রাশিয়ায় বিশ্বে প্রথমবারের মতো মানুষের মেরুদণ্ড প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। এই অস্ত্রোপচারে আঘাত পাওয়ার তিন বছর পর এক ব্যক্তির মেরুদণ্ডের ক্ষতিগ্রস্ত অংশটি সরিয়ে ফেলে সেখানে এক ব্রেন-ডেড দাতার শরীর থেকে নেওয়া একটি অংশ প্রতিস্থাপন করা হয়। বিজ্ঞান সাময়িকী দ্য নিউ সায়েন্টিস্টের প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত, ওই ব্যক্তি সুস্থ আছেন বলে জানানো গেছে। তবে এই অপারেশন কিছু গবেষকের মনে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। তারা প্রশ্ন তুলেছেন—এটি আদৌ কাজ করবে কি না এবং তাদের আশঙ্কা, এর ফলে উল্টো ওই ব্যক্তির অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে।
চীনের গুয়াংজি ইউনিভার্সিটি অব চাইনিজ মেডিসিনের দ্বিতীয় অ্যাফিলিয়েটেড হাসপাতালের জিয়াওপিং রেন এই সার্জারির নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি নিউ সায়েন্টিস্টকে জানান, অপারেশনটি গত সপ্তাহে মস্কোর স্ক্লিফোসোভস্কি ইনস্টিটিউট ফর ইমার্জেন্সি মেডিসিনে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রেন জানান, তিন বছর আগে আঘাতের কারণে মেরুদণ্ডে আঘাতপ্রাপ্ত এক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ওপর এই সার্জারি করা হয়। এ ধরনের আঘাতে সাধারণত পক্ষাঘাত বা প্যারালাইসিস হয় এবং আঘাতপ্রাপ্ত স্থানের নিচের অংশের শারীরিক অনুভূতিশক্তি নষ্ট হয়ে যায়। তবে ওই ব্যক্তির মেরুদণ্ডের ঠিক কোন অংশটিতে আঘাত লেগেছিল, তা জানা যায়নি।
বিস্তারিত তথ্য সীমিত হলেও, রেন জানান যে এই সার্জারিতে পলিথিন গ্লাইকল (পিইজি)—এক ধরণের জৈব আঠা—পাশাপাশি মাইক্রোসার্জিক্যাল কৌশল ব্যবহার করে দাতার অংশের প্রান্তগুলোকে গ্রহীতার নিজস্ব মেরুদণ্ডের সঙ্গে জোড়া লাগানোর কাজ করা হয়েছে। রেন বলেন, ‘আমরা রোগীর সম্ভাব্য প্রতিটি ঝুঁকি ও সার্জারির ফলাফল সম্পর্কে তাকে আগেই জানিয়েছি এবং রোগীর বর্তমান অবস্থা ভালো আছে। আমাদের রাশিয়ান টিম পরবর্তীতে এই সার্জারির বিবরণ দিয়ে একটি ডকুমেন্ট প্রকাশ করবে।’
চীনের হেইলংজিয়াং প্রদেশের হারবিন মেডিকেল ইউনিভার্সিটির সার্জিও কানাভেরো, যিনি এর আগে মানুষের মেরুদণ্ড প্রতিস্থাপনের সম্ভাবনা নিয়ে রেনের সাথে যৌথভাবে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন, বলেছেন, ‘মেরুদণ্ডে আঘাতের ক্ষেত্রে এটি একটি স্পুৎনিক মুহূর্ত।’
তবে অপারেশনটি গ্রহীতার জন্য আদৌ সহায়ক হবে কি না, তা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। যুক্তরাজ্যের সাউদাম্পটন ইউনিভার্সিটির মেলিসা অ্যান্ড্রুজ বলেন, ‘রোগীর নিরাপত্তা নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন, কারণ বড় ধরনের একটি সার্জারি থেকে সেরে ওঠার প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও এই প্রক্রিয়া শেষে তার অবস্থা সম্ভবত আরও খারাপ হবে, অথচ এর সুফল খুবই সামান্য।’ তিনি সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকির বিষয়েও সতর্ক করেছেন।
মেরুদণ্ডে আঘাত মেরামতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মস্তিষ্ক এবং আঘাতপ্রাপ্ত স্থানের নিচের নিউরাল সার্কিট বা স্নায়ুজালের মধ্যে যোগাযোগ পুনরুদ্ধার করা। মেরুদণ্ডের কোষগুলো বিভক্ত হয় না এবং নতুন করে বৃদ্ধি পায় না, আর আঘাতের পর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো আরও বেশি ধ্বংসপ্রাপ্ত হতে থাকে। বহু বছর ধরে রেন, কানাভেরো এবং অন্যান্য গবেষকরা এমন একটি পদ্ধতি নিয়ে কাজ করে আসছেন যেখানে সদ্য কাটা মেরুদণ্ডের পৃষ্ঠগুলোকে একত্রিত করে পিইজি প্রয়োগ করা হয়, যাতে সংযোগস্থলের ফাইবারগুলোকে জোড়া লাগানো যায়—যেমন শুকনো স্প্যাগেটির টুকরোগুলোকে মাথাটায় মাথাটায় মিলিয়ে রাখা এবং আশা করা যে কিছু ফাইবার একে অপরকে ছুঁয়ে যাবে।
মস্কোর স্ক্লিফোসোভস্কি ইনস্টিটিউট ফর ইমার্জেন্সি মেডিসিনেরই মাইকেল লেবেনস্টাইন-গুমোভস্কি শুয়োরের ওপর একই ধরনের কাজ করেছেন, যদিও তিনি এই মানব প্রতিস্থাপনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তিনি এর আগে নিউ সায়েন্টিস্টকে জানিয়েছিলেন যে—এই প্রস্তাবিত ‘ফিউশন’ বা জোড়া লাগানোর পদ্ধতিটি নতুন স্নায়ুকোষ তৈরি করা বা ক্ষতস্থান ভেদ করে ফাইবারগুলোকে বেড়ে উঠতে উৎসাহিত করার পরিবর্তে স্নায়ুগুলোকে একসঙ্গে সংযুক্ত করার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। তাত্ত্বিকভাবে, এর পরে আসে ‘নিউরোপ্লাস্টিক রিঅর্গানাইজেশন’ বা স্নায়বিক পুনর্গঠন, যেখানে মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ড নতুন সংযোগগুলোর সাথে খাপ খাইয়ে নেয়, যা আগে একসঙ্গে কাজ করত না।
এই কৌশল ব্যবহার করে ইঁদুর, কুকুর এবং শুয়োরের চলাচলের ক্ষেত্রে কিছু উন্নতি দেখা গেছে। কিছু প্রটোকলে প্রদাহ কমাতে বা স্নায়ুর স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ওষুধ যোগ করা হয়, সেই সঙ্গে মেরুদণ্ডের সার্কিটগুলোতে বৈদ্যুতিক উদ্দীপনাও দেওয়া হয়। তবে, সদ্য কেটে ফেলা মেরুদণ্ডকে পুনরায় জোড়া লাগানোর সঙ্গে বছরের পর বছর আগের পুরনো আঘাত মেরামত করা বা মেরুদণ্ডের একটি দাতার অংশকে সংহত করা এক নয়।
অ্যান্ড্রুজ বলেন যে একটি প্রতিস্থাপনকে কার্যকরিভাবে সংযুক্ত করতে হলে সার্জারিতে এমন অণু থাকতে হবে যা টিস্যু নিরাময়কে উৎসাহিত করে। সেই সঙ্গে এমন উপাদানও প্রয়োজন যা মেরুদণ্ডের ভেতর এবং চারপাশে থাকা অণুগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে, যা স্নায়ু ফাইবারের বৃদ্ধিতে প্রাকৃতিক বাধা হিসেবে কাজ করে এবং এমন উপাদানও প্রয়োজন যা দাতা টিস্যু ও গ্রহীতার মেরুদণ্ডের মধ্যে বৃদ্ধিতে উদ্দীপনা যোগায়। অ্যান্ড্রুজ বলেন, ‘এমনকি তারপরও, পুনর্জন্ম এবং কার্যক্ষমতা ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা আমার মতে শূন্য।’
এই সার্জারির ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত পশুর ওপর চালানো গবেষণাগুলো নিয়েও তার সন্দেহ রয়েছে। তিনি বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে, আমি বিশ্বাস করি না যে এই গবেষণাগুলো যথেষ্ট কঠোরভাবে করা হয়েছে এবং এর ফলাফলগুলো স্নায়ুবিজ্ঞানগতভাবে যা সম্ভব তার সাথে মেলে না।’
যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটির অ্যান্ড্রু জ্যাকসন বলেন, কিছু তথ্য প্রমাণ রয়েছে যে পিইজি কাটা মেরুদণ্ডের স্নায়ুগুলোকে পুনরায় জোড়া লাগাতে সাহায্য করতে পারে। তিনি এমন একটি পরিস্থিতি কল্পনা করতে পারেন যেখানে মেরুদণ্ড টিস্যুর একটি প্রতিস্থাপিত অংশ কাটা স্নায়ু ফাইবারের পুনর্জন্মকে সমর্থন করার জন্য কিছু বৃদ্ধির উপাদান (growth factors) সরবরাহ করতে পারে। তবে তিনি বলেন যে গবেষকরা ঐতিহ্যগতভাবে স্টেম সেল ব্যবহার করে স্নায়ু ফাইবারের বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করেন, কারণ ‘প্রাপ্তবয়স্ক স্নায়ুতন্ত্রের দুটি টুকরোকে কার্যকরি উপায়ে একসাথে জোড়া লাগানো অত্যন্ত কঠিন।’
তিনি আরও বলেন যে—তিনি আশা করেন এই সার্জারির সপক্ষে সহায়ক প্রমাণগুলো যত দ্রুত সম্ভব পিয়ার রিভিউ বা বিশেষজ্ঞ পর্যালোচনার জন্য উপলব্ধ হবে। তিনি বলেন, ‘মেরুদণ্ডে আঘাত নিয়ে অনেক মানুষ বেঁচে আছেন এবং যেকোনো নতুন চিকিৎসার সম্ভাবনা ও ফলাফল সম্পর্কে তাদের স্পষ্টতা, স্বচ্ছতা এবং সততা পাওয়ার অধিকার রয়েছে।’
