ভারত থেকে সরকারিভাবে আমদানি করা চালের একটি চালানে বিষাক্ত উপাদান আফলাটক্সিনের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। চট্টগ্রামের হালিশহর কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদামে (সিএসডি) মজুত ১৩৫ টন চালে এ উপাদান পাওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে বিষয়টি আরও নিশ্চিত হতে চালের নমুনা পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। ফলে চালে কী পরিমাণ আফলাটক্সিন রয়েছে এবং দূষণের উৎস কোথায়, তা এখনো স্পষ্ট নয়। প্রাথমিক পরীক্ষায় খাওয়ার উপযোগী ঘোষণার পর একই চাল নিয়ে এমন উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় সরকারি খাদ্য সংগ্রহ ও মান যাচাই প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
হালিশহর সিএসডির ব্যবস্থাপক ইকবাল মাহমুদ গত শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চালের মান নিয়ে আপত্তি ওঠার পর পুনরায় পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তী পরীক্ষায় হালিশহর গুদামে থাকা ১৩৫ টন চালের নমুনায় আফলাটক্সিনের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে বলে জানানো হয়।
খাদ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এমভি এইচটি পাইওনিয়ার জাহাজে করে ভারত থেকে চালের চালানটি আনা হয়। গত ২১ জুলাই জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছায়। পরদিন খাদ্য অধিদপ্তরের পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদলের উপস্থিতিতে চালের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরীক্ষার প্রতিবেদনে চালকে খাওয়ার উপযোগী বলা হলে ২৪ ও ২৫ জুলাই তা খালাস করা হয়।
এরপর চালের একটি অংশ ঢাকার তেজগাঁও, চট্টগ্রামের হালিশহর ও দেওয়ানহাট এবং গাজীপুরের জয়দেবপুরের খাদ্যগুদামে পাঠানো হয়। কিন্তু গুদামে পৌঁছানোর পর চালের মান নিয়ে আপত্তি তোলেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। চাল খাওয়ার উপযোগী নয় বলে মনে হওয়ায় পরিবহন ঠিকাদারেরাও সেগুলোর পরিবহন স্থগিত রাখেন। পরে বিষয়টি লিখিতভাবে খাদ্যসচিব ও খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে জানানো হয়।
চালের মান নিয়ে অভিযোগ ওঠার পর খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জসিম উদ্দিন খানের নির্দেশে মোট সাড়ে ৯ হাজার টন চালের বিতরণ স্থগিত রেখে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয় বলে খাদ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।
গত ১৭ আগস্ট বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের গাজীপুর কার্যালয়ের শস্যমান ও পুষ্টি বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শরীফা সুলতানা দীপ্তির নেতৃত্বে দুই সদস্যের একটি দল চট্টগ্রামে যায়। দলটি হালিশহর ও দেওয়ানহাট কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদামের কয়েকটি চালের স্তূপ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে। পরবর্তী পরীক্ষায় হালিশহর গুদামের ১৩৫ টন চালে আফলাটক্সিনের উপস্থিতি পাওয়া যায়।
হালিশহর ও দেওয়ানহাট গুদামের ব্যবস্থাপকদের বক্তব্য অনুযায়ী, পরীক্ষায় ১৩৫ টন চালে ক্ষতিকর উপাদানটি শনাক্ত হওয়ার পর বাকি চাল নিয়ম অনুযায়ী বিতরণ করা হয়েছে। তবে প্রকাশিত প্রতিবেদনে পরীক্ষায় আফলাটক্সিনের মাত্রা কত ছিল, তার বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। বাকি চালের প্রতিটি চালান ও নমুনার পরীক্ষার ফল সম্পর্কেও পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। চট্টগ্রাম খাদ্য বিভাগের চলাচল ও সংরক্ষণ শাখার নিয়ন্ত্রক রেজোয়ান সাকিব জানিয়েছেন, বিষয়টি জানার পর অধিকতর পরীক্ষার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
আফলাটক্সিন এক ধরনের বিষাক্ত পদার্থ, যা অ্যাসপারজিলাস গোত্রের নির্দিষ্ট ছত্রাক থেকে তৈরি হয়। ধান, চালসহ বিভিন্ন শস্য উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশে দীর্ঘদিন পড়ে থাকলে এসব ছত্রাক জন্মাতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, আফলাটক্সিনযুক্ত খাবার গ্রহণে তীব্র বিষক্রিয়া হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে যকৃতের ক্ষতি এবং যকৃতের ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
তবে চালের কোনো নমুনায় আফলাটক্সিন শনাক্ত হওয়ার অর্থ এই নয় যে সংশ্লিষ্ট চালের প্রতিটি দানা সমানভাবে দূষিত, কিংবা কতটা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে তা শুধু উপস্থিতি থেকে নির্ধারণ করা সম্ভব। এর জন্য নমুনায় বিষাক্ত পদার্থটির মাত্রা, পরীক্ষার ফল এবং সংশ্লিষ্ট খাদ্য নিরাপত্তা মানদণ্ড বিবেচনা করতে হবে।
এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, প্রাথমিক পরীক্ষায় চাল খাওয়ার উপযোগী ঘোষিত হওয়ার পর পরবর্তী পরীক্ষায় কীভাবে আফলাটক্সিন শনাক্ত হলো। দূষণটি আমদানির আগেই ছিল, নাকি পরিবহন ও সংরক্ষণের কোনো পর্যায়ে তৈরি হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। অধিকতর পরীক্ষার ফল প্রকাশ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে চালের প্রকৃত মান ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
