অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যে যাত্রীদের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে ওয়েস্টার্ন সিডনি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট (ডব্লিউএসআই)। রোববার সকালে গোল্ড কোস্টগামী প্রথম বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী ফ্লাইটের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে নতুন এই বিমানবন্দর। অস্ট্রেলিয়ার পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে নির্মিত প্রথম বড় নতুন বিমানবন্দর হিসেবে এটিকে দেশটির বিমান চলাচল খাতে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। সিডনির কেন্দ্রীয় ব্যবসায়িক এলাকা (সিবিডি) থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে ব্যাজেরিস ক্রিকে অবস্থিত বিমানবন্দরটি ২৪ ঘণ্টা চালু থাকবে। সিডনির বিদ্যমান কিংসফোর্ড স্মিথ বিমানবন্দরের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি পশ্চিম সিডনির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এটি।
রোববার সকাল ১১টায় জেটস্টারের ফ্লাইট জেকিউ৩৬২ গোল্ড কোস্টের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। ফ্লাইটটির সব টিকিট আগেই বিক্রি হয়ে যায়। একই দিন বিকেল ৩টায় গোল্ড কোস্ট থেকে জেকিউ৩৬৩ ফ্লাইটটি ডব্লিউএসআইতে ফিরে আসে। সন্ধ্যা ৬টায় মেলবোর্নগামী আরেকটি ফ্লাইট ছাড়ার সূচি রয়েছে। গত জুলাইয়ে বিমানবন্দরটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্গো কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। এবার যাত্রীবাহী ফ্লাইট চালুর মধ্য দিয়ে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক কার্যক্রমের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করল ডব্লিউএসআই।
ডব্লিউএসআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সাইমন হিকি জানিয়েছেন, ভবিষ্যতের ক্রমবর্ধমান যাত্রীচাহিদা বিবেচনায় নিয়েই বিমানবন্দরটি নির্মাণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০-এর দশকের শুরুর দিক থেকে মাঝামাঝি সময়ে বছরে প্রায় এক কোটি যাত্রী পরিবহনের লক্ষ্যে পৌঁছানোর আশা করা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে নতুন টার্মিনাল ও আরেকটি রানওয়ে নির্মাণের মাধ্যমে ২০৬০-এর দশকে বার্ষিক যাত্রী ধারণক্ষমতা ৮ কোটি ২০ লাখে উন্নীত হতে পারে।
হিকি বলেন, আমরা যেন একটি ম্যারাথনের শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছি। শরীর কিছুটা ক্লান্ত মনে হলেও, এই অবস্থানে পৌঁছাতে পেরে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। এটি একটি বিশাল মাইলফলক। বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে এটি একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন।
তিনি আরও বলেন, যাত্রী ও গন্তব্যের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিমানবন্দরটির কার্যক্রমও সম্প্রসারিত হবে। আগামী এক বছরের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে ২৫০টিরও বেশি গন্তব্যের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের প্রত্যাশা রয়েছে তাদের। নতুন নতুন এয়ারলাইনসও এই কার্যক্রমে যুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নতুন বিমানবন্দরটি পশ্চিম সিডনির অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিমানবন্দর নির্মাণকাজে প্রায় ১০ হাজার কর্মী যুক্ত ছিলেন, যাদের প্রায় অর্ধেকই পশ্চিম সিডনির বাসিন্দা।
সিইও সাইমন হিকির ভাষ্য অনুযায়ী, ২০৩০-এর দশকে বার্ষিক যাত্রীসংখ্যা এক কোটিতে পৌঁছালে বিমানবন্দর ও এর আশপাশের কার্যক্রম পরিচালনায় সর্বোচ্চ ৮ হাজার ৫০০ কর্মসংস্থানের প্রয়োজন হতে পারে।
ফেডারেল অবকাঠামো ও পরিবহনমন্ত্রী ক্যাথরিন কিং রোববার বিমানবন্দরটি চালুর ঘটনাকে কয়েক দশকের প্রচেষ্টার ফল হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সত্যিকার অর্থে বড় কিছু গড়ে তুলতে হলে অটল ধৈর্য ও দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টার প্রয়োজন হয়।
নতুন টার্মিনালে পশ্চিম সিডনির আদিবাসী জনগোষ্ঠীর শিল্প ও ঐতিহ্যকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। টার্মিনালের বাইরের চত্বরে স্থাপন করা হয়েছে ধারুগ ও ডারকিনজাং সম্প্রদায়ের শিল্পী অ্যাডাম লজের ভাস্কর্য ‘বারায়াবিনইয়াং’ বা ‘সংবার্ডস’। স্থানীয় উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলকে কেন্দ্র করে তৈরি এসব শিল্পকর্মে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে আদিবাসী সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য।
অ্যাডাম লজ বলেন, বিমানবন্দরে আগত দর্শনার্থীদের সামনে ধারুগ সংস্কৃতি তুলে ধরতে পারা অত্যন্ত আনন্দের। এর মাধ্যমে নিজেদের গল্প ও ঐতিহ্য বিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। পাশাপাশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব ও প্রাণশক্তির কথাও মানুষ জানতে পারবে।
ভবিষ্যতের বিমান চলাচলে নতুন দিগন্ত
সিডনির কেন্দ্র থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার এবং পেনরিথের কেন্দ্র থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ডব্লিউএসআইকে ঘিরে পশ্চিম সিডনিতে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। ২৪ ঘণ্টা কার্যক্রম চালানোর সক্ষমতা, ভবিষ্যতে টার্মিনাল সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক গন্তব্যের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধির পরিকল্পনা বিমানবন্দরটিকে দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিবহনকেন্দ্রে পরিণত করতে পারে।
সিইও সাইমন হিকি বলেন, বৃহত্তর সিডনির বাসিন্দা এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অস্ট্রেলিয়ায় আসা মানুষের জন্য আরও বেশি ভ্রমণ ও বিমানসেবা বেছে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করাই তাদের লক্ষ্য। নতুন এই বিমানবন্দরে যাত্রীদের স্বাগত জানাতে তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।
