শহর থেকে অনেক দূরে— মেঠোপথ, শান্ত জলাশয় আর সবুজে ঘেরা নিঝুম গ্রাম কানাইপুকুর। সারা দিন পুরো গ্রামজুড়ে থাকে নীরবতা। তবে সূর্যটা পশ্চিম আকাশে হেলে পড়তেই বদলে যেতে শুরু করে দৃশ্যপট। দূর-দূরান্ত থেকে সাঁঝের মেঘের মতো ডানা মেলে উড়ে আসে অসংখ্য পাখির সারি। কোনোটি আকাশে চক্কর দেয়, কোনোটি সোজা গিয়ে বসে গাছের ডালে। কোথাও দল বেঁধে বসে বাসার ওপর। কেউ ডানা মেলছে, কেউ খাবার নিয়ে ফিরছে নীড়ে, কেউবা নির্বিকার দাঁড়িয়ে দেখছে চারপাশ। প্রকৃতি এখানে যেন নিজের হাতে সাজিয়েছে পাখিদের জন্য এক বিশাল সংসার। এলাকার মানুষ কানাইপুকুরকে এখন পাখির কলোনি নামে চেনে।
জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলায় কানাইপুকুর গ্রামটি শামুকখোল পাখির অভয়ারণ্যে পরিণত
হয়েছে। এই পাখিদের দেখতে আসেন বিভিন্ন এলাকার মানুষ। কানাইপুকুর যেন পাখিদের গড়ে তোলা এক রূপকথার রাজ্য।
এই অনন্যসাধারণ দৃশ্য দেখতে দূরদূরান্ত থেকে আসেন প্রকৃতিপ্রেমী ও দর্শনার্থীরা। ক্যামেরায় ধরে রাখেন বৈচিত্র্যময় অবিস্মরণীয় মুহূর্তগুলো। তবে ছবি তোলার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে প্রকৃতির এই আয়োজনকে কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা।
ক্ষেতলাল উপজেলার আলমপুর ইউনিয়নের কানাইপুকুর গ্রামের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলমের বাড়ির পাশে রয়েছে একটি পুকুর। সেই পুকুরের চারপাশে প্রায় ৫ বিঘা জমির ওপর বট, নিম, তেঁতুল, আম, বাঁশঝাড়সহ বিভিন্ন গাছ রয়েছে। এসব গাছ প্রায় দুই দশক ধরে শামুকখোল পাখির স্থায়ী অভয়াশ্রমে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া এখানে রয়েছে বক, কুঁচবক, শঙ্খ চোরা, পানকৌড়ি ও হরিয়াল। পাখির কিচিরমিচির ডাক সবসময় প্রাণময় করে রাখে গ্রামবাসীকে।
বর্তমানে এই বিশাল পাখি কলোনি আগলে রেখেছেন মরহুম আব্দুস ছোবহান মণ্ডলের দুই ছেলে জহুরুল ইসলাম, জাহাঙ্গীর আলম মণ্ডল এবং তাদের সন্তানরা। তারা জানান, প্রথম দিকে অল্প কয়েকটি পাখি ছিল, এখন হাজার হাজার পাখি। প্রতি বছর পাখিগুলো এপ্রিল মাসে প্রথম ঝাঁক এসে কানাইপুকুরে পা রাখে এবং শুরু করে বাসা তৈরির কাজ ও ডিম পাড়ার প্রস্তুতি। মে-জুন মাসের প্রথমার্ধে ডিম থেকে বের হয় ছানা। আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ছানাগুলো উড়তে শেখে এবং গ্রামে নেমে আসে রূপের পূর্ণতা। নভেম্বর-মার্চ মাসে শীতের আমেজ ছোঁয়ার আগেই পাখিগুলো পাড়ি জমায় অচিন গন্তব্যে।
কালাই উপজেলা থেকে আসা দর্শনার্থী আরমান হোসেন ও সাজিয়া ইসলাম পায়েল বলেন, কানাইপুকুরের গাছগুলোতে পাখির এই অবাধ বসতি শুধু একটি দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য নয়, বরং মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থানেরও অনন্য উদাহরণ। পাখিদের আবাসস্থলটি সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি দর্শনার্থীদের জন্য পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা প্রয়োজন। তাহলে কানাইপুকুর শুধু পাখিদের নিরাপদ ঠিকানা হিসেবেই নয়, জয়পুরহাটের প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের অন্যতম আকর্ষণের জায়গা হিসেবে আরও পরিচিত হয়ে উঠতে পারে।
ক্ষেতলাল সরকারি ছাইদ আলতাফুন্নেসা কলেজের প্রভাষক তানজির আহমেদ সাকিব বলেন, বসবাসের জন্য পুরনো লম্বা গাছ শামুকখোলদের প্রথম পছন্দ। তাই প্রাচীন গাছগুলোতে এরা বাসা বাঁধে। এসব পাখির খাদ্য হিসেবে প্রথম পছন্দ শামুক। তাই তারা শামুক ভাঙা, শামুক খোর, শামুক খোল বা শাম খোল নামে পরিচিতি পেয়েছে। চারপাশের সবুজের মধ্যে এত পাখির একসঙ্গে বসবাস সত্যিই মুগ্ধ করার মতো।
জয়পুরহাট জেলার পরিবেশ কর্মী এম রাসেল আহমেদ বলেন, শামুকখোল পাখি বাংলাদেশে আসে প্রজননের উদ্দেশ্যে। বাচ্চা বড় হয়ে উড়তে শিখলে তারা চলে যায় রাশিয়ার সাইবেরিয়া অঞ্চলের দিকে। এরা সাধারণত কলোনিয়াল ভাবে বাস করে। নিরাপদ আশ্রয় ও খাবার পেলে এরা অনেক দিন থেকে যায়। সরকারের সহযোগিতায় এটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ক্ষেতলাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাকির মুন্সী বলেন, কানাইপুকুরের পাখি কলোনি প্রকৃতির এক অনন্য সৃষ্টি। এদের আবাসস্থল রক্ষা ও শিকার বন্ধে স্থানীয়দের ভূমিকা প্রশংসনীয়। এই অভয়ারণ্য সংরক্ষণ এবং দর্শনার্থীদের জন্য আরও আকর্ষণীয় করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
