আকাশজুড়ে রঙিন ফানুস, ঢাকঢোলের তালে তরুণ-তরুণীদের উচ্ছ্বাস আর নানা ধর্মের মানুষের উপস্থিতি। প্রবারণা পূর্ণিমাকে ঘিরে চট্টগ্রামের নন্দনকানন বৌদ্ধবিহারে বসে সম্প্রীতির মিলনমেলা। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় উৎসব দেখতে ভিড় করেন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষও। উৎসবের এই আবহে চট্টগ্রামকে সব ধর্মের মানুষের জন্য নিরাপদ ও সম্প্রীতির নগরী হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় জানিয়েছেন সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
রোববার (২৫ অক্টোবর) সন্ধ্যায় প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে নন্দনকানন বৌদ্ধবিহারে ফানুস উৎসবে মানুষের ঢল নামে। রঙিন কাগজে তৈরি ছোট-বড় নানা আকৃতির ফানুসে বুদ্ধের ছবি, শান্তি ও কল্যাণের বার্তা এবং বিভিন্ন সংগঠনের নাম-লোগো ফুটিয়ে তোলা হয়। একে একে ফানুস উড়লে বর্ণিল আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে সন্ধ্যার আকাশ। আয়োজনের সঙ্গে ছিল আতশবাজি ও সাংস্কৃতিক উচ্ছ্বাস।
এক মাস ধরে ধর্মচক্র, শিবলী সংসদ, আর্য্য সংঘ, সম্যক, মহাবোধি, সিদ্ধার্থ সংঘ ও সারিপুত্রসহ বিভিন্ন বৌদ্ধ যুব সংগঠনের সদস্যরা ফানুস তৈরির কাজ করেন। চট্টগ্রাম জেলার অন্যতম বৃহৎ এ আয়োজনে সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত ফানুস ওড়ানো হয়। উৎসবকে কেন্দ্র করে বৌদ্ধবিহার ও আশপাশের এলাকায় বসে ছোটখাটো মেলা। নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করেন পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। ছিল ফায়ার সার্ভিসের দলও।
পরিবার-পরিজন নিয়ে উৎসবে আসা রিটন বড়ুয়া বলেন, প্রতিবছরের মতো এবারও বৌদ্ধবিহারে এসেছেন তাঁরা। তাঁদের ধর্মের মূল বাণী শান্তি। বৌদ্ধ ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, গৌতম বুদ্ধের চুল স্বর্গে গমনের স্মৃতি ধারণ করে ফানুস ওড়ানো হয়। তিন মাস বর্ষাব্রত পালনের পর এ উৎসবের আয়োজন করা হয়। অহিংসা ও শান্তির চর্চার মধ্য দিয়ে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ এবং শান্তিময় বিশ্ব গড়ে ওঠার প্রত্যাশা করেন তিনি।
এর আগে সকাল থেকে বৌদ্ধবিহারে বুদ্ধপূজা, ফুলপূজা, মোমবাতি প্রজ্বালন, পঞ্চশীল ও অষ্টশীল প্রার্থনাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় আচার পালন করা হয়। নন্দনকানন ছাড়াও নগরের বিভিন্ন বৌদ্ধবিহার এবং রাউজান, ফটিকছড়ি, পটিয়া ও বাঁশখালীসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলার বৌদ্ধবিহারে ফানুস ওড়ানো হয়।
প্রবারণা পূর্ণিমা ও কঠিন চীবর দানোৎসব উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, চট্টগ্রামকে সব ধর্মের মানুষের জন্য নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ, নান্দনিক ও সম্প্রীতির নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে চান তাঁরা। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যের মধ্য দিয়ে সব ধর্মের মানুষ এ নগরে বসবাস করবে।
তিনি বলেন, কোনো অপশক্তি যেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। কেউ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সব ধর্মের মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাঁদের লক্ষ্য।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাম্যের বাণী উদ্ধৃত করে মেয়র বলেন, ‘গাহি সাম্যের গান—মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।’ হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম ও খ্রিষ্টানসহ সব ধর্মের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় চট্টগ্রামকে পরিচ্ছন্ন, সবুজ, স্বাস্থ্যকর ও মানবিক নগরীতে পরিণত করার আহ্বান জানান তিনি।
বৌদ্ধ ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রসঙ্গ তুলে মেয়র বলেন, গৌতম বুদ্ধের জন্মের সঙ্গে পদ্মফুলের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য জড়িয়ে আছে। সেই ভাবনা থেকে বৌদ্ধবিহারের সামনে সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় গুরুদের পরামর্শ এবং বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের দেওয়া নকশা বিবেচনায় নিয়ে উদ্যোগটি আরও নান্দনিকভাবে সাজানো হবে।
তিনি আরও বলেন, নগরের কালুরঘাট এলাকায় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের জন্য একটি জায়গা দেওয়া হয়েছে। তাদের সার্বিক উন্নয়ন ও কল্যাণে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলীসহ বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় গুরু, নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
