দেশের ৫৬টি ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ অর্থ দীর্ঘদিন ধরে দাবিহীন অবস্থায় রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে হিসাবগুলোতে লেনদেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব আমানতের মালিক কিংবা তাদের উত্তরাধিকারীদের অনেকেই অর্থের অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগত নন। সংশ্লিষ্ট হিসাবগুলোর ১৭২ কোটি টাকা জমা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকে। অন্যদিকে, নিজেদের প্রাপ্য অর্থ ফেরত পেতে গিয়ে উত্তরাধিকারীদের কেউ কেউ পড়ছেন সনদ সংগ্রহ ও আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতায়।
একটি পরিবারের কথাই ধরা যাক। পরিবারের একজন সদস্য মৃত্যুর আগে ব্যাংকে ২০ লাখ টাকা রেখে গেছেন। সেই অর্থ উত্তরাধিকারীদের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে তাদের প্রায় ৩৫ হাজার টাকা ব্যয় হতে পারে। কিন্তু এই ব্যয় বহন করার আর্থিক সক্ষমতা তাদের নেই।
নিরাপত্তার স্বার্থে পরিবারের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। তবে ঘটনাটি সামনে এনেছে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন—নিজের বা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্য অর্থ ফেরত পেতে নাগরিকদের কেন অতিরিক্ত আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হবে? বিশেষ করে, যাদের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত, তাদের জন্য এই প্রক্রিয়া আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ঠিকানার সূত্র ধরে মিলল আমানতকারীর খোঁজ
আয়নাল হকের সন্ধান পেতে শুধু তার নাম ও স্থায়ী ঠিকানাকে সূত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তবে সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন স্থাপনার পরিবর্তন এবং পুরোনো দলিলে হোল্ডিং নম্বরের পরিবর্তন যুক্ত হওয়ায় ঠিকানাটি শনাক্ত করা সহজ ছিল না। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর তার খোঁজ পাওয়া যায়। তখন তিনি জানতে পারেন, তার ব্যাংক হিসাবের অর্থ ইতোমধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে।
এমন অভিজ্ঞতা শুধু আয়নাল হকের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। মিরপুরের আহমদনগরে সরফুন্নাহারের নামে থাকা একটি হিসাবে লাখ টাকার বেশি অর্থ জমা রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, তারা ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ঝিনাইদহে ফিরে গেছেন।
নারায়ণগঞ্জের জামতলায় আমান খান নামে এক আমানতকারীর তথ্য খুঁজতে গিয়ে তার বাবার নামের পদবি নিয়ে অসংগতি পাওয়া যায়। আবার শাহ সুজা রোডের আলমগীর হিরণ ঠিকানা পরিবর্তন করে অন্য এলাকায় চলে যাওয়ায় তার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন কঠিন হয়ে পড়ে।
পরিচয় ও উত্তরাধিকার শনাক্তকরণে জটিলতা
ব্যাংক হিসাবে গ্রাহকের তথ্য অসম্পূর্ণ থাকা, ঠিকানা পরিবর্তন, নামের বানানে অমিল এবং নমিনি বা উত্তরাধিকারীদের শনাক্ত করতে না পারার মতো কারণে অনেক আমানত দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। কোনো কোনো হিসাবে বাবা-মায়ের নামের মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও নেই। ফলে অর্থের প্রকৃত মালিক কিংবা তার বৈধ উত্তরাধিকারীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এ ধরনের পরিস্থিতির পরিণতিতে ৫৬টি ব্যাংকের ১৭২ কোটি টাকা দাবিহীন আমানত হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অর্থ জমা হওয়া মানেই আমানতকারীর বা তার বৈধ উত্তরাধিকারীদের দাবি শেষ হয়ে যাওয়া নয়।
বৈধ উত্তরাধিকারী হলে অর্থ পাওয়ার সুযোগ
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, সংশ্লিষ্ট আমানতের বৈধ উত্তরাধিকারী হিসেবে কেউ নিজেকে আইনগতভাবে প্রমাণ করতে পারলে তিনি ওই অর্থ পাওয়ার অধিকারী হবেন। আদালত উত্তরাধিকারীদের মধ্যে অর্থ বণ্টনের বিষয়ে নির্দেশনা দিলে ব্যাংক সে অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করবে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জুয়েল আজাদের মতে, সরকারি কোষাগারে জমা হওয়া অর্থ ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ নয়। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো দায়িত্ব নিয়ে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারে।
তিনি বলেন, মৃত আমানতকারীর পরিবারের ঠিকানা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য ব্যাংকের কাছে থাকার কথা। তাই দীর্ঘ সময় যোগাযোগ বা লেনদেন না থাকলে হিসাবটি কেন নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে, তা খতিয়ে দেখা ব্যাংকের দায়িত্ব হওয়া উচিত।
ব্যাংকের উদ্যোগে কমতে পারে ভোগান্তি
ব্যাংকগুলো থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অন্তত ১৫ জন দাবিহীন আমানতকারীর সন্ধান করেছে সময় সংবাদ। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, গ্রাহক ও তাঁদের পরিবারের সঙ্গে ব্যাংকগুলোর নিয়মিত যোগাযোগ থাকলে অনেক ক্ষেত্রে এসব আমানতের মালিকানা শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন লেনদেন না হওয়া হিসাবের মালিকদের খুঁজে বের করা এবং প্রয়োজনীয় তথ্য হালনাগাদ রাখার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর সক্রিয় ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে উত্তরাধিকারীদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সহজ করা গেলে তাঁদের ভোগান্তি ও অতিরিক্ত ব্যয় কমানো সম্ভব।
ব্যাংকে পড়ে থাকা অর্থের প্রকৃত মালিকদের কাছে তা পৌঁছে দিতে তাই শুধু নিয়মকানুন অনুসরণই নয়, আমানতকারীদের শনাক্তকরণ, তথ্য সংরক্ষণ এবং কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি।
