সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলো লক্ষ করে হুথিদের হামলা নিছক সামরিক অভিযান নয়; এর পেছনে রয়েছে মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি, ইয়েমেনের যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখা এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে ইরানের প্রভাব জোরদার করার বহুমাত্রিক হিসাব। সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর অগ্রগতির মুখে হুথিরা সৌদি ভূখণ্ডে আঘাত হেনে নিজেদের সক্ষমতা প্রদর্শন এবং রিয়াদকে রাজনৈতিক ছাড় দিতে বাধ্য করার কৌশল নিতে পারে। একই সঙ্গে এসব হামলার মধ্য দিয়ে তেহরানের কাছে নিজেদের কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরারও সুযোগ তৈরি হয়। তবে বেসামরিক স্থাপনায় হামলা কতটা রাজনৈতিক সাফল্য এনে দিতে পারবে, নাকি উল্টো আন্তর্জাতিক চাপ ও কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা বাড়াবে—সেটিই এখন এই সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বিজ্ঞাপন
পশ্চাদপসরণের ক্ষতিপূরণ ও রাজনৈতিক চাপ
প্রথমত, ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর অগ্রগতি এবং লোহিত সাগরে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখার সক্ষমতা কমে যাওয়ায় হুথিরা কৌশলগত চাপে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালিয়ে তারা নিজেদের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন করতে চায়। এর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক মহলে এই বার্তা দেওয়ার চেষ্টা হয় যে, স্থলভাগে পিছু হটলেও তারা প্রতিপক্ষের গভীরে আঘাত হানতে সক্ষম।
দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার ও তার বাহিনীকে সৌদি আরবের সমর্থন অব্যাহত রাখার মূল্য বাড়িয়ে দিতে চায় হুথিরা। বিমানবন্দরকে লক্ষ করে হামলার মাধ্যমে রিয়াদের ওপর অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করা এবং নিজেদের শর্তে আলোচনায় বসতে বাধ্য করাই তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য বলে প্রতীয়মান হয়।
এই কৌশলে বিমানবন্দর কেবল সামরিক লক্ষ্য নয়, এটি রাজনৈতিক দর-কষাকষির হাতিয়ার। হুথিদের হিসাব হলো, সৌদি আরব ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সমর্থন দিতে থাকলে দেশটির নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ বাড়বে। তবে ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর শুরু হওয়া শান্তিপ্রক্রিয়ায় হুথিদের ভূমিকা এবং রাজনৈতিক সমঝোতার পথে তাদের অবস্থান মূল্যায়ন করাও জরুরি।
তৃতীয়ত, ইয়েমেনসহ বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরবের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ জানানো এই হামলার আরেকটি সম্ভাব্য উদ্দেশ্য। আঞ্চলিক সংঘাত ও আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে ইরানের প্রভাব ক্ষতিগ্রস্ত হলে তেহরানের জন্য মিত্র ও সহযোগী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যকারিতা প্রদর্শন আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই প্রেক্ষাপটে হুথিদের হামলা ইরানের আঞ্চলিক কৌশলের সঙ্গেও সম্পর্কিত বলে বিশ্লেষণ করা যায়।
হুথিদের প্রতিটি হামলা তাই দুটি বার্তা বহন করে—একটি ইয়েমেনে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার জন্য, অন্যটি আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে ইরানের প্রভাব জানান দেওয়ার জন্য। এর মাধ্যমে তারা তেহরানকে নিজেদের কৌশলগত গুরুত্ব বোঝাতে এবং রিয়াদ ও ওয়াশিংটনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চায়।
সব মিলিয়ে বিমানবন্দরে হামলার মাধ্যমে হুথিরা মাঠপর্যায়ের সীমাবদ্ধতাকে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগে পরিণত করতে চায়। কিন্তু এ কৌশলের মধ্যেই রয়েছে বড় দুর্বলতা। কারণ রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের পরিবর্তে সহিংসতার মাধ্যমে চাপ সৃষ্টির পথ দীর্ঘ মেয়াদে শান্তি, স্থিতিশীলতা কিংবা গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সমাধান নিশ্চিত করতে পারে না।
ইরানি কৌশল সম্পর্কে রিয়াদের উপলব্ধি
সৌদি আরবের কাছে হুথিরা কেবল ইয়েমেনের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী নয়; তারা ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের কৌশলেরও অংশ। তেহরান বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তিকে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে দর-কষাকষিতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চায়—এমন বিশ্লেষণ প্রচলিত। হুথিদের ভৌগোলিক অবস্থান তাদের এই কৌশলে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। তাই সৌদি আরবের বিমানবন্দরে হামলাকে শুধু দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা-সংকট হিসেবে দেখলে এর বৃহত্তর আঞ্চলিক তাৎপর্য উপেক্ষিত হবে।
এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হলো, হুথিদের প্রতিটি উসকানির জবাবে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ না থেকে সামরিক প্রতিরক্ষা, কূটনৈতিক তৎপরতা ও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বকে সমন্বিত করা। এতে সংঘাতের গতিপথ নির্ধারণের ক্ষমতা শুধু হামলাকারীদের হাতে থাকে না; আক্রান্ত রাষ্ট্রও নিজস্ব কৌশলগত উদ্যোগ ধরে রাখতে পারে।
প্রাণহানি, আকাশপথে বিঘ্ন সৃষ্টি, বিমান চলাচলে অনিশ্চয়তা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে উদ্বেগ—সবই সৌদি আরবের জন্য গুরুতর চ্যালেঞ্জ। কৌশলগত প্রশ্ন হলো, হুথিরা এসব ক্ষয়ক্ষতিকে এমন রাজনৈতিক ছাড় আদায়ের উপকরণে পরিণত করতে পারছে কি না, যা তাদের ঘোষিত লক্ষ্য পূরণ করে। যে হামলা একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ভাঙতে, কিংবা তার কার্যক্রম অচল করতে ব্যর্থ হয়, সেটি একপর্যায়ে হামলাকারীর জন্যই কৌশলগত বোঝা হয়ে উঠতে পারে।
রিয়াদ এমন এক প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না, যেখানে হুথিরা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করবে আর সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তা প্রতিহত করবে। কারণ এ ধরনের সমীকরণে হামলাকারীরাই সংঘাতের সময় ও লক্ষ্য নির্ধারণের সুযোগ পায়। এর পরিবর্তে সৌদি আরব সামরিক, প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক—এই তিনটি ক্ষেত্রে নিজেদের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। সামরিক ক্ষেত্রে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর অগ্রগতি হুথিদের নিয়ন্ত্রণাধীন ভূখণ্ড ও সামরিক অবস্থানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সক্রিয় করেছে। এই চুক্তির আওতায় এক দেশের ওপর হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সামরিক সমন্বয় জোরদার হলে হুথিদের হামলা মোকাবিলায় সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরো বিস্তৃত হতে পারে। তখন প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হিসাব শুধু রিয়াদের সঙ্গে নয়, বরং বৃহত্তর প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বের প্রেক্ষাপটেও বিবেচিত হবে। এতে তেহরানের সামনে প্রশ্ন উঠতে পারে—হুথিদের ব্যবহার করে চাপ সৃষ্টির কৌশল ইরানের জন্য আদৌ কতটা লাভজনক?
এদিকে সৌদি আরবে এই হামলার মূল শিক্ষা হলো—রাষ্ট্রের শক্তি শুধু কতটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে, কিংবা কতটি সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে, তার ওপর নির্ভর করে না। সংকটের মধ্যেও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম সচল রাখা, নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব ধরে রাখার সক্ষমতাও শক্তির গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।
সৌদি আরবের সামনে তাই দুটি সমান্তরাল দায়িত্ব—একদিকে নিজের ভূখণ্ড ও নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে সংঘাতকে এমন পর্যায়ে যেতে না দেওয়া, যেখানে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা আরো বিস্তৃত হয়। সামরিক প্রতিরক্ষা, বিচক্ষণ কূটনীতি এবং সংকট সামলে ওঠার সক্ষমতা এ ক্ষেত্রে পরস্পরের পরিপূরক।
সৌদি আরবের সাফল্য নির্ভর করবে আঘাতের পরও উন্নয়ন ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অব্যাহত রাখা এবং হুথিদের হামলাকে রাজনৈতিক ছাড় আদায়ের কার্যকর হাতিয়ার হতে না দেওয়ার ওপর। একই সঙ্গে ইয়েমেনের সংকটের স্থায়ী সমাধান সামরিক সংঘাতের বাইরে রাজনৈতিক সমঝোতার পথেই খুঁজতে হবে। কারণ দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ইয়েমেনের জনগণের স্বার্থ, দেশটির সার্বভৌমত্ব এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তাকে একই সমীকরণে আনতে হবে।
লেখক: বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা
