আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্বে নিয়োজিত থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ব্যক্তিগত বাণিজ্যিক ব্যবসায় লিপ্ত হওয়ার এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) সার্জেন্ট অব পুলিশ পদে বর্তমানে কর্মরত সরদার মুহিবের বিরুদ্ধে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিক সিএনজিচালিত অটোরিকশার বাণিজ্যিক বহর পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। একজন দায়িত্বশীল সরকারি চাকরিজীবী ও শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হিসেবে সরকারি চাকরির শৃঙ্খলা, আচরণবিধিমালা ও পুলিশ আইনের সরাসরি লঙ্ঘন ঘটেছে বলে মনে করছেন আইনি বিশ্লেষকেরা। গত ২২ অক্টোবর রাতে গোপন কিংবা অবৈধ তথ্য নয়, বরং ট্রাফিক বিভাগের নিয়মিত চেকিংয়ে একটি সিএনজি অটোরিকশা আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই বিপুল গোপন বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যের থলের বিড়াল বেরিয়ে আসে। ঘটনার পর প্রশাসনিক ভাবমূর্তি রক্ষা ও অভিযুক্তের বিরুদ্ধে বিভাগীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে।
ঘটনার বিস্তারিত সময়রেখা ও অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ২২ অক্টোবর রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মতিঝিল ট্রাফিক বিভাগের অধীন রাজধানীর টিটিপাড়া মোড়ে কর্তব্যরত ট্রাফিক দল একটি বাণিজ্যিক সিএনজিচালিত অটোরিকশা (ঢাকা মেট্রো দ-১১-১১৬০) গতিরোধ করে। অটোরিকশাটির গায়ে ‘সরদার পরিবহন’ নামের একটি সুনির্দিষ্ট ব্যানার ঝোলানো ছিল। দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক পুলিশ চালকের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখতে চাইলে চালক খোকন দাবি করেন যে, এই গাড়ির প্রকৃত মালিক সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কর্মরত সার্জেন্ট সরদার মুহিব এবং সমস্ত মূল নথিপত্র তাঁর কাছেই সংরক্ষিত আছে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত সংবাদকর্মীদের উপস্থিতিতে এবং আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কর্তব্যরত ট্রাফিক সার্জেন্ট সিএনজি অটোরিকশাটি তাৎক্ষণিকভাবে আটক করে ডাম্পিংয়ে পাঠান।
অনুসন্ধানে পাওয়া সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা যায়, পুলিশ সার্জেন্ট সরদার মুহিব পূর্বে ঢাকায় ট্রাফিক বিভাগে কর্মরত থাকাকালে নিজের পদের প্রভাব খাটিয়ে প্রায় ২০ থেকে ২৫টি সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিনে নিজস্ব বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে রাস্তায় নামান। পরিবহন খাত ও অটোমোবাইল বাজার সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে নতুন নিবন্ধিত না হওয়ায় রুট পারমিট ও রেজিস্ট্রেশনসহ রাজধানীতে একটি বাণিজ্যিক সিএনজি অটোরিকশার আনুমানিক বাজারদর প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা। সেই হিসাবে অভিযুক্ত এই পুলিশ কর্মকর্তার নিয়ন্ত্রণে থাকা সিএনজি বহরের বর্তমান বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা। সাধারণ একজন পুলিশ সার্জেন্টের বৈধ বেতন ও আয়ের উৎসের সঙ্গে এমন বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও ব্যবসায়িক সম্পদের অসংগতি মারাত্মক সন্দেহ ও অনুসন্ধানের জন্ম দিয়েছে।
অভিযুক্ত কর্মকর্তা, আইনি বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনায় বিষয়টির গুরুত্ব প্রকট হয়ে উঠেছে। ঘটনার সত্যতা ও আইনি ব্যাখ্যা জানতে সরাসরি মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে অভিযুক্ত পুলিশ সার্জেন্ট সরদার মুহিব সিএনজিচালিত অটোরিকশার মালিকানার বিষয়টি সরাসরি স্বীকার করে নেন। তবে সরকারি চাকরির আইন ও শৃঙ্খলার বাধ্যবাধকতা অমান্য করে কীভাবে তিনি এই ব্যবসা পরিচালনা করছেন—এমন সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের মুখে তিনি কোনো স্পষ্ট, বৈধ বা গ্রহণযোগ্য উত্তর প্রদান করতে পারেননি।
পরিবহন খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, দায়িত্বশীল পদের অপব্যবহার করে পুলিশ বাহিনীর সদস্য নিজেই যখন বাণিজ্যিক পরিবহনের মালিক বনে যান, তখন সাধারণ সড়ক পরিবহন নিয়ন্ত্রণ ও নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগব্যবস্থা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রশাসনিক ক্ষমতার সরাসরি অপব্যবহার এবং পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার নামান্তর।
আইনগত ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। ‘১৮৬১ সালের পুলিশ আইন’-এর ১০ ধারা অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষের সুস্পষ্ট অনুমতি ব্যতীত কোনো পুলিশ কর্মকর্তা বা সদস্য অন্য কোনো পদে নিয়োজিত হতে পারবেন না কিংবা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো প্রকার বাণিজ্যিক বা ব্যবসায়িক কার্যক্রমে যুক্ত হতে পারবেন না। তাছাড়া ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’ অনুযায়ী, সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়া যেকোনো মুনাফাভিত্তিক ব্যবসায় জড়িত হওয়া চরম অসদাচরণ ও দণ্ডনীয় অপরাধ। নিয়ন্ত্রক সংস্থার সদস্য নিজেই যখন ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত হন, তখন ‘স্বার্থের দ্বন্দ্ব’ (Conflict of Interest) তৈরি হয় এবং সাধারণ নাগরিকদের আইনি সুরক্ষা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়।
অভিযোগের সার্বিক গভীরতা ও প্রশাসনিক প্রভাব বিচারে বিশিষ্টজনেরা মনে করছেন, ঘটনাটি কেবল একজন ব্যক্তিবিশেষের শৃঙ্খলাভঙ্গ নয়, বরং সার্বিক পুলিশ বিভাগের পেশাদারত্বের ওপর বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন। সড়কে বাণিজ্যিক প্রভাব বিস্তার রোধ ও বাংলাদেশ পুলিশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে নিরপেক্ষ অডিট ও তদন্ত দল গঠন করা প্রয়োজন। অভিজ্ঞ মহলের মতে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং পুলিশ সদর দপ্তরের অভ্যন্তরীণ বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে অভিযুক্ত সার্জেন্ট সরদার মুহিবের অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করা উচিত। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণই সরকারি চাকরির শৃঙ্খলা রক্ষা ও আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করার একমাত্র পথ।
