নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের জৈনপুর গ্রামে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত উকিল মুন্সি স্মৃতিকেন্দ্রটি অবহেলায় পড়ে আছে। ছবি: খবরের কাগজ
হাওরাঞ্চলের পূবালী বাতাসে আজও ভেসে বেড়ায় বাউল সাধক উকিল মুন্সির বিচ্ছেদী সুর। মরমি গানের জগতে যিনি ছিলেন এক অনন্য ‘বিরহ সম্রাট’। হাওরবাসীর প্রেম-বিরহ, আত্মিক আকুতি, নিসর্গ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা–সবই পূর্ণতা পেয়েছিল তার অমর সৃষ্টিতে। অথচ মানবতাবাদী এই লোকসাধকের স্মৃতি সংরক্ষণে সরকারি উদ্যোগ থমকে গেছে। সীমাহীন অযত্ন আর অবহেলায় পরিত্যক্ত হতে চলেছে তার নামে নির্মিত প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা ব্যয়ের স্মৃতিকেন্দ্রটি। যে আঙিনায় প্রতিদিন ধ্বনিত হওয়ার কথা ছিল লোকগানের মিষ্টি সুর, সেখানে আজ নেমে এসেছে নিস্তব্ধ নীরবতা; যা ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত করছে সংগীতপ্রেমীদের।
জানা গেছে, নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের জৈনপুর গ্রামে উকিল মুন্সির বাস্তুভিটাসহ ৫৩ শতক জমির ওপর ২০২৩ সালে ‘উকিল মুন্সি স্মৃতিকেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর আওতায় রয়েছে উকিল মুন্সির সমাধিসৌধ, সংগীতচর্চা ভবন ও মিলনায়তন, গ্রন্থাগার, একাডেমিক ভবন, নদীর ঘাট এবং তার পরিবারের সদস্যদের বসবাসের জন্য আবাসিক ভবন। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ৪ কোটি ২১ লাখ টাকা অনুদানে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করে গণপূর্ত অধিদপ্তর ও স্থাপত্য অধিদপ্তর। উদ্বোধনের সময় সেখানে ঘটা করে উকিল মুন্সির প্রথম স্মরণোৎসব করা হয়। কিন্তু উদ্বোধন ও স্থাপনা হস্তান্তরের পরই থেমে যায় সব আয়োজন। এরপর আর কর্তৃপক্ষের কারও দেখা মেলেনি। চার বছরেও কেন্দ্রটি ঠিকমতো চালু করা হয়নি; আয়োজন হয়নি কোনো অনুষ্ঠানের। নেওয়া হয়নি এটি রক্ষা বা যত্ন ও পরিচর্যার কোনো উদ্যোগ। এমনকি স্থাপনাটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনো জনবলও নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ডিঙাপোতা হাওরসংলগ্ন বেতাই নদীর পাড়ে সীমাহীন অযত্ন আর অবহেলায় দাঁড়িয়ে আছে ‘উকিল মুন্সি স্মৃতিকেন্দ্র’ নামের প্রায় পরিত্যক্ত স্থাপনাটি। চোখ মেললেই বোঝা যায়, জনপ্রিয় বাউলসাধকের স্মরণে অপূর্ব নির্মাণশৈলীতে নির্মিত এই কেন্দ্রটি একদিন হাওরবাসীর নজর কেড়েছিল, যা দিনে দিনে ঢাকা পড়ছে ধুলোবালি, আগাছার জঙ্গল আর ময়লা-আবর্জনায়। কোনো রকম যত্নের ছাপ নেই। এরই মধ্যে কেন্দ্রের প্রধান ফটকটি অকেজো হয়ে গেছে। সীমানাপ্রাচীরের একাধিক স্থানে দেখা দিয়েছে বড় বড় ফাটল। ভেঙে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে গেছে প্রবেশপথের সিঁড়ি। ভবনের ছাদ, দরজা-জানালাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা দ্রুত সংস্কার করা জরুরি। এদিকে মিলনায়তন, গ্রন্থাগার ও একাডেমিক ভবনে নিয়মিত ঝুলছে তালা।
আরও পড়ুন
স্থানীয়রা জানান, ২০২৪ সালের পর থেকে স্থাপনাটির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। সন্ধ্যা নামলেই নেমে আসছে ঘুটঘুটে অন্ধকার। বসে মাদকসেবী, জুয়াড়ি ও বখাটেদের আড্ডা। হাওরাঞ্চলের যে সাধারণ মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে এখানে বেড়াতে আসতেন, তারা এখন সন্ধ্যার পর এই পথ দিয়ে যেতে ভয় পান। এ ছাড়া জৈনপুর বাজার থেকে উকিল মুন্সি স্মৃতিকেন্দ্র পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার রাস্তা কাঁচা, যা বর্ষায় কর্দমাক্ত হয়ে থাকে।
স্থানীয়রা জানান, এখনো প্রতিদিন দূর-দূরান্তের অনেকে উকিল মুন্সির স্মৃতিচিহ্ন দেখতে আসেন। কিন্তু তারা এটির অবস্থা দেখে হতাশ হন। কারণ সুদৃশ্য একটি স্থাপনা ছাড়া এর ভেতরে যেন আর কিছুই নেই। নিয়মিত অনুষ্ঠান তো দূরের কথা, সংগীতচর্চার কোনো আয়োজন নেই। বরাদ্দ দেওয়া হয়নি কোনো বাদ্যযন্ত্র, যা সংগীতচর্চার জন্য অপরিহার্য। মিলনায়তনে কোনো সাউন্ড সিস্টেমও স্থাপন করা হয়নি। গ্রন্থাগারে সরবরাহ করা হয়নি একটিও বই। ফলে ওই কক্ষগুলো কখনোই খোলা হয় না। লোকসাধকের এই স্মৃতিকেন্দ্রে নির্মাণ করা হয়নি কোনো স্থায়ী মঞ্চও।
আরও পড়ুন
উকিল মুন্সি স্মৃতিকেন্দ্রের এই বেহাল অবস্থায় আক্ষেপের শেষ নেই তার উত্তরাধিকারীদের। উকিল মুন্সির নাতি কুলকুল আহমেদ বলেন, ‘কেন্দ্রটি নির্মাণের সময় আমাদের বলা হয়েছিল, এখানে নিয়মিত সংগীতচর্চার পরিবেশ সৃষ্টি করা হবে। উকিল মুন্সিসহ হাওরাঞ্চলের বাউলদের গান নিয়ে গবেষণার সুযোগ তৈরি করা হবে। উকিল মুন্সির জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে বড় উৎসব করা হবে। তা ছাড়া স্থাপনাটি দেখভাল করার জন্য আমাদের পরিবারের একজনকে স্থায়ীভাবে চাকরি দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু চাকরি তো দূরের কথা, কেন্দ্রটি আজও ঠিকমতো চালুই করা হয়নি। চার বছর ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। ২০২৪ সালে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। আমার ভাই বুলবুল আহমেদ এবং বোন আফরোজা বেগম আউলিয়া কেন্দ্রে অবস্থান করেন। তারা নিজেদের সাধ্যমতো কেন্দ্রটি দেখেশুনে রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু অন্তত একজন নিয়মিত কর্মচারী ছাড়া এটির রক্ষণাবেক্ষণ করা কঠিন। কারণ প্রতিদিন এখানে দর্শনার্থী আসেন, তাদের সময় দিতে হয়। কোনো অতিথিশালা না থাকায় দূরের দর্শনার্থীরা এসে বিপাকে পড়েন। তখন তাদের থাকা-খাওয়ারও ব্যবস্থা করতে হয়।’
কুলকুল আহমেদ আরও বলেন, ‘স্মৃতিকেন্দ্রটি পুরোদমে চালু করার জন্য আমি দুই বছর ধরে স্থানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় পর্যন্ত দৌড়াচ্ছি। কিন্তু কারও কোনো সাড়া পাচ্ছি না। আগে নিজ উদ্যোগে স্থানীয়দের সহযোগিতা নিয়ে বছরের অন্তত দু-একটা অনুষ্ঠান করতে পারতাম। এখন সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় তাও করতে পারছি না।’ কুলকুল জানান, সর্বশেষ তিনি গত ৭ জুলাই বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের মাধ্যমে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী বরাবর একটি আবেদন পাঠিয়েছেন। সেটিরও কোনো সাড়া পাননি এখনো।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কাগজে-কলমে উকিল মুন্সি স্মৃতিকেন্দ্রের একটি ব্যবস্থাপনা কমিটি আছে। কমিটির বেশির ভাগ সদস্যই সরকারি কর্মকর্তা। কিন্তু এই কমিটিরও কোনো সভা কখনো হয়েছে বলে কারও জানা নেই। কমিটির সদস্য (বেসরকারি) মোহনগঞ্জের কবি ও সংস্কৃতিকর্মী রইস মনরম বলেন, ‘আমাকে কমিটির সদস্য করা হয়েছে মর্মে একটি চিঠি পেয়েছিলাম। তবে এই কমিটির কোনো সভা হয়েছে বলে আমার জানা নেই।’ তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘উকিল মুন্সির নামে একটি স্মৃতিকেন্দ্র করায় আমরা স্থানীয়রা খুব আশাবাদী হয়েছিলাম। এটি নির্মাণ করতে রাষ্ট্রের বিপুল অঙ্কের টাকাও ব্যয় হয়েছে। কিন্তু পরে কোনো কার্যক্রম চালু না হওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক।’ এটি দ্রুত চালু করার জন্য কমিটির সদস্যদের নিয়ে সভা করে জরুরি কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাগিদ দেন তিনি। বলেন, ‘আর কিছু হোক বা না হোক, সংগীতসহ সংস্কৃতি চর্চার মতো একটা পরিবেশ অন্তত সৃষ্টি করা দরকার।’
উকিল মুন্সির স্মারকগ্রন্থের সম্পাদক সাংবাদিক মুহম্মদ আকবর বলেন, ‘উকিল মুন্সি এই সমাজের এক বিরল ও ব্যতিক্রমধর্মী চরিত্র। তিনি একই সঙ্গে ইমামতি এবং বাউলগান করতেন। কিন্তু সমাজের মানুষ তাতে বাধা হয়ে দাঁড়াননি। উপরন্তু তিনি এতটাই ধর্মপ্রাণ ছিলেন যে তার পেছনে নামাজ পড়ার জন্য মানুষ অধীর আগ্রহ দেখাতেন। আবার বাউল হিসেবেও এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে তার গান শুরু হলে মানুষ রাত পোহানোর কথা ভুলে যেতেন। তার গানে তন্ময় হয়ে মানুষ অঝোরে ডুকরে কাঁদতেন। শুধু হাওর নয়, সারা বাংলা ভাষাভাষীদের কাছেই তিনি জনপ্রিয়। কিন্তু তার নামে প্রতিষ্ঠিত স্মৃতিকেন্দ্রটি পরিত্যক্ত অবস্থা দেখে আমরা ক্ষুব্ধ। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উচিত এটি দ্রুত চালু করা এবং দেখভাল করার জন্য জনবল নিয়োগ করা। পাশাপাশি বছরে নির্ধারিত কিছু অনুষ্ঠানের বাইরে নিয়মিত সংগীতচর্চার মতো পরিবেশ সৃষ্টি করা দরকার। কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিলে স্থানীয় জনগণও সহযোগিতা করবে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে উকিল মুন্সি স্মৃতিকেন্দ্রের সভাপতি ও মোহনগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা খাতুন বলেন, ‘কেন্দ্রটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনকে লিখিতভাবে জানিয়েছি। মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে জেলা প্রশাসক ও আমার সঙ্গে অনলাইনে মিটিং হয়েছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে, মন্ত্রণালয়ের একটি টিম শিগগিরই এসে কেন্দ্রটি পরিদর্শন করবে। এরপর তা চালু করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’
