অর্থনীতির নানা সংকটের মধ্যও সুখবর পাওয়া গেছে পোশাক রপ্তানিতে। দেশের তৈরি পোশাকের অপ্রচলিত (নন-ট্র্যাডিশনাল) বাজারে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) অপ্রচালিত বাজারের শীর্ষ পাঁচ দেশ— জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, তুরস্ক ও দক্ষিণ কোরিয়া তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে ১০২ কোটি ৫২ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলারের। গত অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৯৩ কোটি ৫৩ লাখ ডলার। সে হিসাবে এই পাঁচ বাজারে রপ্তানি বেড়েছে ৯ দশমিক ৬২ শতাংশ।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে বাংলাদেশের সব অপ্রচলিত বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮১ কোটি ডলারে। এর মধ্যে শীর্ষ পাঁচ বাজারের অবদান ৫৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ। অর্থাৎ অপ্রচলিত বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে এই পাঁচ দেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
জাপান শীর্ষে, দ্বিতীয় অস্ট্রেলিয়া : অপ্রচলিত শীর্ষ পাঁচ বাজারের মধ্যে জাপান বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে
বড় গন্তব্য হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। দেশটিতে প্রথম প্রান্তিকে রপ্তানি হয়েছে ৩৪ কোটি ৩৬ লাখ ৫০ হাজার ডলারের পোশাক, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৬১ শতাংশ বেশি। অপ্রচলিত বাজারের মধ্যে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির ১৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ হয়েছে জাপানে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা অস্ট্রেলিয়ায় রপ্তানি হয়েছে ২০ কোটি ৯ লাখ ৬০ হাজার ডলারের পোশাক। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দেশটিতে রপ্তানি বেড়েছে ১ দশমিক ০২ শতাংশ।
অন্যদিকে, তৃতীয় বৃহত্তম বাজার ভারতে রপ্তানি হয়েছে ২০ কোটি ৪৯ লাখ ৬০ হাজার ডলারের পোশাক। তবে দেশটিতে রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ কমেছে। শীর্ষ পাঁচ বাজারের মধ্যে ভারতই একমাত্র দেশ, যেখানে প্রথম প্রান্তিকে রপ্তানি সংকোচন দেখা গেছে।
প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে এগিয়ে তুরস্ক : শীর্ষ পাঁচ বাজারের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে তুরস্কে। দেশটিতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি গত অর্থবছরের একই সময়ের ৬ কোটি ৫৭ লাখ ১০ হাজার ডলার থেকে বেড়ে ১৪ কোটি ৬৬ লাখ ৩০ হাজার ডলারে দাঁড়িয়েছে। প্রবৃদ্ধির হার ১২৩ দশমিক ১৪ শতাংশ।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শীর্ষ পাঁচ বাজারে সম্মিলিত রপ্তানি বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে তুরস্ক থেকে। দেশটিতে রপ্তানি বেড়েছে ৮ কোটি ৯ লাখ ২০ হাজার ডলার, যা পাঁচ বাজারে মোট রপ্তানি বৃদ্ধির প্রায় ৯০ শতাংশের সমান।
তুরস্ককে হিসাবের বাইরে রাখলে বাকি চার বাজারে সম্মিলিত রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হতো মাত্র ১ দশমিক ০৪ শতাংশ। এতে স্পষ্ট, প্রথম প্রান্তিকে শীর্ষ পাঁচ বাজারে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে তুরস্কের অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি।
এদিকে দক্ষিণ কোরিয়ায় তৈরি পোশাক রপ্তানি ৮ দশমিক ৮১ শতাংশ বেড়ে ১২ কোটি ৯ লাখ ৪০ হাজার ডলারে পৌঁছেছে।
সেপ্টেম্বরে প্রবৃদ্ধি আরও জোরালো : প্রথম প্রান্তিকের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে সর্বশেষ মাস সেপ্টেম্বরে অপ্রচলিত শীর্ষ পাঁচ বাজারে রপ্তানির ইতিবাচক ধারা দেখা গেছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরের ২৯ কোটি ৫৬ লাখ ৩০ হাজার ডলারের তুলনায় চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে এসব বাজারে রপ্তানি বেড়ে ৩৪ কোটি ৫২ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। বছরওয়ারি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
সেপ্টেম্বরে তুরস্কে রপ্তানি বেড়েছে ২২৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ, যার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৬৬ লাখ ৫০ হাজার ডলার। দক্ষিণ কোরিয়ায় রপ্তানি ৩৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ বেড়ে ৪ কোটি ৪৫ লাখ ৫০ হাজার ডলারে পৌঁছেছে। জাপানেও রপ্তানি ৫ দশমিক ১৯ শতাংশ বেড়ে ১১ কোটি ৬৪ লাখ ৭০ হাজার ডলারে দাঁড়িয়েছে।
তবে সেপ্টেম্বরেও ভারত ও অস্ট্রেলিয়ায় রপ্তানিতে সামান্য পতন হয়েছে। ভারতে রপ্তানি কমেছে শূন্য দশমিক ৮৬ শতাংশ এবং অস্ট্রেলিয়ায় শূন্য দশমিক ১৪ শতাংশ।
বাজার বহুমুখীকরণে নতুন সম্ভাবনা : বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানি বৃদ্ধি বাজার বহুমুখীকরণের সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করছে। বিশেষ করে তুরস্কের মতো বাজারে দ্রুত প্রবৃদ্ধি নতুন ক্রেতা ও রপ্তানি সম্প্রসারণের সুযোগের ইঙ্গিত দেয়। তবে পাঁচ বাজারের সম্মিলিত প্রবৃদ্ধির বড় অংশ একটি দেশের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় অন্য বাজারগুলোতেও ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানি বাড়লেও দেশভিত্তিক প্রবৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিদ্যমান বাজারগুলোতে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা জোরদার করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, কয়েকটি বাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি গন্তব্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং নতুন বাজারে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে একটি বাজারের অস্বাভাবিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর না করে একাধিক দেশে রপ্তানি বাড়াতে পারলে বৈশ্বিক চাহিদার ওঠানামার ঝুঁকি মোকাবিলা করা সহজ হবে।
