উপকূলীয় অঞ্চলে আম চাষ সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে সাতক্ষীরায় বাড়ছে আমের কলমের চাহিদা। বিশেষ করে জেলার আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় আমের চারা ও কলম রোপণে আগ্রহী হচ্ছেন চাষিরা।
আবু সাইদ বিশ্বাস, সাতক্ষীরা
উপকূলীয় অঞ্চলে আম চাষ সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে সাতক্ষীরায় বাড়ছে আমের কলমের চাহিদা। বিশেষ করে জেলার আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় আমের চারা ও কলম রোপণে আগ্রহী হচ্ছেন চাষিরা। একসময় লবণাক্ততা ও চিংড়ি চাষের কারণে যেসব এলাকায় আম চাষ তুলনামূলক কম ছিল, সেসব এলাকায়ও এখন আমের বাগান গড়ে তোলার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। এতে সাতক্ষীরা সদরসহ বিভিন্ন এলাকার নার্সারি মালিক ও কলম উৎপাদনকারীদের জন্য নতুন বাজার তৈরি হয়েছে। তবে উৎপাদন খরচ, জমির ভাড়া ও পরিচর্যার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় চলতি মৌসুমে প্রত্যাশিত লাভের মুখ দেখার সম্ভাবনা কম বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
সাতক্ষীরায় বাণিজ্যিকভাবে আমের চারা ও কলম উৎপাদনের ইতিহাস কয়েক দশকের। স্থানীয় চাষি ও নার্সারি মালিকেরা প্রায় ৩০ থেকে ৪০ বছর ধরে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন জাতের আমের কলম তৈরি করে আসছেন। সময়ের সঙ্গে এ কাজ অনেকের জীবিকা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কার্যক্রমে পরিণত হয়েছে। উন্নত জাতের আমের বাগান গড়ে তুলতে ভালো মানের কলমের প্রয়োজন হওয়ায় এ খাতের গুরুত্বও বাড়ছে। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন নার্সারিতে উৎপাদিত কলম স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকার চাষিদের কাছেও বিক্রি হচ্ছে।
সাতক্ষীরা পৌর এলাকার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মিয়াসাহেবের ডাঙ্গা এলাকায় গড়ে উঠেছে আমের চারা ও কলম উৎপাদন এবং বিপণনের কার্যক্রম। এ এলাকার নার্সারি মালিকেরা জমিতে কলম উৎপাদন করে পাইকারি ও খুচরা বিক্রি করেন। চলতি মৌসুমেও সাতক্ষীরা সদর এলাকা থেকে কয়েক হাজার আমের কলম শ্যামনগর উপজেলায় বিক্রি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, উপকূলীয় এলাকায় আম চাষের বিস্তার ঘটায় ভবিষ্যতে এ বাজার আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
চাষিরা জানান, আমের কলম উৎপাদন একটি সময়সাপেক্ষ ও পরিচর্যানির্ভর প্রক্রিয়া। প্রথমে সুস্থ ও পরিপক্ব আমের বীজ সংগ্রহ করে পলিব্যাগে দোআঁশ মাটি ও জৈব সার মিশিয়ে রোপণ করা হয়। সাধারণত ১৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে বীজ থেকে চারা গজায়। এরপর চারাকে উপযুক্ত আকার ও শক্তি অর্জন করতে কয়েক মাস পরিচর্যা করা হয়। পরবর্তী সময়ে উন্নত জাতের আমগাছ থেকে সংগ্রহ করা ডাল বা সায়ন উপযুক্ত মূল চারার সঙ্গে জোড়া লাগিয়ে কলম তৈরি করা হয়। কলম সফলভাবে জোড়া লাগার পর উন্নত জাতের অংশটি বেড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া হয়। কলম উৎপাদনের প্রতিটি পর্যায়ে পানি, সার, আগাছা পরিষ্কার ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে নজর রাখতে হয়। নতুন কলমকে অতিরিক্ত রোদ থেকে রক্ষা করা এবং পলিব্যাগে পানি জমে শিকড় পচে যাওয়া ঠেকানোও জরুরি। চারা ও কলমের আকার, জাত এবং মান অনুযায়ী পরিচর্যার ব্যয় ভিন্ন হয়। স্থানীয় উৎপাদকদের হিসাবে, একটি কলম চারা তৈরিতে প্রায় ১০ থেকে ২৫ টাকা খরচ পড়ে। তবে জমির ভাড়া, শ্রম, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা ও অন্যান্য ব্যয় যুক্ত হলে সামগ্রিক উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যায়। ফলে চার বছরে বিঘাপ্রতি খরচ হয় প্রায় দুই লাখ টাকা।
মিয়াসাহেবের ডাঙ্গা এলাকার নার্সারি মালিক মো. জিয়াদ আলী, আব্দুর রউফ ও কওছার আলী জানান, আমের কলম উৎপাদনের জন্য জমি প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে চারা বিক্রির উপযোগী করা পর্যন্ত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। তাঁদের হিসাবে, এক বিঘা জমিতে চার বছর ধরে কলম উৎপাদন ও পরিচর্যায় মোট ব্যয় প্রায় দুই লাখ টাকা। এর মধ্যে জমির ভাড়া বাবদ প্রায় এক লাখ টাকা এবং পরিচর্যা ও অন্যান্য খাতে প্রায় এক লাখ টাকা ব্যয় হয়।
নার্সারি মালিকদের দাবি, বর্তমানে এক বিঘা জমিতে উৎপাদিত কলম বিক্রি করে মোট আয়ও প্রায় দুই লাখ টাকার কাছাকাছি হচ্ছে। ফলে দীর্ঘ চার বছরের শ্রম ও বিনিয়োগের পর তাঁদের প্রকৃত লাভ থাকছে না বললেই চলে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষতি হলে লোকসানের আশঙ্কাও রয়েছে। তাঁদের মতে, কলমের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, উৎপাদন খরচ কমানো এবং সহজ শর্তে সরকারি সহায়তা দেওয়া গেলে এ খাতকে আরও লাভজনক করা সম্ভব।
শ্যামনগরের উপকূলে বাড়ছে চাহিদা।
সাতক্ষীরা সদর থেকে আমের কলম সংগ্রহ করে শ্যামনগরে বিক্রি করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ফজর আলী। তিনি জানান, উৎপাদনক্ষেত্র থেকে একটি আমের কলম ৪০ থেকে ৫০ টাকায় কিনে শ্যামনগরে নিয়ে বিক্রি করেন। উপকূলীয় এলাকায় আম চাষের আগ্রহ বাড়ায় সেখানে কলমের চাহিদাও বেড়েছে। গাবুরা, পাতাখালি ও মুন্সিগঞ্জ এলাকার কয়েকজন চাষি জানান, তাঁদের এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে আমের কলমের চাহিদা বেড়েছে। জাত ও মানভেদে একটি উন্নত জাতের আমের কলম ১০০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে তাঁরা জানিয়েছেন। তবে এসব এলাকায় লবণাক্ততার মাত্রা, মাটির উপযোগিতা, সেচের পানির গুণমান ও জাত নির্বাচন বিবেচনায় নিয়ে আমের বাগান গড়ে তোলা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উপকূলীয় এলাকায় আমের কলমের এই বাজার সাতক্ষীরার নার্সারি ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে চাহিদা বাড়লেও উৎপাদন ব্যয় অনুপাতে বিক্রিমূল্য সন্তোষজনক না হলে এ খাতে বিনিয়োগ ধরে রাখা কঠিন হবে বলে মনে করছেন উৎপাদকেরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক কৃষিবিদ ইকবাল আহমেদ বলেন, সাতক্ষীরায় আমের কলম উৎপাদন একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। উন্নত জাতের মানসম্মত কলম উৎপাদন করা গেলে জেলার আম চাষ সম্প্রসারণের পাশাপাশি নার্সারি উদ্যোক্তারাও উপকৃত হবেন। কৃষি বিভাগ চাষি ও নার্সারি উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে। সরকারি সহায়তা ও সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত উদ্যোগে এ খাতকে আরও সম্ভাবনাময় করে তোলা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
