জমানো টাকা দিতে পারছে না পদ্মা ব্যাংক, চরম মানবিক বিপর্যয়ে আমানতকারীরা
প্রভাত অর্থনীতি: বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের অফিস সহকারী জামাল হোসেন ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পদ্মা ব্যাংকের ধানমন্ডি শাখায় তাঁর মেয়াদী সঞ্চয়ী স্কিমের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দুই লাখ টাকা তোলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। এক বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও— ব্যাংকটি তাঁর সেই জমানো টাকা ফেরত দেয়নি।
জামাল একা নন; তাঁর মতো হাজার হাজার সাধারণ আমানতকারী আজ চরম মানবিক বিপর্যয়ে পড়েছেন। সারা জীবনের সঞ্চয় জমা রেখেও বছরের পর বছর ধরে তা ফেরত পাচ্ছেন না তারা। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ এই ব্যাংকে একক বা ব্যক্তি পর্যায়ের আমানতকারীদের ৩,০০০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ আটকে রয়েছে।
আমানতকারীদের পাওনা মেটাতে না পারলেও, সাবেক চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফাতের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে গুলশান-২-এর ফাইনান্স স্কয়ার ভবনের ভাড়াবাবদ প্রতি মাসে ঠিকই ৬০ লাখ টাকা গুনে যাচ্ছে পদ্মা ব্যাংক। অর্থপাচারের একাধিক অভিযোগের মুখে থাকা নাফিজ সরাফাত, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে বিদেশে অবস্থান করছেন বলে তাঁর নিকটজনেরা নিশ্চিত করেছেন।
ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা যখন চরম ধসের দিকে, ঠিক তখনই ২০২২ সালে নাফিজ সরাফাত চেয়ারম্যান পদে থাকা অবস্থায় পদ্মা ব্যাংক তাদের প্রধান কার্যালয়টি এই গুলশানের ভবনে স্থানান্তরিত করে। সেখানে প্রতি বর্গফুট ২৫০ টাকা হারে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়, একটি মূল শাখা এবং একটি ইসলামিক ব্যাংকিং শাখার জন্য প্রায় ২৪,০০০ বর্গফুট জায়গা ভাড়া নেওয়া হয়েছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভবনটি ভাড়াবাবদ অগ্রিম হিসেবে ১৪ কোটি টাকাও পরিশোধ করেছিল ব্যাংকটি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদারের মেয়াদে এই লেনদেনের অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে সিআইডি তদন্তে গুরুতর স্বার্থের সংঘাত (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) শনাক্ত করে এবং জানতে পারে যে, এই সম্পত্তি নাফিজের স্ত্রী আঞ্জুমান আরা শহীদ এবং তাঁদের নাবালক ছেলে রাহিব সাফওয়ান সরাফাত চৌধুরীর সাথে সংশ্লিষ্ট।
সমস্যার গভীরতা এখানেই শেষ নয়; ‘বাংলাদেশ ফিক্সড ইনকাম ইনভেস্টমেন্ট স্পেশাল পারপাস ভেহিকল’ (বিএফআইএসপিভি)-এ বিনিয়োগ করা ২১৯ কোটি টাকারও বেশি অর্থ উদ্ধার করতে পারছে না ব্যাংকটি। এই তহবিল ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের; যার চেয়ারম্যান নাফিজ সরাফাত। ২০১৫ ও ২০১৬ সালে নাফিজ যখন পদ্মা ব্যাংকের পর্ষদে ছিলেন, তখনই এই বিনিয়োগ করা হয়। বেআইনি শেয়ার লেনদেনের প্রমাণ পাওয়ায়, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা (বিএসইসি) রেস-এর একটি বিকল্প তহবিলের আওতায় পরিচালিত সব ধরনের লেনদেন স্থগিত করে।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর, সিআইডি চৌধুরী নাফিজ সরাফাত, তার পরিবারের সদস্য এবং এক সহযোগীর বিরুদ্ধে ১,৬১৩ কোটি টাকারও বেশি অর্থ পাচারের অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করে।
২০২৫ সালে ৯,৩০০ কোটি টাকার বিশাল অংকের লোকসান দিয়েছে পদ্মা ব্যাংক। বর্তমানে তারা নামমাত্র কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কাগজে-কলমে ব্যাংকের ৭৪টি শাখা থাকলেও, তার সিংহভাগই অকার্যকর অথবা ন্যূনতম সক্ষমতায় চলছে। ব্যাংকের মোট জনবল ১,১০০ থেকে কমে বর্তমানে প্রায় ৭০০-তে নেমে এসেছে। বহু শাখা ব্যবস্থাপক এবং জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা চাকরি ছেড়ে চলে যাওয়ায়, অনেক শাখা এখন কেবল জুনিয়র কর্মী, পিয়ন এবং নিরাপত্তা প্রহরীদের ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে।
এমনকি ব্যাংকে রয়ে যাওয়া বাকি কর্মীরাও এক ফাঁদে আটকা পড়েছেন।গণমাধ্যমকে পদ্মা ব্যাংকের একাধিক কর্মী জানান, প্রতি মাসে তাদের অ্যাকাউন্টে ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে বেতন জমা দেখানো হলেও, গত তিন বছর ধরে তারা কোনো নগদ টাকা তুলতে পারছেন না বা নিজেদের অর্জিত বেতন ব্যবহার করতে পারছেন না।
আমানতকারীদের পাওনা মেটানোর মতো তারল্য যে ব্যাংকটির হাতে নেই, তা স্বীকার করেছেন পদ্মা ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কাজী মো. তালহা। তিনি বলেন, “কালেকশন থেকে যখন যা ফান্ড আসে, আমরা তা দিয়ে ছোট ছোট এমাউন্টে পাওনাগুলো মেটানোর চেষ্টা করি। মাঝেমধ্যে কর্মীদের অ্যাকাউন্টে বেতন ক্রেডিট করা হলেও, তারা সেই টাকা পুরোটা সাথে সাথে তুলতে পারেন না। নগদ টাকার সংস্থান হওয়া সাপেক্ষে, আমরা অল্প অল্প করে টাকা ছাড় করি।”
সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২২ সালে পদ্মা ব্যাংক ‘ডায়নেস্টি হোমস’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে তিনটি চুক্তি সই করে, ফাইন্যান্স স্কয়ারের একাধিক ফ্লোর ভাড়ার নাম করে মোট ১৪.০৭ কোটি টাকা অগ্রিম বাবদ প্রদান করে। গুলশান-২-এর এই ৯ কাঠার মূল্যবান প্লটটি হেবা বা দানপত্র দলিলের মাধ্যমে নাফিজের স্ত্রী এবং নাবালক ছেলের নামে হস্তান্তর করা হয়েছিল। সিআইডি তদন্তকারীদের দাবি, কার্যত পুরো সম্পত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ ছিল নাফিজের। পরবর্তীতে একটি নির্মাণ চুক্তিতে নাবালক ছেলেকে জমির মালিক ও লিজদাতা এবং ডায়নেস্টি হোমস’কে ডেভেলপার হিসেবে দেখানো হয়—যেখানে বলা ছিল ডায়নেস্টি প্রপার্টিটি ভাড়া দিয়ে তার থেকে নির্মাণ খরচ তোলার পাশাপাশি ৩০ শতাংশ অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করবে।
২০২১ সালের জানুয়ারিতে নিবন্ধিত ডায়নেস্টি হোমসের অনুমোদিত মূলধন ছিল ১০ কোটি টাকা, কিন্তু পরিশোধিত মূলধন ছিল মাত্র ২ লাখ টাকা! অথচ মাত্র ২ লাখ টাকার এই কোম্পানি ৫২.৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০ তলা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের মূল কাজ হাতে নেয়।
সিআইডি অভিযোগ করেছে, ভুয়া বা শেল কোম্পানির মাধ্যমে ব্যাংকের ভেতরের সুবিধাভোগীদের স্বার্থে নিজস্ব প্রপার্টি প্রকল্পে টাকা ঢালতে এসব সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। এ থেকেই জোরালো প্রশ্ন ওঠে—পদ্মা ব্যাংকের নিজস্ব মূলধন কি ব্যাংকের ভেতরের কায়েমি স্বার্থ হাসিলের জন্য কোনো রিয়েল এস্টেট প্রকল্পে ব্যবহার করা হয়েছিল? এসব মারাত্মক জালিয়াতির ওপর ভিত্তি করেই ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর সিআইডি গুলশান থানায় নাফিজ ও অন্য ৩ জনের বিরুদ্ধে ১,৬১৩ কোটি টাকা অর্থ পাচারের মামলা দায়ের করে। এসব বিষয়ে মন্তব্যের জন্য নাফিজ সরাফাতের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
ভাড়ার বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সিইও তালহা নিশ্চিত করেন যে, পদ্মা ব্যাংক এখনো প্রতি মাসে ডায়নেস্টি হোমসের অ্যাকাউন্টে ৬০ লাখ টাকা জমা করে যাচ্ছে—যে কোম্পানির অফিসও আবার একই ফাইন্যান্স স্কয়ার ভবনে অবস্থিত। তিনি যুক্তি দেন, এই মুহূর্তে হেড অফিস অন্য কোথাও স্থানান্তরিত করা সম্ভব নয়; কারণ নতুন কোনো ভবনে গেলে ফের বিশাল অংকের অগ্রিম দিতে হবে এবং ডেকোরেশন খরচ লাগবে—যা বহন করার সামর্থ্য ব্যাংকের নেই। তাছাড়া এই ভবন থেকে চলে গেলে আগে করা বিপুল বিনিয়োগের সব অর্থই বাজেয়াপ্ত হয়ে যাবে।
সিআইডির তদন্তে দেখা গেছে, এই পুরো প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি সার্কুলার ১২ (১৫ জুন ২০২২ তারিখে জারি করা)-এর সরাসরি লঙ্ঘন হয়েছে, যেখানে ব্যাংকগুলোকে তাদের পরিচালক বা আর্থিক স্বার্থ জড়িত থাকা কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পণ্য বা সেবা গ্রহণে কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান দাবি করেন, বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) বিষয়টি উত্থাপন ও প্রকাশ করা হলে এবং বাজারের প্রচলিত হারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে, কোনো স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষ থেকে জায়গা ভাড়া নেয়ার ক্ষেত্রে সরাসরি স্পষ্ট আইনি নিষেধাজ্ঞা নেই। “তবে এর পেছনে কোনো ফৌজদারি অপরাধ জড়িত থাকলে তা ভিন্ন বিষয়,” বলে যোগ করেন তিনি। সুশাসনের এই অচলাবস্থা একদম উচ্চ নির্বাহী পর্যায়েও বিস্তৃত। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তারেক রিয়াজ খান পদত্যাগ করার পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো স্থায়ী এমডি ছাড়াই চলছে পদ্মা ব্যাংক—যা অন্তবর্তী নেতৃত্বের সর্বোচ্চ ৩ মাসের যে সময়সীমা কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেঁধে দিয়েছে, তারও সরাসরি লঙ্ঘন।
ব্যাংকটির ৬৮ শতাংশ শেয়ারের মালিক সরকার নিজেই। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর এমডিদের অপসারণ করা হলে—পর্ষদের কোরাম সংকট দেখা দেয় এবং পদ্মা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ অকার্যকর হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে বোর্ড পুনর্গঠন করে সিইও হিসেবে তালহার নাম প্রস্তাব করা হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক সেই নিয়োগ প্রস্তাব অনুমোদনও করেনি, আবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যানও করেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান অবশ্য বলেছেন যে, ব্যাংকটি যে নিয়মিত এমডি ছাড়াই চলছে, তা তাঁর জানা ছিল না এবং তিনি আবেদনটির অবস্থা নিয়ে খোঁজ নেবেন। অন্যদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পদ্মা ব্যাংকের পর্ষদের একজন সদস্য মন্তব্য করেন, এই নেতৃত্বহীনতার কারণে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ কোনো সিদ্ধান্ত পুরোপুরি কার্যকর করতে পারছে না, কর্মীদের সঠিক নির্দেশনা দিতে পারছে না বা ব্যাংকটির পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনীয় কোনো মৌলিক পদক্ষেপও নিতে পারছে না।
চরম সংকটাপন্ন অবস্থা সত্ত্বেও—বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে কোনো জরুরি তারল্য সহায়তা পায়নি পদ্মা ব্যাংক। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ব্যাংকটি প্রথমে ৩,৫০০ কোটি টাকা এবং পরবর্তীতে বর্তমান সরকারের মেয়াদে ৫,০০০ কোটি টাকার তারল্য সহায়তার আবেদন জানায়। “এখন আমরা হিসাব করে দেখছি যে, ব্যাংকে ন্যূনতম মৌলিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে অন্তত ৮,০০০ কোটি টাকার তহবিল প্রয়োজন হবে,” বলেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পদ্মা ব্যাংকের এক পর্ষদ সদস্য।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ব্যাখ্যা করেন যে, আর্থিক সহায়তা দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতস্তত করার অন্যতম কারণ হলো— নাফিজ সরাফাতের প্রতিনিধিত্বকারী ‘ফার্স্ট বাংলাদেশ ফিক্সড ইনকাম ফান্ড’ (যা রেস পরিচালিত)-এর বোর্ডে এখনো উপস্থিতি থাকা। “বাংলাদেশ ব্যাংক যদি এখন তারল্য সহায়তা দেয়, তাহলে অতীতে অনিয়ম করা পরিচালকরাই পরোক্ষভাবে সুবিধা পাবেন,” বলেন তিনি। তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে আসা প্রতিনিধিরাও কোনো বড় কাঠামোগত সিদ্ধান্তের দায় নিজেদের কাঁধে নিতে চাচ্ছেন না। ফলে কোনো স্থায়ী সমাধান পেতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক রেজ্যুলেশন ফ্রেমওয়ার্ক-এর আওতায়, সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হবে।
নাফিজ সরাফাত ২০১৩ সালে তৎকালীন ফারমার্স ব্যাংক (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) গঠনের সময় স্পন্সর শেয়ারহোল্ডার হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে মহিউদ্দীন খান আলমগীর পদত্যাগ করলে, ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে তিনি চেয়ারম্যান হন। স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে পদত্যাগ করলেও, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো জানায়—ফান্ডের প্রতিনিধিত্বের সুযোগ নিয়ে তিনি এখনো নেপথ্যে প্রভাব খাটান এবং ফাইন্যান্স স্কয়ারের ভাড়ার টাকা নিয়মিত জমা হচ্ছে কিনা সে ব্যাপারে সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখেন। ২০২৫ সালের অডিট প্রতিবেদন পদ্মা ব্যাংকের এক দৈন্য দশা উন্মোচন করেছে।
২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংকটির ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধন সংরক্ষণের অনুপাত (সিআরএআর) দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ১৮৭.১৪ শতাংশে—যেখানে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়ম হলো ১২.৫ শতাংশ। ফলে ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৬,২২৪ কোটি টাকায়।
২০১৬ সালের পর থেকে ব্যাংকটি বাধ্যতামূলক আইনি বা সংবিধিবদ্ধ সঞ্চিতি বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে এবং এর ক্যাশ রিজার্ভ রিকোয়ারমেন্ট (সিআরআর) ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৩২.৩৯ কোটি টাকায়। ব্যাংকের পরিচালন নগদ প্রবাহ (অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো) ছিল ঋণাত্মক ৭৮৯.৭৮ কোটি টাকা এবং তারল্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫,১২২ কোটি টাকায়।
পদ্মা ব্যাংকে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ৬,৬১১ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৩,০০০ কোটি টাকারও বেশি সাধারণ ব্যক্তিগত আমানতকারীদের এবং অবশিষ্ট অংশ সরকারি সংস্থাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের।
ব্যাংকটির বিতরণের মোট ৫,৫৩৪ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ৯৪.৫১ শতাংশই সরাসরি খেলাপি বা মন্দ ঋণে পরিণত হয়েছে। বিপরীতে অবচয় বাদ দিয়ে ১১১.৭৭ কোটি টাকার পরিচালন ব্যয়ের বিপরীতে— মাত্র ৪৮.১৫ কোটি টাকার নগদ ঋণ আদায় করতে পেরেছে তারা। ব্যাংকের নিট সুদের আয় ছিল ঋণাত্মক ৭২২.০৩ কোটি টাকা।
নিরীক্ষক বা অডিটররা আনুষ্ঠানিকভাবে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, একটার পর একটা ঘনীভূত হতে থাকা এই বিশাল আর্থিক ঘাটতি ব্যাংকটির অস্তিত্বের ওপরই চূড়ান্ত প্রশ্ন চিহ্ন একে দিয়েছে এবং একটি সচল প্রতিষ্ঠান হিসেবে পদ্মা ব্যাংকের টিকে থাকাকেই চরম সংশয়ের মুখে ফেলে দিয়েছে।
তথ্যসূত্র: টিবিএস
More News Of This Category

