসে জন্ম নেওয়া ও বেড়ে ওঠা অনেক তরুণের সামনে যখন নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় অক্ষুণ্ন রাখার নানা চ্যালেঞ্জ থাকে, তখন নাদিমের জীবনাচরণ নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক।
তার জীবনের অন্যতম সৌভাগ্য হলো, লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী ইস্ট লন্ডন মসজিদের খতিব ও ইসলামী স্কলার মাওলানা আবদুল কাইয়ুম সাহেবের সান্নিধ্যে থেকে ইসলামী শিক্ষা অর্জন ও নৈতিক জীবন গঠনের সুযোগ পাওয়া। একজন আদর্শ শিক্ষকের সাহচর্য মানুষের চিন্তা-চেতনা, চরিত্র ও জীবনবোধকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। বিশেষ করে প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের জন্য এমন আলেম ও দ্বীনদার ব্যক্তিদের সান্নিধ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নাদিমের জীবনেও এই সান্নিধ্য ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে বলে আমার মনে হয়েছে। তার প্রতি আমার আন্তরিক শুভকামনা—আল্লাহ যেন তাকে ইসলামের সুমহান আদর্শের ওপর অবিচল রাখেন এবং পরিবার, সমাজ ও মানবতার কল্যাণে কাজ করার তাওফিক দান করেন।
মারুফ হোসেন নাদিমের শ্বশুর জনাব আব্দুর রহিম। তিনি দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছর ধরে লন্ডনে বসবাস করছেন। দীর্ঘ প্রবাসজীবনের অভিজ্ঞতায় লন্ডন শহরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে তাঁর রয়েছে চমৎকার জানাশোনা। শহরটির অলিগলি, ঐতিহাসিক নিদর্শন এবং বিভিন্ন এলাকার পরিচিতি নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বললে বোঝা যায়, দীর্ঘদিনের বসবাস একজন মানুষকে কীভাবে একটি শহরের সঙ্গে গভীরভাবে পরিচিত করে তোলে।
জনাব আব্দুর রহিম সাহেব অত্যন্ত হাস্যোজ্জ্বল, প্রাণবন্ত ও আন্তরিক একজন মানুষ। একদিন তিনি আমার সঙ্গে দেখা করতে বাসায় এলেন। কথাবার্তার একপর্যায়ে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে বললেন, “আমি আপনাকে লন্ডন ঘুরিয়ে দেখাতে চাই।” তাঁর এই আন্তরিক আমন্ত্রণে আমি স্বাচ্ছন্দ্যেই রাজি হয়ে গেলাম। কারণ, কোনো শহরকে শুধু দূর থেকে দেখা আর সেই শহরের ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে অভিজ্ঞ একজন মানুষের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে দেখা— দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা। আমার কাছে মনে হলো, তাঁর সঙ্গে এই ভ্রমণ শুধু দর্শনীয় স্থান দেখা নয়; বরং লন্ডনের অতীত, বর্তমান ও প্রবাসী জীবনের নানা দিক সম্পর্কে জানারও একটি সুযোগ।
ভ্রমণ শুরু হলো ট্রেনে। লন্ডনের উন্নত গণপরিবহনব্যবস্থার সুবিধা নিয়ে আমরা রওনা হলাম। পথে পথে শহরের ব্যস্ততা, মানুষের কর্মচাঞ্চল্য, আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা এবং বিভিন্ন এলাকার বৈচিত্র্য দেখতে দেখতে এগিয়ে চললাম। পরে হোয়াইটচ্যাপেল এলাকায় নেমে তিনি আমাকে নিয়ে গেলেন ইস্ট লন্ডন মসজিদে। সেখানে জোহরের নামাজ আদায় করলাম। এই মসজিদ শুধু একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়; ব্রিটেনের বুকে মুসলিম সম্প্রদায়ের দীর্ঘ পথচলা, ধর্মীয় পরিচয় সংরক্ষণ এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। মসজিদ এলাকা ঘুরে দেখার পর আমরা টাওয়ার হ্যামলেটসের বিভিন্ন অংশ এবং লন্ডনের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর দিকে এগিয়ে যাই।
ঐতিহ্যবাহী লন্ডনের আরও কিছু স্মরণীয় স্থান
আব্দুর রহিম সাহেব আমাকে লন্ডনের আরও কিছু ঐতিহ্যবাহী ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ঘুরে দেখানোর উদ্যোগ নিলেন। তাঁর আন্তরিকতা আমাকে সত্যিই মুগ্ধ করেছে। তাঁর সঙ্গে বেরিয়ে শহরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কয়েকটি উল্লেখযোগ্য স্থান দেখার সুযোগ হলো। এর মধ্যে ছিল ব্রিটিশ রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান এবং লন্ডনের বিখ্যাত স্থাপত্যগুলোর কয়েকটি।
বিশেষভাবে আমরা ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের আশপাশের এলাকা ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন সংলগ্ন ঐতিহাসিক অঞ্চল সম্পর্কে জানার সুযোগ পাই। ব্রিটেনের রাজনৈতিক ইতিহাস ও রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই স্থানগুলোর গুরুত্ব অনেক। পৃথিবীর অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্রের সরকারপ্রধানের কার্যালয় ও বাসভবনকে কেন্দ্র করে যে ঐতিহাসিক আবহ তৈরি হয়েছে, তা কাছ থেকে অনুভব করা ছিল আমার জন্য বিশেষ অভিজ্ঞতা।
যুক্তরাজ্য সফরে ব্রিটিশ রাজপরিবারের ঐতিহ্য ও ইতিহাসের কথা মনে পড়তেই Buckingham Palace-এর কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। লন্ডনের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই রাজকীয় প্রাসাদ ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য, আভিজাত্য ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদার প্রতীক। দীর্ঘদিন ধরে এটি ব্রিটিশ রাজপরিবারের সরকারি বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রয়াত রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের দীর্ঘ শাসনামলের স্মৃতিও জড়িয়ে রয়েছে এই প্রাসাদের সঙ্গে। প্রাসাদের রাজকীয় স্থাপত্য, সুসজ্জিত সম্মুখভাগ এবং ঐতিহ্যবাহী রাজকীয় প্রহরীদের আনুষ্ঠানিকতা ব্রিটেনের ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক অনন্য পরিচয় তুলে ধরে।
লন্ডনের বিভিন্ন স্থাপনা দেখতে দেখতে আমার মনে হয়েছে, একটি শহরের সৌন্দর্য কেবল তার সুউচ্চ ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা আধুনিক পরিবহনব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি শহরের প্রকৃত পরিচয় ফুটে ওঠে তার ইতিহাস সংরক্ষণ, স্থাপত্যের যত্ন, নাগরিক শৃঙ্খলা এবং ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধার মধ্য দিয়ে। লন্ডন তার পুরোনো ইতিহাস ও আধুনিক নগরজীবনের মধ্যে এক ধরনের সমন্বয় গড়ে তুলেছে। শত বছরের পুরোনো স্থাপনার পাশে আধুনিক ভবন, ব্যস্ত সড়কের পাশে ঐতিহাসিক নিদর্শন—সব মিলিয়ে শহরটি যেন অতীত ও বর্তমানের এক জীবন্ত সম্মিলন।
আব্দুর রহিম সাহেবের মতো দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ একজন মানুষের সঙ্গে ঘোরার সুবিধা হলো, তিনি শুধু জায়গা দেখান না; জায়গাগুলোর তাৎপর্যও বুঝিয়ে দেন। কোথায় কী রয়েছে, কোন স্থানের সঙ্গে কী ইতিহাস জড়িয়ে আছে, কোন এলাকার কী বিশেষ পরিচিতি—এসব বিষয় তাঁর কাছ থেকে জানতে পেরেছি। তাঁর সহযোগিতায় ভ্রমণটি আরও উপভোগ্য ও অর্থবহ হয়ে ওঠে। এ জন্য তাঁর প্রতি আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।
মোঃ আবুল কালাম সাহেবের দাওয়াত : প্রবাসে বাঙালিয়ানার উষ্ণতা
লন্ডন ভ্রমণের এই ব্যস্ততার মধ্যেই আরেকজন আন্তরিক মানুষের কাছ থেকে দাওয়াত পেলাম। তিনি জনাব মোঃ আবুল কালাম সাহেব। তাঁর আমন্ত্রণে লন্ডনের একটি ঐতিহ্যবাহী বাঙালি রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবারের আয়োজন করা হয়। বিদেশের মাটিতে থেকেও বাঙালি খাবার, আতিথেয়তা ও আন্তরিকতার এমন আয়োজন যেন দেশের পরিচিত পরিবেশকে আবারও সামনে নিয়ে আসে।
নির্ধারিত সময়ে আমরা রেস্তোরাঁয় উপস্থিত হলাম। সেখানে আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন জামায়াতের ইউরোপ চ্যাপ্টারের মুখপাত্র ব্যারিস্টার আবু বকর মোল্লা। তিনি পরিচিত একজন ব্যক্তিত্ব। তাঁর সঙ্গে একই টেবিলে বসে মধ্যাহ্নভোজের সুযোগ হয়। বাঙালি খাবারের স্বাদ, পরিচিত ভাষায় কথোপকথন এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের নানা অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে সময়টি বেশ আনন্দময় হয়ে উঠেছিল।
বিদেশে অবস্থানকালে এমন একটি বাঙালি রেস্তোরাঁয় বসে খাবার খাওয়ার অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে ভালো লাগে। চারপাশে ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির পরিবেশ থাকলেও বাঙালি খাবারের ঘ্রাণ, পরিচিত স্বাদ এবং আপনজনদের সঙ্গে আলাপচারিতা মুহূর্তেই দেশের কথা মনে করিয়ে দেয়। মনে হয়, ভৌগোলিক দূরত্ব যতই হোক, মানুষের হৃদয়ে নিজের দেশ ও সংস্কৃতির জায়গাটি আলাদা।
মোঃ আবুল কালাম সাহেবের আন্তরিকতা আমাকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছে। তাঁর বাড়ি বাংলাদেশের সিলেটে। দীর্ঘদিনের প্রবাসজীবনে তিনি ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত থেকে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন। তাঁর মধ্যে আমি একজন সৎজন, অতিথিপরায়ণ ও উদার মনের মানুষের পরিচয় পেয়েছি। বাংলাদেশের মানুষকে দেখলে তিনি তাঁদের প্রতি বিশেষ মমত্ববোধ অনুভব করেন এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু উপহার দিয়ে আনন্দ পান। তাঁর এই স্বভাবের মধ্যে আমি প্রবাসী বাংলাদেশীদের পারস্পরিক ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ববোধের সুন্দর প্রতিফলন দেখতে পেয়েছি।
আমাকেও তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কয়েকটি উপহার দিলেন। তাঁর এই সৌজন্য ও ভালোবাসাকে আমি আনন্দে গ্রহণ করেছি। উপহারের আর্থিক মূল্য এখানে মুখ্য নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আন্তরিকতা, সৌহার্দ্য ও ভালোবাসাই সবচেয়ে বড় বিষয়। একজন মানুষ যখন অন্য একজনকে সম্মান ও আপনত্বের জায়গা থেকে কিছু দেন, তখন সেই উপহার স্মৃতির অংশ হয়ে থাকে। জনাব মোঃ আবুল কালাম সাহেবের এই আন্তরিকতার জন্য আমি তাঁর প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আল্লাহ তাআলা তাঁর ব্যবসা-বাণিজ্যে বরকত দান করুন, তাঁকে সুস্থ রাখুন এবং পরিবার-পরিজনসহ উত্তম জীবন দান করুন।
টাওয়ার হ্যামলেটস : প্রবাসের বুকে এক টুকরো বাংলাদেশ ও স্থানীয় প্রশাসনকে কাছ থেকে দেখা
লন্ডনের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো ঘুরে দেখার পাশাপাশি টাওয়ার হ্যামলেটসের বাংলাদেশি অধ্যুষিত জনপদ সম্পর্কে জানারও বিশেষ আগ্রহ ছিল। একপর্যায়ে টাওয়ার হ্যামলেটসের সম্মানিত স্পিকার মুস্তাক আহমেদ ভাইয়ের সঙ্গে সেখানে ঘুরে দেখার সুযোগ হলো। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম, আলতাফ হোসেনসহ আরও বেশ কয়েকজন ভাই। তাঁদের সঙ্গে নিয়ে রওনা হলাম লন্ডনের এমন একটি অঞ্চলের উদ্দেশে, যেখানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ইতিহাস, সংগ্রাম, সাফল্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয় একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে আছে।
টাওয়ার হ্যামলেটসে পৌঁছে মনে হলো, লন্ডনের ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝেও যেন বাংলাদেশের এক টুকরো পরিচিত আবহ খুঁজে পেলাম। হোয়াইটচ্যাপেল, স্পাইটালফিল্ডস ও ব্রিক লেনসহ বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকাগুলোর পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে চারপাশের বাংলা সাইনবোর্ড, বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ, দোকানপাট এবং মানুষের কথাবার্তায় বারবার দেশের কথা মনে পড়ছিল। পরিচিত ভাষা, খাবার ও সংস্কৃতির উপস্থিতি বিদেশের মাটিতেও এক ধরনের আপন অনুভূতি তৈরি করে। মনে হচ্ছিল, হাজার মাইল দূরে থেকেও বাংলাদেশ যেন এখানে তার নিজের একটি ঠিকানা গড়ে তুলেছে।
টাওয়ার হ্যামলেটস (Tower Hamlets) লন্ডনের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক এলাকা, যা যুক্তরাজ্যের লন্ডন ইস্ট এন্ডের অংশ। প্রায় আট বর্গমাইল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই বরোতে রয়েছে টাওয়ার অব লন্ডন, টাওয়ার ব্রিজ, হোয়াইটচ্যাপেল, ব্রিক লেন, স্পিটালফিল্ডস, বেথনাল গ্রিন, পপলার ও লাইমহাউসের মতো ঐতিহাসিক ও পরিচিত স্থান। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাণিজ্য, নৌপরিবহন, শিল্পকারখানা ও অভিবাসনের কারণে এলাকাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সপ্তদশ শতাব্দীতে ফরাসি হুগেনটদের বসতি স্থাপন এবং পরবর্তী সময়ে ইহুদি ও আইরিশ অভিবাসীদের আগমন এখানকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় গঠনে ভূমিকা রাখে। পরবর্তীকালে ডকল্যান্ডসের বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও শিল্পায়নের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এই অঞ্চল লন্ডনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়। বর্তমানে ক্যানারি ওয়ার্ফের আধুনিক সুউচ্চ ভবন, ঐতিহাসিক স্থাপনা, পার্ক, বাজার ও বহুজাতিক জনগোষ্ঠীর সহাবস্থান টাওয়ার হ্যামলেটসকে লন্ডনের একটি স্বতন্ত্র জনপদে পরিণত করেছে।
টাওয়ার হ্যামলেটসের ইতিহাসে বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ব্রিটেনের সঙ্গে উপমহাদেশের নৌ-বাণিজ্যিক সম্পর্কের সূত্র ধরে বাঙালিদের প্রাথমিক উপস্থিতি তৈরি হয়। ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে ইউরোপগামী জাহাজে কর্মরত নাবিকদের মাধ্যমে এই অঞ্চলের সঙ্গে বাঙালিদের যোগাযোগ গড়ে ওঠে। পরবর্তীকালে বিশেষ করে ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের পর ১৯৭০-এর দশকে বহু বাংলাদেশি উন্নত জীবনের সন্ধানে এখানে বসতি স্থাপন করেন। তাঁদের অনেকে বিভিন্ন কারখানা, বস্ত্রশিল্প ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায় কাজ করে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেন। ধীরে ধীরে ব্রিক লেন ও হোয়াইটচ্যাপেল বাংলাদেশি সংস্কৃতি, ব্যবসা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশিরা শিক্ষা, সংস্কৃতি, ব্যবসা, সামাজিক সেবা ও স্থানীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে শুরু করেন। আজ টাওয়ার হ্যামলেটসকে অনেকেই লন্ডনের বুকে বাংলাদেশের এক টুকরো হিসেবে দেখেন। এখানকার বাংলা ভাষার পরিচিতি, বাংলাদেশি খাবারের দোকান, মসজিদ, সাংস্কৃতিক আয়োজন এবং বাঙালির কর্মচাঞ্চল্য প্রবাসে মাতৃভূমির পরিচয় বহন করে চলেছে।
তবে এই পথচলা সব সময় মসৃণ ছিল না। বর্ণবাদ, বৈষম্য ও সহিংসতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশি সম্প্রদায়কে বিভিন্ন সময়ে সংগ্রাম করতে হয়েছে। সেই সংগ্রামের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছেন বাংলাদেশি পোশাকশ্রমিক আলতাব আলী। ১৯৭৮ সালের ৪ মে বর্ণবাদী হামলায় তিনি নিহত হন। তাঁর হত্যাকাণ্ড পূর্ব লন্ডনের বাংলাদেশি সম্প্রদায়কে গভীরভাবে আলোড়িত করে এবং বর্ণবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনকে শক্তিশালী করে। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে হোয়াইটচ্যাপেলের সেন্ট মেরিজ পার্কের নাম পরিবর্তন করে আলতাব আলী পার্ক (Altab Ali Park) রাখা হয়। এভাবেই একটি পার্ক পরিণত হয় বাঙালির আত্মপরিচয়, অধিকার আদায় ও বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামের ঐতিহাসিক প্রতীকে।
আলতাব আলী পার্ক আজ লন্ডনে বসবাসরত বাংলাদেশিদের কাছে শুধু একটি সবুজ উন্মুক্ত স্থান নয়; এটি প্রতিবাদ, সংহতি ও সম্মিলিত কণ্ঠ প্রকাশের একটি পরিচিত সমাবেশস্থল। বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় ও ঐতিহাসিক ইস্যু, প্রবাসীদের অধিকার, বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক দাবিদাওয়া নিয়ে বিভিন্ন সময়ে এখানে মানুষ সমবেত হন। পার্কে অবস্থিত বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবাহী শহীদ মিনার প্রবাসে বাংলা ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার প্রতীক হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে প্রবাসী বাংলাদেশিরা এখানে সমবেত হয়ে ভাষাশহীদদের স্মরণ করেন এবং মাতৃভাষার প্রতি তাঁদের ভালোবাসা প্রকাশ করেন।
টাওয়ার হ্যামলেটসের অলিগলিতে হাঁটতে হাঁটতে এই পরিবর্তনের চিত্রটি উপলব্ধি করছিলাম। একদিকে আধুনিক লন্ডনের ব্যস্ততা, অন্যদিকে বাংলাদেশি মানুষের জীবনযাত্রা, পরিচিত খাবারের ঘ্রাণ এবং মাতৃভাষার স্বতঃস্ফূর্ত ব্যবহার—সব মিলিয়ে এলাকাটির নিজস্ব একটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বিশেষ করে হোয়াইটচ্যাপেলের ইস্ট লন্ডন মসজিদ ও ব্রিক লেনের বাংলাদেশি অধ্যুষিত পরিবেশে দাঁড়িয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের দীর্ঘ সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প যেন চোখের সামনে ভেসে উঠল।
এই এলাকার আরেকটি দিক আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে—প্রবাসে থেকেও নিজেদের শিকড়ের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা। মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কমিউনিটি সংগঠন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তাঁরা নিজেদের ঐতিহ্যকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করছেন। নতুন প্রজন্ম যেন নিজেদের পরিচয় ভুলে না যায়, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত থাকে এবং ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ ধারণ করে বেড়ে ওঠে—এ জন্য অনেক পরিবার ও প্রতিষ্ঠান নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
আধুনিক ক্যানারি ওয়ার্ফের ঝকঝকে আকাশচুম্বী ভবন আর ঐতিহাসিক বাংলাদেশি জনপদের পাশাপাশি অবস্থান আমাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্মরণ করিয়ে দিল—মানুষ পৃথিবীর যে প্রান্তেই বসবাস করুক না কেন, তার শিকড়, স্মৃতি ও মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা হৃদয়ের গভীরেই থেকে যায়। প্রবাসে প্রতিষ্ঠিত হওয়া মানে নিজের অতীতকে ভুলে যাওয়া নয়; বরং নিজের পরিচয়কে ধারণ করে নতুন সমাজে সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করাও সম্ভব। টাওয়ার হ্যামলেটস যেন তারই একটি জীবন্ত উদাহরণ।
লন্ডন সফরের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা ছিল টাওয়ার হ্যামলেট পরিদর্শন। ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ভাইয়ের ল-ম্যাট্রিক্স চেম্বার থেকেই টাওয়ার হ্যামলেটে যাত্রা শুরু। অবশেষে টাওয়ার হ্যামলেটসের সম্মানিত স্পিকার মুস্তাক আহমেদ ভাইয়ের সঙ্গে ঘুরে দেখার জন্য রওনা হলাম। এ সময় সঙ্গে ছিলেন ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম, আইটি কনসালট্যান্ট হাসানুল বান্না, আলতাফ হোসেনসহ আরও বেশ কয়েকজন ভাই।
টাওয়ার হ্যামলেটস ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ ছিল সম্মানিত স্পিকার মুস্তাক আহমেদ ভাইয়ের আন্তরিক আতিথেয়তা এবং স্থানীয় প্রশাসনের কার্যক্রম সম্পর্কে জানার সুযোগ। তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আমাকে এলাকার বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থান ঘুরিয়ে দেখান। পাশাপাশি টাওয়ার হ্যামলেটসের স্থানীয় প্রশাসন, নাগরিক ব্যবস্থাপনা এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দেন।
তাঁর সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে উপলব্ধি করলাম, একটি এলাকার উন্নয়ন কেবল রাস্তাঘাট, ভবন কিংবা অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কার্যকর প্রশাসন, জবাবদিহি, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং জনস্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া। স্থানীয় সরকার কীভাবে এলাকার মানুষের বিভিন্ন সমস্যা ও প্রয়োজন নিয়ে কাজ করে, কীভাবে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করে এবং কীভাবে নাগরিকদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে—এসব বিষয় সম্পর্কে জানার আগ্রহ আমার দীর্ঘদিনের।
মুস্তাক আহমেদ ভাই আমাকে টাওয়ার হ্যামলেটসের অধিবেশন কক্ষেও নিয়ে যান। পার্লামেন্টের আদলে সাজানো সেই অধিবেশন কক্ষে তাঁর পাশে বসার সুযোগ আমার জন্য ছিল বিশেষ অভিজ্ঞতা। সেখানে তিনি স্থানীয় প্রশাসনের কার্যক্রম, অধিবেশন পরিচালনার পদ্ধতি, বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন। স্থানীয় পর্যায়ে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো কীভাবে আলোচনায় আসে, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে কী ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় এবং নাগরিকদের বিভিন্ন বিষয় কীভাবে বিবেচনা করা হয়—এসব সম্পর্কে বাস্তব ধারণা লাভ করি।
অধিবেশন কক্ষের পরিবেশ ও কার্যক্রম দেখে আমার মনে হয়েছে, স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকারিতা বাড়াতে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর পাশাপাশি স্বচ্ছতা, দায়িত্বশীলতা এবং জনসম্পৃক্ততার গুরুত্ব অনেক। একটি এলাকার মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ ও নিরাপদ করতে স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিকদের প্রয়োজন বোঝা, তাঁদের সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া এবং দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করা—এসব বিষয় সুশাসনের অন্যতম ভিত্তি।
বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে বিদেশের স্থানীয় প্রশাসনের কার্যক্রম কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা আমার কাছে তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছে। বিভিন্ন দেশের প্রশাসনিক কাঠামো ও অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ থাকে। তবে প্রতিটি দেশের ইতিহাস, আইন ও সামাজিক বাস্তবতা আলাদা। তাই অন্য দেশের ভালো দিকগুলো বুঝে নিজেদের বাস্তবতার আলোকে সেগুলো থেকে শিক্ষা নেয়াই হতে পারে এ ধরনের অভিজ্ঞতার অন্যতম ইতিবাচক দিক।
মুস্তাক আহমেদ ভাইয়ের আন্তরিকতা, সময় দেওয়া এবং এত সুন্দরভাবে বিভিন্ন বিষয় বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য তাঁর প্রতি জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। তাঁর সঙ্গে ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম, আলতাফ হোসেন এবং অন্যান্য ভাইদের উপস্থিতি এই ভ্রমণকে আরও আনন্দময় ও স্মরণীয় করে তুলেছিল। তাঁদের সঙ্গে কাটানো সময় শুধু লন্ডনের একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা নয়; বরং প্রবাসী বাংলাদেশিদের সামাজিক অবস্থান, নেতৃত্ব, ঐতিহ্য এবং স্থানীয় প্রশাসনে তাঁদের অংশগ্রহণ সম্পর্কে জানারও একটি মূল্যবান সুযোগ।
টাওয়ার হ্যামলেটস থেকে ফেরার সময় মনে হচ্ছিল, এই সফরে আমি যেন দুটি ভিন্ন অথচ পরস্পরসম্পর্কিত জগতকে কাছ থেকে দেখলাম—একদিকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের শিকড়ের প্রতি গভীর ভালোবাসা, অন্যদিকে নাগরিক প্রশাসন ও জনজীবন পরিচালনার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। এই দুই অভিজ্ঞতাই আমার লন্ডন ভ্রমণকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। শহরের ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখার স্মৃতির পাশাপাশি মানুষের আন্তরিকতা, বাংলাদেশি কমিউনিটির অগ্রযাত্রা এবং স্থানীয় প্রশাসন সম্পর্কে অর্জিত অভিজ্ঞতাও দীর্ঘদিন মনে থাকবে।
এরপর লন্ডনের অন্যতম বিখ্যাত স্থাপনা টাওয়ার ব্রিজ দেখার সুযোগ হলো। টেমস নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই সেতু লন্ডনের পরিচিত প্রতীকগুলোর একটি। এর স্থাপত্যশৈলী, ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং নদীর দুই তীরকে সংযুক্ত করার অনন্য কাঠামো সত্যিই মুগ্ধ করার মতো। নদীর প্রবাহ, সেতুর বিশালতা এবং আশপাশের নগরদৃশ্য মিলিয়ে জায়গাটির সৌন্দর্য উপভোগ করলাম। আবদুর রহিম সাহেবের কাছ থেকে বিভিন্ন স্থাপনার পরিচিতি ও ইতিহাস সম্পর্কে জানতে জানতে মনে হচ্ছিল, প্রতিটি জায়গার পেছনেই যেন লুকিয়ে আছে একটি দীর্ঘ গল্প।
প্রবাসের মানুষ, মানবিক সম্পর্ক ও স্মৃতির বন্ধন
লন্ডনে কাটানো দিনগুলোর কথা ভাবলে বারবার মনে পড়ে, বিদেশে মানুষের প্রকৃত সম্পদ শুধু অর্থ-সম্পদ কিংবা সামাজিক অবস্থান নয়; বরং মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও সহযোগিতার মানসিকতা। আবদুর রহিম সাহেবের সময় বের করে আমাকে শহর ঘুরিয়ে দেখানো, আবদুল মালেক সাহেবের স্নেহপূর্ণ দাওয়াত ও উপহার, নাদিমের ইসলামী জীবনবোধ এবং ইস্ট লন্ডন মসজিদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ধর্মীয় ও সামাজিক পরিবেশ—সবকিছু মিলিয়ে আমার লন্ডন ভ্রমণের স্মৃতিতে একটি বিশেষ অধ্যায় তৈরি হয়েছে।
শেষ কথা
এই সফর তাই আমার কাছে শুধু লন্ডন দেখা নয়; এটি ছিল মানুষ দেখা, সমাজ দেখা, ইতিহাস দেখা, জ্ঞানচর্চা দেখা এবং প্রবাসের মাটিতে ইসলামী জীবন ও চিন্তার একটি বাস্তব অধ্যায় কাছ থেকে দেখার সুযোগ। সন্তানের মায়ায় শুরু হওয়া সেই সফর শেষ হয়েছে। কিন্তু কিছু দৃশ্য, কিছু মানুষের ভালোবাসা, কিছু আলাপ এবং কিছু প্রশ্ন এখনো মনে রয়ে গেছে। সন্তানের আলিঙ্গনের উষ্ণতা, নাতনির মুখের হাসি, নিউপোর্টের শান্ত প্রকৃতি, লন্ডনের ব্যস্ত নগরজীবন, ইস্ট লন্ডন মসজিদের দৃশ্য, ক্যামব্রিজের ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণ এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের জ্ঞানসমৃদ্ধ পরিবেশ—সব মিলিয়ে এই লন্ডন সফর আমার জীবনের স্মরণীয় সফরগুলোর একটি হয়ে থাকবে। আল্লাহ তাআলা প্রবাসে বসবাসকারী সকল বাংলাদেশি ও মুসলমানের জীবনকে সহজ করুন, তাঁদের ঈমান, পরিবার ও সংস্কৃতির বন্ধনকে দৃঢ় রাখুন এবং দ্বীনি জ্ঞান ও মানবকল্যাণে তাঁদের প্রচেষ্টা কবুল করুন।
যাঁরা তাঁদের মূল্যবান সময় দিয়ে আমাকে লন্ডন দেখিয়েছেন, আপ্যায়ন করেছেন এবং আন্তরিকতা দিয়ে আপন করে নিয়েছেন, তাঁদের সবার প্রতি জানাই গভীর কৃতজ্ঞতা। মানুষের জীবনে কিছু ভ্রমণ কেবল চোখে দেখা দৃশ্যের জন্য স্মরণীয় হয়, আর কিছু ভ্রমণ স্মরণীয় হয়ে থাকে মানুষের ভালোবাসার জন্য। আমার কাছে লন্ডনের এই অভিজ্ঞতা—ইতিহাস, ঐতিহ্য, ইসলামী জীবনবোধ ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের আন্তরিকতার এক অপূর্ব সমন্বয়।
পরিশেষে, দীর্ঘ ২১ দিনের স্মৃতিময় যুক্তরাজ্য সফরের ইতি টেনে ২৬ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টায় বাংলাদেশে ফেরার ফ্লাইট। দেখতে দেখতে কেটে গেল প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানো আনন্দঘন দিনগুলো। মীর হোসেন সেলিম সাহেবের বাসা থেকে বিদায়ের মুহূর্ত যত ঘনিয়ে আসছিল, ততই মনটা ভারী হয়ে উঠছিল। বিশেষ করে আমার ছেলে হাসানুল বান্না ও পুত্রবধূ সানজিদার কাছ থেকে বিদায় নেয়ার সময় আবেগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছিল। তারা দুজনই অশ্রুসিক্ত চোখে আমাকে বিদায় জানাচ্ছিল। সেই দৃশ্য হৃদয়ের গভীরে দাগ কেটে যায়। নাতি-নাতনিদের মুখের হাসি, সন্তানের কাছ থেকে হাজার মাইল দূরে থাকার কষ্ট একজন বাবা হিসেবে কতটা গভীর, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। একদিকে দেশে ফেরার আনন্দ, অন্যদিকে প্রিয় সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের ছেড়ে যাওয়ার বেদনা— দুটি বিপরীত অনুভূতি একসঙ্গে হৃদয়কে ভারাক্রান্ত করে তুলেছিল।
তাদের ভালোবাসা এবং একসঙ্গে কাটানো দিনগুলোর স্মৃতি বুকে ধারণ করে বাংলাদেশের উদ্দেশে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে পৌঁছালাম। বিদায়লগ্নে মীর হোসেন সেলিম সাহেব ও আমার ছেলে হাসানুল বান্না বিমানবন্দরে উপস্থিত হয়ে আমাকে বিদায় জানান। প্রিয়জনদের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার এই মুহূর্তটি ছিল আবেগ, ভালোবাসা ও স্মৃতিতে ভরা। পেছনে পড়ে রইল যুক্তরাজ্যের পরিচিত-অপরিচিত অসংখ্য মুখ, প্রিয়জনদের সান্নিধ্য আর একগুচ্ছ মধুর স্মৃতি। সঙ্গে নিয়ে চললাম ভালোবাসা, অভিজ্ঞতা ও আবেগে সমৃদ্ধ এক ভ্রমণকাহিনীফ। মনে মনে মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করলাম—তিনি যেন আমার সন্তান ও পরিবারের সবাইকে সুস্থ, নিরাপদ ও নেক হায়াত দান করেন এবং আবারও প্রিয়জনদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার সুযোগ করে দেন। অবশেষে আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে ২৭ আগস্ট বেলা ১১টার দিকে বাংলাদেশে পৌছালাম।
বিদায় যুক্তরাজ্য, বিদায় প্রিয়জনেরা। দূরত্ব বাড়লেও হৃদয়ের বন্ধন অটুট থাকুক।
